অতিমারী প্রভাবিত সরবরাহ ঘাটতি উন্নত দেশগুলোয় জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। চীনা উৎপাদন খাতের ওপর অতিনির্ভরতা সম্পর্কে উদ্বিগ্ন হয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপান প্রত্যেকেই উৎপাদন প্রক্রিয়া স্থানান্তরের উদ্যোগ প্রস্তাব করেছে। শুধু উন্নত দেশ নয়, উন্নয়নশীল বিশ্বেও বাণিজ্য-শিল্প-নিরাপত্তা সেতুবন্ধের ভূরাজনীতিকায়ন ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। বলকান থেকে শুরু করে লাতিন আমেরিকার অনেক দেশের সরকারই উৎপাদন প্রক্রিয়া নিজ দেশে (রিশোরিং) কিংবা পার্শ্ববর্তী কোনো দেশে স্থানান্তরের (নিয়ারশোরিং) বিষয়কে কভিড-পরবর্তী একটি বড় অর্থনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখছে।
এ ধরনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা অতি আশাবাদের বিষয় প্রমাণ হতে পারে। আমরা দেখছি জাস্ট-ইন-টাইম ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের ব্যাপকতর পতন সত্ত্বেও মহামারীর দুই বছরে চীনের রফতানি শক্তিশালী থেকেছে। এর কারণ সরবরাহ দিকের আপেক্ষিক স্থায়িত্বশীলতা এবং বৈশ্বিক চাহিদা সেবা থেকে পণ্যে স্থানান্তর। তদুপরি তথ্য ইঙ্গিত দেয় যে লাতিন আমেরিকার অনেক দেশ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রফতানির ক্ষেত্রে চীন কিংবা এশিয়ার অন্য দেশগুলোকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি—এমনকি কভিডকালের সুযোগ এবং মেক্সিকো ও ব্রাজিলের বিপরীতে চীনের শ্রমব্যয়ের সুবিধা কমার প্রেক্ষাপটে অঞ্চলটিতে বড় কোম্পানিগুলোর শিল্প-কারখানা স্থানান্তরের (নিয়ারশোরিং) সম্ভাবনা সত্ত্বেও।
প্রাথমিকভাবে যেমনটা মনে হয়েছিল, সরবরাহ ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি তার চেয়েও জটিল হয়েছে। এ অবস্থায় বিশেষ করে এশিয়াকে প্রভূত সুফল দেয়া তিন দশকের আন্তর্জাতিক উৎপাদন ধরনের পরিবর্তনহীনতা অনুকূল ভূগোল, আংশিক ব্যয় সাশ্রয় কিংবা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রণোদনার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে। এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিবেচনার দাবি রাখে।
প্রথমত, যেসব দেশের সরকার উৎপাদন প্রক্রিয়া নিজের দেশে কিংবা পার্শ্ববর্তী কোনো দেশে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করছে, তাদের অবশ্যই অর্থনৈতিক মৌলিক বিষয়গুলোয় ফিরে যেতে হবে। তাদের বুঝতে হবে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিয়ন্ত্রণমূলক ও আইনগত নিশ্চয়তা, সহজীকরণ, ভৌত অবকাঠামো, শিক্ষা ও দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা ও উদ্ভাবন, রফতানি উন্নয়ন ও পরিপূরক সুবিধাদি বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ মৌলিক বিষয়ে (ডমেস্টিক ফান্ডামেন্টালস) টেকসই উন্নয়ন ছাড়া বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ হবে সীমিত ও স্বল্পমেয়াদি। আর কার্যকর সরকারি প্রতিষ্ঠান ও নীতিই হলো এসব মৌলিক বিষয় উন্নয়নের অত্যাবশ্যকীয় শর্ত।
