একটা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনের এক আদেশে স্কুল ও কলেজগুলোর ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রিধারী করে দেয়া হয়েছে। ওই আদেশের ফলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে নীতিমালা করে অমন যোগ্যতা চূড়ান্ত করে দেয়া হয়েছে শুধু প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে। কিন্তু হাই স্কুল আর কলেজের ক্ষেত্রে হাইকোর্ট ডিভিশনের নির্দেশ আজও বাস্তবায়ন করা হয়নি। তাই আজও বাংলাদেশের অসংখ্য হাই স্কুল আর কলেজের গভর্নিং বডি অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত আর অযোগ্য মানুষদের দখলে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল দায়িত্ব থাকে জাতির ভবিষ্যৎ নাগরিকদের গড়ে তোলা। শিক্ষা-দীক্ষায় আর নীতিনৈতিকতায় বর্তমান প্রজন্মকে ভবিষ্যতের জন্য উপযুক্ত করে তোলা। এই মহান দায়িত্ব যখন অর্পিত থাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আর সেখানকার শিক্ষকদের ওপর, তখন অমন প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তি বা পরিচালকদের কতটা যোগ্য হওয়া দরকার তা বোঝা কঠিন কিছু নয়। নিশ্চয়ই শিক্ষাদীক্ষায়-নৈতিকতায় যথেষ্ট যোগ্য ব্যক্তি ছাড়া এমন প্রতিষ্ঠানের দেখভালের দায়িত্ব অন্যদের হাতে যাওয়া উচিত না কোনোভাবেই। কিন্তু বাস্তবে অবস্থা ভিন্ন। স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরোয়নি অথবা কোনোমতে একটা সার্টিফিকেট ম্যানেজ করা লোকগুলো কখনো রাজনৈতিক অনুগ্রহে আবার কখনো তথাকথিত নির্বাচনের কারসাজির মাধ্যমে স্কুল-কলেজগুলোর কমিটিতে অনুপ্রবেশ করে। এ দুরবস্থাকে অনুমান করার জন্য একটা উদাহরণ টানা যেতে পারে। ধরা যাক, স্কুল বা কলেজের কোনো এক ব্যাচের বিদায় অনুষ্ঠানে এক অযোগ্য ব্যক্তি শুধু ম্যানেজিং কমিটির কর্তাব্যক্তি হয়ে সবচেয়ে বড় চেয়ারটা দখল করে আছেন। আর এমএ, বিএ, এমএড, বিএড করা শিক্ষকরা তুলনামূলক নিচু চেয়ারে আর পেছনের সারিতে স্থান পেয়েছেন। অশিক্ষিত অথবা অল্পশিক্ষিত বা কোনোমতে শিক্ষিত ব্যক্তিদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন দৃষ্টিকটু আর অসামঞ্জস্যপূর্ণ উচ্চ অবস্থান কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মননে কী প্রভাব ফেলবে? শিক্ষার মূল্যায়ন কি তারা আদৌ করতে শিখবে?
সমস্যা কিন্তু ম্যানেজিং কমিটির শুধু এমন অযোগ্য ব্যক্তিদের অশিক্ষা বা অল্প শিক্ষায় নয়। সমস্যা থাকে মূলত তাদের আচরণে, ব্যক্তিত্বে আর কর্মপন্থায়। যে লেখাপড়ার গুরুত্ব, উন্নয়ন আর কার্যকারিতা সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা রাখে না, তার কাছ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উপকৃত হতে পারে না। তবে একসময় অল্প শিক্ষিত ব্যক্তিরাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে আসতেন। তবে তখন তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কমতি থাকলেও জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রসারে তাদের ঐকান্তিকতা, নিবেদন আর প্রচেষ্টার কারণে তাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতনা। এখন যুগ পাল্টেছে। শহর বা গ্রামে—কোনোখানেই শিক্ষিত মানুষের ঘাটতি নেই। এমনকি শিক্ষাবিদেরও ঘাটতি খুব একটা চোখে পড়ে না। এটি সত্ত্বেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব কেন এমন বাছাইকৃত অযোগ্যদের হাতে তুলে দেয়া হয়?
