ছোটবেলায় ফুটবলের জাদুকর হিসেবে ব্ল্যাকপার্ল খ্যাত ব্রাজিলের পেলেকে আমরা যেমন একনামে সবাই চিনি, হাইব্রিড ধানের জনক হিসেবে চীনের বিজ্ঞানী ড. ইউয়ান লংপিংয়ের যুগান্তকারী উদ্ভাবনও তেমনিভাবে আজ বিশ্বখ্যাত। পেলে যেমন পায়ের শৈল্পিক জাদু দেখিয়ে ব্রাজিলের নান্দনিক ফুটবলকে বিশ্বের সমগ্র ক্রীড়ামোদির কাছে বিনোদনের অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে তুলে ধরেছেন, তেমনিভাবে লংপিংও ভাতভোজী বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধিষ্ণু চাহিদার জোগান অব্যাহত রাখতে ধানের হাইব্রিড প্রযুক্তিকে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছেন। ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর ভাতের জোগান দিতে বিজ্ঞানীরা যখন উচ্চফলনশীল জাতের ফলন সম্ভাবনার প্রায় সবটুকুই কাজে লাগিয়েছেন, ঠিক সে সময়ে বিজ্ঞানী লংপিং দুটো ভিন্ন জাতের ধানের সংকরীকরণের মাধ্যমে তাদের প্রথম প্রজন্মে হেটারোসিস ঘটিয়ে সারা বিশ্বে হইচই ফেলে দেন। তার এ যুগান্তকারী আবিষ্কারের সুফল যখন সারা বিশ্বের মানুষ উপভোগ করছে, ঠিক তখনই মহাকালের নিয়মে গত ২২ মে ৯১ বছর বয়সে প্রয়াণ হলো এ উদ্ভাবকের।

কৃষিতে পরপর দুটি যুগান্তকারী আবিষ্কার বিশ্বকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। প্রথমটি ষাটের দশকে কৃষিতে সবুজ বিপ্লবের জনক হিসেবে প্রফেসর নরম্যান বোরলকের ফসলের উচ্চফলন জাতের আবিষ্কার এবং এর পরের দশকে হাইব্রিড রাইসের জনক হিসেবে প্রফেসর ইউয়ান লংপিংয়ের হাইব্রিড ধানে হেটোরোসিস ঘটিয়ে ধানের উৎপাদনে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন। ড. নরম্যান বোরলকের মতো ড. ইউয়ান লংপিং অবিশ্বাস্যভাবে বিনীত ছিলেন, কখনো খ্যাতি বা প্রশংসার সন্ধান করেননি; বরং মনোনিবেশ করেছিলেন শুধু কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং গবেষণা ফলাফলের দ্বারা দারিদ্র্য দূরীকরণ ও ক্ষুধা থেকে মুক্ত করে মানুষের জীবনযাত্রার মান কীভাবে উন্নত করা যায়। প্রফেসর ইউয়ান বোরলকের মতোই ফসলের ফলনকে বিজ্ঞানের শক্তি ব্যবহার করে গুণিতকভাবে বৃদ্ধি করতে কাজ করে গেছেন। বিশ্বে যেকোনো ধরনের খাদ্যশস্যের তুলনায় সরাসরি ভক্ষণযোগ্য মানবখাদ্যের দিক থেকে ধান বা চালের অবস্থান শীর্ষে। সেদিক থেকে দেখলে ইউয়ানের আবিষ্কারের গুরুত্ব অপরিসীম।

বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর প্রধান খাদ্যশস্য হিসেবে ভাত বা ধান জনপ্রতি দৈনিক ক্যালরি চাহিদার ২০ শতাংশ সরবরাহ করে। অধ্যাপক ড. ইউয়ান লংপিং উদ্ভাবিত অতি উচ্চফলনশীল হাইব্রিড প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্বের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্যের জোগান অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়েছে—একথা প্রায় দ্বিধাহীনভাবেই বলা যায়। উল্লেখ্য, বিজ্ঞানী লংপিংয়ের প্রায় এক দশক নিরলস গবেষণা ও পরিশ্রমের ফলে ১৯৭৩ সালে প্রথম উচ্চফলনশীল হাইব্রিড ধানের জাত কৃষক পর্যায়ে সফলভাবে চাষ শুরু হয়। তারপর থেকে বিশ্বজুডে ক্ষুধা নিরসন এবং ক্ষুদ্র কৃষকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বিভিন্ন ধরনের হাইব্রিড ধান বিকাশ ও বাস্তবায়নে ব্যাপকভাবে কাজ শুরু হয়। গবেষকদের মতে, বিশ্বে ধান উৎপাদন অঞ্চলগুলোয় সাধারণ জাতের পরিবর্তে হাইব্রিড জাত চাষ করলে হেক্টরপ্রতি গড় ফলন দুই টন বাড়ানো সম্ভব। এতে বিশ্বব্যাপী মোট ধান উৎপাদন বছরে দেড় মিলিয়ন টন বৃদ্ধি পাবে। এ বাড়তি উৎপাদন দিয়ে প্রতি বছর ৮০০ থেকে ১ হাজার মিলিয়ন অতিরিক্ত লোকের খাদ্যের জোগান সরবরাহ করা সম্ভব। ড. লংপিংয়ের এ যুগান্তকারী উদ্ভাবন বিশ্বব্যাপী খাদ্য সুরক্ষা এবং সামাজিক শান্তি নিশ্চিত করতে যুগে যুগে অব্যাহতভাবে অবদান রাখবে। গণমানুষের খাদ্য সুরক্ষায় আজীবন কাজ করে যাওয়া এ মানুষটি তার জীবনের শেষ দিকে তৃতীয় প্রজন্মের হাইব্রিড ধানের জাত নিয়ে কাজ করেছেন। তৃতীয় প্রজন্মের এ হাইব্রিড ধানের হেক্টরপ্রতি ফলন ২২ দশমিক ৫ টন বলে সাম্প্রতিক রিপোর্টে জানা যায়, যা বিশ্বের খাদ্যশস্যের ক্রমবর্ধিষ্ণু চাহিদার জোগানে যুগান্তকারী অবদান রাখবে—একথা নিশ্চিন্তভাবে বলা যায়।

ধান বাংলাদেশের মতোই চীনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রধান খাদ্য। ড. ইউয়ানের গবেষণালব্ধ হাইব্রিড ১৯৭৩ সাল থেকেই চীনে চাষাবাদ শুরু হয়। উৎপাদন প্রযুক্তি সফলভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে খুব অল্প সময়েই হাইব্রিড ধান চীনের বিভিন্ন প্রদেশে ব্যাপকভাবে চাষাবাদ শুরু হয় এবং প্রতি একক জমিতে ফলনের দিক থেকে বিশ্বের প্রায় সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। হাইব্রিড ধান আবাদের মাধ্যমে চীনে ধানের ফলন প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে চীনে মোট ধানী জমির অর্ধেকের বেশি জমিতে হাইব্রিড ধান আবাদ হচ্ছে, যা দেশটিকে ধান উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষে উন্নীত করেছে। তার এ গবেষণার মাধ্যমে শুধু যে চীনে খাদ্যে স্থিতিশীলতা এসেছে তা নয়, বিশ্বের প্রায় ৮০টি স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে এ প্রযুক্তি বিস্তারের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ধান উৎপাদনে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। চীনের মতো বাংলাদেশও যেহেতু একটি ধাননির্ভর দেশ, তাই আমরাও চীন থেকে অভিজ্ঞ হাইব্রিড রাইস বিশেষজ্ঞ দল এনে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে হাইব্রিড ধানের বীজ উৎপাদন প্রযুক্তি সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জন এবং মাঠ পর্যায়ে তার সফল প্রয়োগের মাধ্যমে ধানের সার্বিক উৎপাদন বাড়াতে পারি।

