শীর্ষ ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে আদালত থেকে ইস্যুকৃত গ্রেফতারি পরোয়ানা যথাসময়ে তামিল না হওয়ায় দায়েরকৃত মামলা যথাসময়ে নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না। ঋণখেলাপিদের গ্রেফতার না করায় বিশেষ এ আদালত প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে না। তাই আদালত থেকে ইস্যুকৃত চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের আওতাধীন থানাগুলোয় পেন্ডিং থাকা ওয়ারেন্টগুলো তামিল নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। অর্থঋণ আদালত দেশের ফাস্টট্র্যাক আইন। এ বিবেচনায় দ্রুততম সময়ের মধ্যেই অর্থঋণ আদালতের মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার কথা। কিন্তু নানা কারণে অর্থঋণ আদালতের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে মামলা চলাকালেই ব্যাংকের সঙ্গে ঋণখেলাপিদের সমঝোতা হয়ে যায়। কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংকাররাই চান না মামলা নিষ্পত্তি হোক। আবার অর্থঋণ আদালতে দায়েরকৃত মামলার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে আসা হচ্ছে। বড় ঋণখেলাপিরা মামলার নিষ্পত্তি ঠেকাতে আদালতে হাজির হচ্ছেন না, সমন জারি করলেও আসছেন না, এমনকি গ্রেফতারি পরোয়ানাও তামিল না করাসহ বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। আদালত ও বিচারকের স্বল্পতাও অর্থঋণ আদালতকে দীর্ঘসূত্রতায় ঠেলে দিচ্ছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনায় এগুলোও বড় প্রতিবন্ধক। দ্রুতই এসব সমস্যার সমাধানে পদক্ষেপ নিতে হবে।

ঋণখেলাপিদের মধ্যে দৃশ্যমান দুটি শ্রেণী আছে। একটি শ্রেণী ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও নানা প্রতিকূলতার কারণে ঋণের টাকা পরিশোধ করতে পারছেন না। এরাই হচ্ছে প্রকৃত ঋণখেলাপি। এদের ঋণ পরিশোধে সামর্থ্যবান করে তোলার জন্য ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয়াসহ নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করা যেতে পারে। আরেক শ্রেণী আছে যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকঋণ পরিশোধ করতে চায় না। এরাই হলো ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি। এদের কোনো ধরনের ছাড় দেয়া উচিত নয়। সময়ক্ষেপণ না করে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেয়া দরকার। আমাদের দেশে এখনো খেলাপিদের আলাদা কোনো সংজ্ঞা নেই। রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া স্বেচ্ছাখেলাপিদের সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশের খেলাপি গ্রাহকদের জন্য যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বিদ্যমান, তা সব ধরনের খেলাপির জন্য অভিন্ন। অথচ স্বেচ্ছাখেলাপিদের অপরাধ ঘৃণ্য প্রকৃতির। ব্যাংক ব্যবস্থা সঠিকভাবে পরিচালিত না হলে একটি দেশের অর্থনীতি ভালোভাবে পরিচালিত হতে পারে না। তাই ব্যাংক ব্যবস্থাকে সঠিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ে আরো কঠোর আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে চট্টগ্রামে শীর্ষ ঋণখেলাপিদের গ্রেফতারে আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। নির্বাহী প্রশাসন বিচার বিভাগকে সহযোগিতা না করলে ঋণখেলাপির মতো বড় সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব নয়।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে সবচেয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে চীন। দেশটির ঋণখেলাপিদের আমানত জব্দ করা হয়েছে। এদের মধ্যে ঋণখেলাপিকে বিমান ও দ্রুতগতির ট্রেনে চড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এসব খেলাপিকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয় ঋণ ও ক্রেডিট কার্ড প্রাপ্তিতেও। পাশাপাশি তাদের (ঋণখেলাপি) সন্তানদের দামি স্কুলে ভর্তির ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এসব কঠোর পদক্ষেপের সুফলও পেয়েছে চীন। নেপালে ঋণখেলাপিদের পাসপোর্ট সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। ভিয়েতনামের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে এ ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। ভারতও খেলাপির হার কমিয়ে আনতে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে দেশটির মন্ত্রিসভা ‘ফিউজিটিভ ইকোনমিক অফেন্ডারস বিল’ নামে একটি আইন অনুমোদন করেছে। আইনটির আওতায় কোনো ঋণখেলাপি দেশ ত্যাগ করলে তার সম্পদ জব্দ করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

