বাংলাদেশ একটি নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ যার জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আমাদের দেশ তার স্বাস্থ্য সূচকগুলোর উন্নতিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে এখনো বাংলাদেশকে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জগুলো অতিক্রম করা বাকি রয়েছে। এসবের মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কীভাবে অপ্রাপ্য স্বাস্থ্যসম্পদ ও সংস্থানগুলোকে সঠিকভাবে বরাদ্দ করা যায়, যা একই সঙ্গে কার্যকর এবং দক্ষ প্রয়োগ দুটোই কাজ করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ এবং ব্যয়-কার্যকারিতা বিশ্লেষণী মূল্যায়নের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মূলত ব্যয়-সুবিধা এবং ব্যয়-কার্যকারিতা বিশ্লেষণ দুটি অর্থনৈতিক মূল্যায়ন পদ্ধতি যা কোনো পরিকল্পনা, প্রকল্প বা খাতের জন্য নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের কীভাবে দুর্লভ ও অপ্রাপ্য স্বাস্থ্যসম্পদ সুষ্ঠু ও সঠিকভাবে বরাদ্দ করা যায় সে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে থাকে। এ বিশ্লেষণমূলক পদ্ধতিগুলো নীতিনির্ধারক, স্বাস্থ্যসেবা পেশাদার, স্টেকহোল্ডারদের সম্পদের সঠিক উপযুক্ত বরাদ্দ ও বণ্টনে এবং স্বাস্থ্যসেবার কোন ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ প্রয়োজন সে সম্পর্কে অবহিত ও সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে থাকে। ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ (কস্ট বেনিফিট অ্যানালাইসিস-সিবিএ) আর্থিক বিষয়াদিতে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ব্যয় এবং প্রাপ্ত সুবিধাগুলো পরিমাপ করে থাকে। সহজ ভাষায় ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ হলো, একটি প্রকল্পের ব্যয়-সুবিধা নির্ধারণ ও তুলনা করার পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া। এটি বহুমুখী পদ্ধতি যা প্রায়ই ব্যবসা, প্রকল্প এবং পাবলিক পলিসি সিদ্ধান্ত তৈরির জন্য ব্যবহার হয়। অন্যদিকে ব্যয়-কার্যকারিতা বিশ্লেষণ (কস্ট এফিক্টিভ অ্যানালাইসিস-সিইএ) স্বাস্থ্যসেবা ক্ষেত্রের মোট ফলাফল বিবেচনা করে ব্যয় এবং প্রাপ্ত সুবিধাগুলোকে পরিমাপ করে থাকে। যেমন মানুষের জীবনের আয়ু কতটা বেড়েছে বা গুণগত মানের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্য রেখে জীবনের আয়ু বেড়েছে এসব দেখা হয়ে থাকে। দুটি পদ্ধতির মধ্যে ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণের চেয়ে আরো বিস্তৃত পদ্ধতি হচ্ছে ব্যয়-কার্যকারিতা বিশ্লেষণ। এটি আর্থিক ও অ-আর্থিক উভয় ক্ষেত্রে ব্যবহার হওয়ায় সব ব্যয় ও সুবিধাকে বিবেচনায় নেয়া হয়ে থাকে। আর ব্যয়-কার্যকারিতা বিশ্লেষণের চেয়ে ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ পরিচালনা করা আরো কঠিন হতে পারে। কারণ এর জন্য জীবনযাত্রার উন্নতমানের মতো অ-আর্থিক সুবিধাগুলোকে মূল্যায়নের প্রয়োজন পড়ে। আর ব্যয়-কার্যকারিতা বিশ্লেষণের চেয়ে ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ কম বিস্তৃত পদ্ধতি, তবে এটি পরিচালনা করা তুলনামূলকভাবে সহজ। ব্যয়-কার্যকারিতা বিশ্লেষণের মধ্যে বিভিন্ন খাতে ব্যয় এবং সুবিধাগুলোকে তুলনার জন্য ব্যবহার করা হয় যেখানে একই ফলাফল রয়েছে, যেমন মানুষকে জীবনে কত বছর বাঁচানো গেল ইত্যাদি।
ঠিক এ পদ্ধতি অনুসরণ করে সরকার ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণকে ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে দেশে একটি নতুন ক্যান্সার স্ক্রিনিং প্রোগ্রামে অর্থায়ন করা হবে। সরকার বিশ্লেষণ মূল্যায়ন করে দেখেছে যে প্রোগ্রাম বা প্রকল্পটি সাশ্রয়ী আর তাই এটি তারা তখন থেকে বাস্তবায়ন কাজ শুরু করে দিয়েছে। ব্যয়-সুবিধা এবং ব্যয়-কার্যকারিতা বিশ্লেষণ পদ্ধতিগুলো কোনো নির্দিষ্ট রোগের জন্য বিভিন্ন চিকিৎসার বিকল্পগুলোর ব্যয় এবং তা থেকে প্রাপ্ত সুবিধাগুলো তুলনা করতেও ব্যবহার হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, চিকিৎসকরা কোনো রোগীর জন্য একটি নতুন ওষুধ লিখে দেবেন কিনা তার সিদ্ধান্ত নিতে ব্যয়-কার্যকারিতা বিশ্লেষণ ব্যবহার করতে পারেন। রোগীর স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য ওষুধের সুবিধার বিপরীতে ডাক্তারের দেয়া ওষুধের মোট ব্যয়ের মধ্যে যেমন ওষুধের কাঁচামালের ব্যয় এবং তার কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকলে সেগুলোর ব্যয়ও পরিমাপ করতে পারবেন।