ধান নিয়ে গবেষণায় নিবেদিতপ্রাণ এ বিজ্ঞানী যদিও অবসর সময় বেহালা ও তাস খেলা পছন্দ করতেন, তথাপিও ধানের জমিতে মোটরবাইক চালিয়ে ঘুরে বেড়াতেই তার অনেক বেশি আনন্দ হতো। বিশ্ববাসী এ ধান বিজ্ঞানীর অপরিসীম অবদান চিরকাল স্মরণ রাখবে।

হাইব্রিড ধানের জন্মকথা

ধানের দুটি দূর সম্পর্কীয় জাতের পরাগায়নে উদ্ভূত প্রজনিত প্রথম পুরুষটির নাম হাইব্রিড ধান। সহজ কথায় হাইব্রিড ধান দুটি জাতের প্রথম অপত্য বংশধর। উচ্চফলনশীল বা হাই ইল্ডিং ধানগুলোও দুটি জাতের সংকরীকরণের মাধ্যমে উদ্ভূত, তবে এ জাতগুলো পিতৃপুরুষের ষষ্ঠ/সপ্তম/অষ্টম অপত্য বংশধর। ১৯২৬ সালে বিজ্ঞানী জোনস দেখেছিলেন দুটি মানানসই ধানের যৌন মিলনে উদ্ভূত প্রথম অপত্য বংশধরটির ফলন ক্ষমতা পরবর্তী বংশধরদের ফলন ক্ষমতা অপেক্ষা বহুগুণ বেশি হয়। সারা বিশ্বের কৃষি প্রজননবিদরা এ তত্ত্বের যথার্থতা অনুধাবন করলেও ধানের ফলন উন্নয়ন কর্মসূচিতে এ কৌশল প্রয়োগের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রথম অপত্য বংশের বীজ উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা, কেননা ধানের ফুল দ্বিলিঙ্গ। অর্থাৎ ধানের একটি ফুলের মধ্যে পুংস্তবক ও স্ত্রীস্তবক উভয়ই বিদ্যমান। তাই ধানবীজ উৎপাদনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলো স্ব-পরাগ সংযোগ। সংকরীকরণের সময় প্রথমে দুটি জাতের একটির ফুলের ভেতর থেকে পুংস্তবকগুলো তুলে ফেলা হয়। তারপর অন্য জাতটির পরাগধানী থেকে পরাগ সংগ্রহ করে পুংস্তবক মুণ্ডিত প্রথম জাতটির গর্ভমুণ্ডের ওপর নিক্ষেপ করে নিষেক সম্পন্ন করা হয়। এ-জাতীয় দুর্বহ পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিমাণে বীজ উৎপাদন বাস্তবসম্মত নয় বলেই হাইব্রিড ধান গবেষণা থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছিলেন বিশ্বের অধিকাংশ বিজ্ঞানী। মুখ ফেরাননি শুধু চীনের বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. ইউয়ান লংপিং। নাছোড়বান্ধা এ বিজ্ঞানী ১৯৭০ সালে হাইনান দ্বীপে প্রকৃতির কোলে গজিয়ে ওঠা ধানের বন্য প্রজাতির মধ্যে হঠাৎই খুঁজে পেলেন পরাগ বন্ধ্যা ধানের গাছ। হুনান চাংসায় হাইব্রিড গবেষণা কেন্দ্রে ওই পরাগ বন্ধ্যা গাছটির বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে জানা গেল গাছটির পরাগ বন্ধ্যত্বের হোতা হলো তার কোষের সাইটোপ্লাজম। এ ধানের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য সাধারণ ধানের মতোই কিন্তু পুংস্তবকটি অকেজো। বিজ্ঞানীরা এ ধানের নাম দেন স্ত্রী ধান বা ‘এ’ লাইন। এ ধানটির পুংস্তবক অকেজো হওয়ার ফলে বংশবৃদ্ধি টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন হলো পরাগদানকারী এমন ধরনের ধান, যা ওই ধানের পুরুষ বন্ধ্যত্বসহ সব প্রকার চারিত্রিক বিশুদ্ধতা বজায় রেখে ধানটির বংশবৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। ধানের যে ব্যবহারিক জাতটির নিউক্লিয়াস প্রতিস্থাপন করে স্ত্রী ধানটি উদ্ভাবিত হয়েছিল, দেখা গেল সে ধানটির পরাগ থেকে সংগৃহীত পরাগ এ কাজটা সুষ্ঠুভাবে করতে পারছে। বিজ্ঞানীরা স্ত্রী ধানের প্রতিপালনের জন্য পরাগদাতা এ ধানটির নাম রাখলেন মেনটেনার অথবা ‘বি’ লাইন। এরপর খোঁজা শুরু হলো আরো এক বিশেষ প্রকৃতির ধান, মৃদুমন্দ বাতাস যার পরাগ বয়ে এনে স্ত্রী ধানের গর্ভমুণ্ডে নিক্ষেপ করে সৃষ্টি করবে অতি উচ্চফলনশীল হাইব্রিড ধানের জাত। কেননা যৌনজননে জাত ভ্রুণের কোষের সাইটোপ্লাজমের সবটুকু আসে মায়ের দিক থেকে। এক্ষেত্রে স্ত্রী ধানের অর্থাৎ মায়ের সাইটোপ্লাজম পুরুষত্ব বিনাশকারী হওয়ার সুবাদে নিষেকের পর ভ্রুণ থেকে বেড়ে ওঠা গাছটি বন্ধ্যা হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। বাণিজ্যিক হাইব্রিড ধান উদ্ভাবনের উদ্দেশ্যে গর্ভধানের জন্য প্রয়োজন সেই পরাগ পিতা, যার বংশগতিদত্ত শক্তি পরাগ বন্ধ্যা স্ত্রী ধানের পুংবৈশিষ্ট্য পুনরুদ্ধার করে ভ্রূণটিকে করে তুলতে পারে অতি উচ্চফলনশীল। নিবিড় অন্বেষণে অবশেষে পাওয়া গেল এ-জাতীয় একগুচ্ছ ব্যবহারিক ধানের জাত। বিজ্ঞানীরা এই বিশেষ ধানগুলোর নাম দিলেন রেসটোরার বা ‘আর’ লাইন। ১৯৭৩ সালে ধানবিজ্ঞানের তথ্যকোষে স্বর্ণাক্ষরে মুদ্রিত হলো চীনা বিজ্ঞানীদের আবিষ্কৃত ভিন গোষ্ঠীর তিনটি ব্যবহারিক ধান—‘এ’, ‘বি’ ও ‘আর’ লাইন।