ঋণখেলাপি হলে কঠোর শাস্তি পেতে হয়। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে এ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ হওয়ার ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এর সুফলও পেয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম নিয়ন্ত্রক দেশ চীন, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইনে খেলাপি ঋণের হার ২ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। অন্যদিকে খেলাপি ঋণে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার ওপরের সারিতে উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন আদায় করতে না পারা যেসব ঋণ ব্যাংকগুলো অবলোপন করেছে, তার পরিমাণও কম নয়।

ঋণখেলাপি কমাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অনুকরণে বাংলাদেশ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের ক্ষেত্রে সামাজিক উদ্যোগে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করলেও তা নেই ব্যাংকের ক্ষেত্রে। সম্প্রতি খেলাপিদের নিয়ন্ত্রণে কিছু নতুন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এতে স্বেচ্ছায় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে কোনো সম্মাননা না দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি পেশাজীবী, ব্যবসায়িক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক সংগঠনেও এদের না রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানে আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন-১৯৯৩ ক্ষমতাবলে দেশে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা হচ্ছে। যদি নতুন বিধান কার্যকর করা যায় তাহলে ভবিষ্যতে হয়তো এ ধরনের চিহ্নিত ঋণখেলাপিদের রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ কিংবা সংগঠনে থাকার সুযোগ বন্ধ হলেও হতে পারে।  ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যাংক কোম্পানি আইনে দুর্বলতা প্রকট। যে কারণে ব্যাংকের ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া যাচ্ছে না। আবার আইনটিকে সংশোধনের উদ্যোগও আলোর মুখ দেখছে না।

ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হলে বিচারপ্রাপ্তিতে বিলম্বও ঋণখেলাপিদের বেপরোয়া করে তোলে। বিচার প্রক্রিয়ায় বিলম্ব বিচার না পাওয়ারই নামান্তর। মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা খেলাপি ঋণ আদায়ের পথে অন্যতম অন্তরায়। তাছাড়া আইনের কঠোর প্রয়োগ না হওয়া একটি বড় বাধা। কৃষকদের বিরুদ্ধে ছোট ছোট ঋণ আদায়ের জন্য পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি অ্যাক্টের অধীনে মামলা করা হয়। কৃষকদের কাছ থেকে ২০-৩০ হাজার টাকা আদায়ের জন্য গ্রেফতারের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। ছোটখাটো ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলেও কোটি কোটি টাকার ব্যাংকঋণ আদায়ে ত্বরিত কার্যকর কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ নেই। দেশে বিদ্যমান অর্থঋণ আদালত আইন মৌলিক অধিকারের দৃষ্টিতে প্রণীত একটি আইন। এ আইনে মামলা করে ব্যাংকঋণের খেলাপি টাকা আদায় করা খুবই কঠিন। কোনো ব্যাংক যখন কাউকে খেলাপি ঘোষণা করে তখন কোনো কোনো গ্রাহক কোর্টে গিয়ে রিট পিটিশন দায়ের করেন। তখন ঋণটি আদায়ের সুযোগ ক্ষীণ হয়ে যায়। বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আইনি প্রক্রিয়া আরো সহজ করা প্রয়োজন, যাতে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া যায়।

খেলাপি ঋণের স্ফীত চিত্র দেশের ব্যাংক খাত, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের অশনিসংকেত। খেলাপি ঋণ না কমে বরং দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ হলো, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে সময়মতো যথাযথ পদক্ষেপ না নেয়া। এছাড়া যাচাই-বাছাই ছাড়া প্রদেয় নতুন ঋণও খেলাপির পাল্লা যে ভারী করছে, এ নিয়ে দ্বিমত প্রকাশের অবকাশ নেই। খেলাপি ঋণ আদায়ে যুগোপযোগী আইন প্রণয়নের ব্যাপারে বিভিন্ন মহল থেকে এরই মধ্যে বহুবার গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার পাশাপাশি সুশাসনের প্রভাব ব্যাংক খাতের অন্যতম প্রধান সমস্যা, এও নতুন কথা নয়। দেশের অর্থনীতির চাকা আরো গতিশীল করতে ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনার দিকে আরো গভীর মনোনিবেশ অত্যন্ত জরুরি। ঋণ যাতে খেলাপি না হয়, সেজন্য বিদ্যমান নীতিমালার ব্যাপারেও নতুন করে ভাবতে হবে। খেলাপি ঋণের মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে যুগোপযোগী আইন যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন বিশেষ বেঞ্চ গঠনের মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা। এক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগকে যথাযথ সহায়তা করবে বলে প্রত্যাশা।