রাজনীতি,
আমলাতন্ত্র আর ভ্রষ্ট সমাজ পরিকাঠামোর সর্বগ্রাসী
ছোবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করছে সবার সামনে। দুর্নীতিবাজ, অশিক্ষিত, কুশিক্ষিত মানুষগুলোই
যে শুধু ছড়ি ঘোরাচ্ছে
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তা নয়; স্থানীয়
সংসদ সদস্য,
পদপ্রাপ্ত বা পদবঞ্চিত রাজনীতিক,
সরকারি আমলা, হঠাৎ করে পয়সার মালিক
হওয়া কোনো তালেবর—সবাই আজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব নিতে চায়। শিক্ষাবিদ, শিক্ষানুরাগী অথবা সুশিক্ষিত ব্যক্তিদের
এ অসুস্থ
দৌড়ঝাঁপের মধ্যে
খুঁজে পাওয়া
যায় না। অথচ প্রশ্ন
জাগে, একজন সংসদ সদস্য
বা সরকারি
নির্বাহী—তারা এত ব্যস্ততার
মধ্যে কি সঠিকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উন্নয়নের জন্য মনোনিবেশ
করতে পারেন?
যেকোনো রাজনীতিক
বা স্থানীয়
জনপ্রতিনিধি চাইলেই
কি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে পারেন?
তাদের কি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যাবতীয় বিষয় দেখভাল করার বা শিক্ষার
উন্নয়ন বলতে যা বোঝায়,
তা নিয়ে কাজ করার কোনো অভিজ্ঞতা
আছে? অশিক্ষিত
বা অর্ধশিক্ষিত ব্যক্তিদের তো কোনো নৈতিক অধিকারই
থাকে না এমন প্রতিষ্ঠান
পরিচালনায় আসার।
অথচ পরিতাপের
বিষয়, এসব ব্যক্তিই আসছেন
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ম্যানেজিং কমিটির
প্রধান পদে।
সরকার
দেরিতে হলেও
একটা ভালো
কাজ করেছে।
আর সেটা
হলো, এমপিওভুক্ত হাইস্কুল আর কলেজের
শিক্ষকদের সরকারি
এনটিআরসিএর মাধ্যমে
নিয়োগ দেয়া।
সম্প্রতি প্রায়
৩৮ হাজার
হাইস্কুলের শিক্ষকদের
এ পদ্ধতিতে
নিয়োগ দেয়ার
সুপারিশ করা হয়েছে। তবে আগে অযোগ্য
আর দুর্নীতিবাজ ম্যানেজিং কমিটির কারণে
বিভিন্ন স্কুল-কলেজেই অনেক
অযোগ্যদের শিক্ষক
হিসেবে নিয়োগ
দেয়া হয়েছে।
সেসব অযোগ্য
শিক্ষক এমনভাবে
বিভিন্ন স্কুল-কলেজে ঢুকে
পড়েছেন, তাদের
হাত থেকে
আগামী ৩০ বছরেও ওইসব
প্রতিষ্ঠানের রেহাই
নেই। একটা
জাতিকে নিঃশেষ
করার জন্য
অযোগ্য শিক্ষক
আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অযোগ্য পরিচালনা পর্ষদই
যথেষ্ট।
একটা জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে হাইস্কুল আর কলেজের অবদান অনস্বীকার্য। এখান থেকে সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য দেশ-বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করবেন। তাই এমন বিদ্যাপীঠগুলোর সঠিক সুরক্ষার জন্য সরকারের সদিচ্ছা আর মনোযোগের বিকল্প নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য হয় শিক্ষিত ও যোগ্য লোকদের নিয়ে পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে হবে, নতুবা ম্যানেজিং কমিটির চর্চা তুলে দিতে হবে। যেহেতু এখন শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থাও সরকার সরাসরি করে দিচ্ছে সেহেতু ম্যানেজিং কমিটির খুব একটা দায়িত্ব থাকে না। বর্তমান সময়ে অনেক প্রতিষ্ঠানেই ম্যানেজিং কমিটির আর শিক্ষকদের প্রচ্ছন্ন বিভাজন আবার কোথাও কোথাও সাপে-নেউলে অবস্থা বিরাজ করে। এটা কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা না। কারণ আমাদের দেশে ম্যানেজিং কমিটির আবির্ভাব ঘটে যত না প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের জন্য, তার চেয়ে বেশি খেয়াল থাকে প্রতিষ্ঠানগুলোয় তাদের প্রভাব ও দখল বজায় রাখতে। শিক্ষকরা পাঠদান থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজ ব্যবস্থাপনার সব কাজ যদি নিজেরাই করতে পারেন তাহলে শুধু বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পায়রা ওড়ানোর জন্য কি আদৌ ম্যানেজিং কমিটির দরকার পড়ে? সর্বোপরি মনে রাখা দরকার দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো।
মো. রবিউল ইসলাম: সহযোগী অধ্যাপক
আইন ও বিচার বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়