দ্বিতীয়ত, বিদ্যমান বা সম্ভাব্য আপেক্ষিক সুবিধা বিষয়ে অনুপুঙ্খ মূল্যায়নের ভিত্তিতে ‘উইনার’ কোম্পানিগুলোকে নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকারগুলোকে অবশ্যই বাস্তবসম্মত ও কৌশলী হতে হবে। নির্বিচারে নাজুক কোম্পানিগুলোকে সমর্থন প্রদান অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ঝুঁকিতে ফেলে এবং ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ নিঃশেষিত করে। বিশেষ করে অনেক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে (এলএমআইসি) আজকের বাজেট সীমাবদ্ধতার পরিস্থিতিতে এর একটা তাত্পর্যপূর্ণ সুযোগ ব্যয়ও বিদ্যমান। এছাড়া আমদানি বিকল্প শিল্পায়নে অতিমাত্রায় মনোযোগ দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের চেয়ে অদক্ষ সম্পদ বণ্টনে পর্যবসিত হতে পারে, যেমনটা বিশ শতকের তৃতীয় প্রান্তিকে লাতিন আমেরিকায় হয়েছিল।
তৃতীয়ত, বাণিজ্য, বৃহত্তর অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, উন্মুক্ততা উদ্দীপ্ত করা এবং স্ট্যান্ডার্ড সেটিংয়ের জন্য আঞ্চলিক একীভূতকরণ একটা শক্তিশালী টুল হিসেবে রয়ে গেছে। উদাহরণ হিসেবে এক্ষেত্রে আসিয়ান পরিচালিত রিজিওনাল কম্প্র্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপের (আরসিইপি) কথা বিবেচনা করুন, যেটি চলতি বছর কার্যকর হয়েছে। বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ধারণকারী আরসিইপি এখন কেবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য জোটই নয়, উপরন্তু এটি এশিয়ায় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির গুণক প্রভাব বিস্তারে একটা গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকও বটে। একইভাবে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা হ্রাস এবং অন্য পরিপূরক নীতি সংস্কারের সুযোগ দেয়ার মাধ্যমে বছর পুরনো আফ্রিকান কন্টিনেন্টাল ফ্রি ট্রেড এরিয়া (এএফসিএফটিএ) ২০৩৫ সাল নাগাদ তিন কোটি মানুষকে হতদরিদ্র থেকে উত্তরণ ঘটাতে সাহায্য করবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক একীভূতকরণ গভীরতর করা এবং বাণিজ্যের বাইরে সমন্বয়ের চাহিদা বাড়তে থাকবে (বিনিয়োগ সুরক্ষা, শ্রম ও পরিবেশগত মান ও সম্পত্তি অধিকার সমন্বয়কারী ‘ডিপ ট্রেড এগ্রিমেন্ট’ ও জি৭-এর মতো বৈশ্বিক ন্যূনতম করপোরেট আয়করের মাধ্যমে)।
চতুর্থত, ‘পুরনো’ শিল্পনীতির প্লেবুক থেকে মূল্যবান শিক্ষা গ্রহণ ছাড়াও সরকারগুলোকে নতুন সুযোগ ও চ্যালেঞ্জে গভীর মনোযোগ দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যের ডিজিটালাইজেশন (বিশেষ করে সফটওয়্যার ও বিজনেস প্রসেস) প্রবেশ প্রতিবন্ধকতাগুলো এবং পুরো রফতানি খাতে ব্যয় কমালেও পরিবেশগত সচেতনতা বৃদ্ধি ও নতুন কমপ্লায়েন্স স্ট্যান্ডার্ড (যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম) শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সবুজবান্ধব হওয়ার প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেবে।
চূড়ান্ত ও প্রাসঙ্গিকভাবে সম্মুখদর্শী নীতিনির্ধারণের জন্য রাজনীতি ও ভূরাজনীতির বাইরে কিছু কঠিন প্রশ্নের উত্তরও দরকার হবে। কিছু বিশেষজ্ঞ যেমনটা প্রশ্ন তোলেন যে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে উৎপাদন প্রক্রিয়া নিজ দেশে ও প্রতিবেশী কোনো দেশে স্থানান্তর আসলে আদৌ বড় সুযোগ কিনা, নাকি তার পরিবর্তে সরকারগুলোর অন্য প্রাধিকারগুলোয় নজর দেয়া উচিত? আর দীর্ঘমেয়াদে কী ধরনের শিল্পায়ন ও বাণিজ্যনীতি সবচেয়ে সুফলপ্রদায়ী এবং ভবিষ্যতের জন্য টেকসই হবে?