এ দুই পদ্ধতির যেকোনো প্রতিবন্ধকতা নেই এমনটি নয়, ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ এবং ব্যয়-কার্যকারিতা বিশ্লেষণের নিজস্ব কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ এবং ব্যয়-কার্যকারিতা বিশ্লেষণ থেকে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি পাওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে তাদের বাস্তবায়ন বেশ চ্যালেঞ্জিং কাজ। আমাদের সীমিত ডাটা প্রাপ্যতা, বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে ব্যয় ও মোট ফলাফল সম্পর্কিত স্বল্প তথ্য একটি উল্লেখযোগ্য বাধা তৈরি করেছে। সীমাবদ্ধতাগুলোর জন্য এ পদ্ধতি পরিচালনা করা কঠিন হতে পারে, বিশেষ করে যখন কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা যায় এমন ব্যয় এবং সুবিধা সম্পর্কে কোনো ধরনের নিশ্চয়তার তথ্য পাওয়া যায় না। আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো, এ পদ্ধতি এমন সিদ্ধান্তকে ন্যায়সংগত করতে ব্যবহার করা হতে পারে, যা কোনো রোগীর স্বার্থের জন্য ভালো নয়। উদাহরণস্বরূপ, কোনো সরকার নতুন ক্যান্সার স্ক্রিনিং প্রোগ্রামের তহবিল না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে এ ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারে। এমনকি যদি প্রোগ্রামটি ব্যয়সাশ্রয়ী হয়েও থাকে এবং যদি সরকার বিশ্বাস করে যে প্রোগ্রামটি জনসাধারণের তহবিলের উপযুক্ত ব্যবহার নয় তাহলে তারা ইচ্ছা করলে এমন কাজ করতে পারে। এ পদ্ধতিগুলোয় বিশ্লেষণের প্রাসঙ্গিকতা এবং প্রযোজ্যতা নিশ্চিতে বাংলাদেশের জন্য বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো অবশ্যই বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ এবং ব্যয়-কার্যকারিতা বিশ্লেষণের ভূমিকা ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তবে এ পদ্ধতিগুলোর সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে নীতিনির্ধারক ও স্টেকহোল্ডারদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন, যেকোনো ক্লিনিক্যাল বিচার করা বা রোগীর পছন্দমতো অন্যান্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের এ পদ্ধতিকে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যয়-সুবিধা এবং ব্যয়-কার্যকারিতা বিশ্লেষণ স্বাস্থ্যসেবা খাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের বিভিন্ন উপায়ে দুর্লভ ও অপ্রাপ্য স্বাস্থ্যসম্পদ কীভাবে সঠিক ও সুষ্ঠু বরাদ্দ করা যায় সে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে বড় আকারে সহায়তা করতে পারে। যেমন স্বাস্থ্যসেবার মোট ফলাফল উন্নতির জন্য সবচেয়ে সাশ্রয়ী পথগুলোকে এভাবে শনাক্ত করা যেতে পারে। একটি নির্দিষ্ট রোগের জন্য বিভিন্ন চিকিৎসার বিকল্পগুলোর ব্যয় ও সুবিধাগুলো তুলনা করা যেতে পারে। এবং সর্বোপরি নতুন কোনো স্বাস্থ্য প্রোগ্রামের জন্য অর্থায়ন করা হবে কিনা সে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতেও সহায়তা করতে পারে। তাই ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ এবং ব্যয়-কার্যকারিতা বিশ্লেষণ ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের নীতিনির্ধারক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা তাদের স্বাস্থ্য ব্যয়ের দক্ষতাভিত্তিক এবং কার্যকারিতা উন্নত করতে পারবেন। আর সেটাই সার্বিকভাবে জনস্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে কার্যকর রূপে কাজে আসবে। মূলত এসব বিশ্লেষণমূলক পদ্ধতি যেকোনো প্রকল্পে প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাজকে সহজ করে তোলে, সম্পদ অপ্টিমাইজেশনকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি উন্নত স্বাস্থ্যসেবার মোট ফলাফল তৈরিতেও অবদান রাখে। তাছাড়া স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগে ইতিবাচক রিটার্ন পাওয়ার জন্য কোনো কোনো ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং ব্যয়-কার্যকরী করার কলাকৌশলগুলো শনাক্ত করতে হবে। আর এভাবেই বাংলাদেশ আরো ন্যায়সংগত ও দক্ষ স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা অর্জনের দিকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করতে পারে। আমাদের স্বাস্থ্য খাতের নীতিনির্ধারক সিদ্ধান্ত গ্রহীতা এবং স্টেকহোল্ডারদের জন্য এমন বিশ্লেষণমূলক পদ্ধতিগুলো গ্রহণ এবং দেশের স্বাস্থ্যসেবা চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলায় সেগুলোকে কাজে লাগানো অপরিহার্য। আর যদি এমনটা করা সম্ভব হয় তাহলেই স্বাস্থ্যসেবা খাতে গুণগত পরিবর্তনের আশা করা যায়।
মো. আবিদ মঈন খান: সাংবাদিক