এ তিনটি ধানের যোগসূত্রে ১৯৭৪ সালে চীনে উদ্ভাবিত হলো বিশ্বের প্রথম হাইব্রিড ধান। ১৯৭৫ সালে সারা দেশে মোট ৩৭৩ হেক্টর জমিতে প্রাথমিক মূল্যায়নের পর বিশ্বের প্রথম হাইব্রিড ধানটি বাণিজ্যিক আকারে চাষের জন্য সরকারি ছাড়পত্র পেল ১৯৭৬ সালে। উচ্চফলনশীল ধানের পাশাপাশি শুরু হলো অতি উচ্চফলনশীল হাইব্রিড ধানের চাষ। দুই দশকের কম সময়ের মধ্যেই চীনে ৫০ শতাংশ ধানী জমিতে পৌঁছে গেছে হাইব্রিড ধান।

বাংলাদেশ গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা বিধৌত একটি বৃহৎ সমতল ব-দ্বীপ, যেখানে প্রায় গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সরস জলবায়ুর প্রভাব ধানের জন্য তৈরি করেছে এক চমত্কার উর্বর সমভূমি। ঐতিহ্যগতভাবেই যুগ যুগ ধরে ভাত এ দেশের মানুষের প্রধান খাদ্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। জনবসতির তুলনায় আয়তনে ক্ষুদ্র এ দেশের জনসংখ্যা ক্রমাগতহারে বাড়তে থাকায় ধান উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে বিস্তর ফারাক তৈরি হচ্ছে। ফলে ধান উৎপাদনে সনাতন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্রমবর্ধিষ্ণু এ জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটাতে উচ্চফলনশীল হাইব্রিড ধানের জাত ব্যাপক প্রবর্তন প্রয়োজন। উল্লেখ্য, এই উপমহাদেশে ধান গবেষণা সূচনা ১৯১০ সাল থেকে শুরু হলেও বাংলাদেশে ১৯৬০ সালে আইআর ৮ প্রবর্তনের মাধ্যমে এর অগ্রযাত্রা শুরু হয়। এরপর ১৯৯৮ সালে কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে ‘আলোক ধান’ নামে হাইব্রিড ধানের বাজারজাত এবং উৎপাদন শুরু হয়।

বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তায় ধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শস্য হিসেবে ভূমিকা রাখছে। এ দেশে মাথাপিছু ধানের চাহিদা ২৬৮ দশমিক ৫ কেজি, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। এ ধান আমাদের খাদ্যে প্রায় ৬৯ শতাংশ ক্যালরি শক্তির জোগানদাতা এবং ১৫ শতাংশ প্রোটিন সরবরাহ করছে। অতএব, আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি শুধু ধানের মাধ্যমেই এ দেশের একটা বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে। আমাদের প্রায় ৮ দশমিক ৬ মিলিয়ন হেক্টর আবাদি জমির ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে ধান আবাদ করা হয় (৭৫%), যেখানে ৬০ দশমিক ৮ মিলিয়ন শ্রমজীবীর মাঝে ২৪ দশমিক ৭ মিলিয়ন (৪১%) কৃষি শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত আছে।

বর্তমানে চীন, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার পরেই ধান উৎপাদনে মাত্র ৪ দশমিক ৭ টন/হে. গড় ফলন নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। অর্থাৎ ১১ দশমিক ৫ মিলিয়ন হেক্টর ধানী জমি থেকে মোট উৎপাদন ৫৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন টন। সরকারি তথ্যমতে, এ বছর বোরো ধানের বাম্পার ফলনে রেকর্ড গড়েছে দেশ। হিট শক ও শিলাবৃষ্টির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ইতিহাস গড়া ২ কোটি ৭ লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে ধান উৎপাদন, যা গত বছরের তুলনায় ১১ লাখ টন বেশি। এবারের এই বাড়তি উৎপাদনের নেপথ্যে হাইব্রিড ধান আবাদের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ধান উৎপাদন উলম্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে হাইব্রিড ধান চাষে এবার বিশেষ জোর দেয়া হয়েছিল। অর্থাৎ গতবারের তুলনায় প্রায় ৩৭ শতাংশ বেশি জমিতে হাইব্রিড ধান আবাদ করা হয়েছিল। মোট উৎপাদনের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, হাইব্রিড ধানের গড় ফলন সাধারণ ধানের তুলনায় প্রায় এক থেকে দেড় টন বেশি হয়েছে। কাজেই একথা প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, বাংলাদেশে ২০৫০ সালের মধ্যে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৪২ দশমিক ২ মিলিয়ন টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে হাইব্রিড ধান চাষের আওতা বাড়াতেই হবে।

একথা সর্বজনবিদিত যে দেশে দিন দিন আবাদি জমির পরিমাণ কমছে অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বসতবাড়ি, শিল্প-কারখানা ও নগরায়ণের ফলে। ১৯৬১ সালে যেখানে জনপ্রতি আবাদি জমি ছিল শূন্য দশমিক ১৭ হেক্টর, সেখানে ২০১৬ সালে এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ৫ হেক্টরে। এতে ধান চাষে জমির আওতা বাড়ানোর আশা করা বাতুলতা মাত্র, বরং আমাদের মনোযোগী হতে হবে ফলন বৃদ্ধির দিকে। তাই উচ্চফলনশীল হাইব্রিড চাষের কোনো বিকল্প নেই, বরং আমাদের মনোনিবেশ করতে হবে বাংলাদেশের জলবায়ু উপযোগী সঠিক জাত নির্বাচনে।

বাংলাদেশে হাইব্রিড ধান

বাংলাদেশে জলবায়ু উপযোগী ‘এ’ লাইন উদ্ভাবন/নির্বাচন, নির্বাচিত ‘এ’ লাইনের উপযুক্ত ‘আর’ লাইন চিহ্নিতকরণ, হাইব্রিড ধান উদ্ভাবন, উদ্ভাবিত হাইব্রিডের ফলনের নিরীক্ষা ইত্যাদি একযোগে চলেছে। সমন্বিত নিবিড় গবেষণায় ২০২১ সাল পর্যন্ত উদ্ভাবিত জাতগুলোর মধ্যে ২০১টি হাইব্রিড ধানের জাত বাংলাদেশে বাণিজ্যিক চাষের ছাড়পত্র পেয়েছে, যার মধ্যে ৭৪ শতাংশের উৎস চীন, ১৯ শতাংশ ভারত এবং বাকি মাত্র ৬ শতাংশের উদ্ভাবক বাংলাদেশ। দেশীয় উদ্ভাবকের মধ্যে ব্রি উদ্ভাবন করেছে সাতটি এবং বশেমুরকৃবি ও বিএডিসি উদ্ভাবন করেছে একটি করে। এসব হাইব্রিডের মধ্যে ১৩টি আমন, ৫টি আউশ এবং বাকিগুলো বোরো মৌসুমের জন্য উপযোগী। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২০-২১ সালে ৩৮টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান ৫ হাজার ৮০০ টন হাইব্রিড ধান, ১৮০ হাজার কেজি এ-লাইন এবং তার সঙ্গে সমন্বয় করে ৫৩ হাজার টন আর-লাইন বীজ আমদানি করেছে।

বর্তমানে চীন ছাড়াও ভারত, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, কলম্বিয়া, শ্রীলংকা প্রভৃতি দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশেও হাইব্রিড ধান চাষ দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বর্তমানে এ দেশে হাইব্রিড ধান আবাদ হচ্ছে ১ দশমিক ২ মিলিয়ন হেক্টরেরও বেশি জমিতে। অর্থাৎ বোরো মৌসুমে দেশের শতকরা ২৫ ভাগ ধানের জমি বর্তমানে হাইব্রিড চাষের আওতায় চলে এসেছে। অধিক উৎপাদনশীলতার জন্য দেশের হাওড় অঞ্চলগুলোয় দিন দিন হাইব্রিড ধানের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। ধান উৎপাদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, দেশের সাতটি হাওড় অঞ্চলের প্রায় এক মিলিয়ন হেক্টর জমিকে যদি শতভাগ হাইব্রিড চাষের আওতায় নিয়ে আসা যায়, তাহলে বছরে প্রায় ২ দশমিক ৭ মিলিয়ন টন অতিরিক্ত ধান উৎপাদন সম্ভব; যা আমাদের খাদ্যনিরাপত্তায় বিরাট ভূমিকা রাখবে। পরিশেষে একথা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায়, এ মহাবিজ্ঞানীর উদ্ভাবন বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তায় ভূমিকা রেখে চলেছে এবং তার উদ্ভাবিত এ হাইব্রিড ধান সারা পৃথিবীর কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে।

 

ড. মো. রমিজ উদ্দিন: অধ্যাপক, কৃষিতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

ড. আ হ ম আসাদুর রহমান: উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

ড. মোহাম্মদ মোজাহিদুল ইসলাম: ডিএজিএম, এমএনটি বীজ গবেষণাগার, লালতীর সিড লিমিটেড, ঢাকা