উন্নত অর্থনীতিগুলোর জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ নিহিত সেই সমস্যা সমাধান করা। অ্যাডাম পোজেন যাকে বলেছেন, ‘নস্টালজিয়া অর ফ্যাটিশাইজেশন অব ম্যানুফ্যাকচারিং জবস’। সন্দেহ নেই, গতানুগতিক উৎপাদন খাতের চাকরিগুলো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যদিও উচ্চ আয়ের দেশগুলোর সার্বিক কর্মসংস্থানে ওই ধরনের চাকরির অংশ তেমন বাড়েনি। চূড়ান্ত শ্রমবাজার অভিযোজন সহজ করার জন্য কাজেই দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি। সেমিকন্ডাক্টর এবং ওষুধ খাতের মতো ব্যাপক স্পর্শকাতর কিছু খাত তাদের মধ্যে অন্যতম, যেগুলো উৎপাদন প্রক্রিয়া নিজ দেশে স্থানান্তরের ফলে অর্থবহভাবে লাভবান হতে পারে।
শ্রমব্যয় সুবিধা, বর্ধিত অবকাঠামো ও বৈশ্বিক সরবরাহ নিগড়ের হ্রস্বতা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য সময়ান্তরে সুযোগ সৃষ্টি করবে, বিশেষ করে চীন যেহেতু আরো জটিল-সূক্ষ্ম, উচ্চমূল্য সংযোজিত উৎপাদনের দিকে যাচ্ছে। যদিও দেশগুলো এসব সুবিধা কতটা প্রকৃত বিনিয়োগ ও রফতানি সুফল অর্জনে রূপান্তর করতে পারবে, সেটি নির্ভর করবে মৌলিক অধিকার প্রাপ্তির ওপর। দেশ, অঞ্চল ও উন্নয়নের স্তরভেদে সেখানে নিশ্চয়ই উল্লেখযোগ্য ভিন্নতা হবে। কিছু উৎপাদন প্রক্রিয়া উন্নত দেশগুলোয় ফিরে যাওয়ার মাধ্যমে রোবটিকস ও অটোমেশনও একটা বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে বৈকি।
এলএমআইসিগুলোর জন্য আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এশিয়ার ব্যাঘ্র অর্থনীতির জন্য উৎপাদনভিত্তিক, শ্রমনিবিড়, রফতানি প্রবৃদ্ধি মডেল আরো ২০ বছর বা ততোধিক সময়ের জন্য পর্যাপ্তভাবে কার্যকর থাকবে কিনা। এ উত্তপ্ত বিতর্কে সংশয়বাদীরা বলেন, যেহেতু বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিতে বাণিজ্যের অবদান স্থবির কিংবা ক্রমহ্রাসমাণ, কাজেই রফতানিমুখী প্রবৃদ্ধি নীতিগুলো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন হতে পারে।
বৈপ্লবিক পরিবর্তন রাতারাতি হবে না, শিল্প আধুনিকায়ন ও পণ্যসেবায় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি জরুরি হবে এবং উৎপাদকরা এককভাবে অভ্যন্তরীণ বাজারে নিজস্ব পণ্যের জোগান দেবে (পড়ুন তারা রফতানিকারক হবে না)—এ তিনটি অন্তর্নিহিত মূল্যায়নের বিষয়ে এমনকি সংশয়বাদীরা একমত হলেও নিম্ন প্রান্তের সরবরাহকারী বা উচ্চপ্রান্তের অংশীদারদের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ সম্পূর্ণভাবে বিলীন হবে না।
সরবরাহ ব্যবস্থার ভূরাজনীতিকায়ন নয়, উল্লিখিত বিবেচ্যগুলো আমলে নিয়েই শিল্পনীতিতে সরকারের আগ্রহ ও প্রাধিকারগুলো ঠিক করা উচিত। আর্থিক অবস্থানের অবনমন এবং বিশ্বজুড়ে ভর্তুকি বৃদ্ধির একটা স্ববিরোধী প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে এলএমআইসিগুলোকে চাঙ্গা করতে সুস্পষ্ট নীতিনির্ধারণ এবং সুন্দরভাবে টার্গেটকৃত, নৈপুণ্যভিত্তিক আর্থিক সমর্থন আগের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি।
অর্থনৈতিক মৌলিক বিষয়ের প্রতি
অঙ্গীকারবদ্ধ দেশগুলোর
জন্য উৎপাদন
প্রক্রিয়া নিজ
ভূখণ্ডে ও প্রতিবেশী দেশে
স্থানান্তর এবং
জাতীয় শিল্প
বা রফতানির
বৃহত্তর পুনরুজ্জীবনের আশা পূরণ অনেক
সহজ হবে।
অন্যদিকে যেসব
দেশ নিছকই
রাজনৈতিক আলোচনার
বিষয় হিসেবে
সরবরাহ ব্যবস্থা
সংস্কারের বিষয়টি
ব্যবহার করে,
তাদের জন্য
তা পূরণ
করা অনেক
কঠিন হবে।
মনে রাখতে
হবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কোনো শর্টকাট
রাস্তা নেই।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
অক্টাভিয়ানো ক্যানোটো: বিশ্বব্যাংকের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও নির্বাহী পরিচালক
জাস্টিন ইয়ুফো লিন: বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, ইনস্টিটিউট অব নিউ স্ট্রাকচারাল ইকোনমি এবং ইনস্টিটিউট অব সাউথ-সাউথ কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ডিন
পেপে ঝাং: আটলান্টিক কাউন্সিলের অ্যাড্রিন আর্শট লাতিন আমেরিকা সেন্টারের সহযোগী পরিচালক ও ফেলো
ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির










