বাংলাদেশে বিনিয়োগে জাপানি কোম্পানিগুলোর আগ্রহ বেড়েছে। এক যুগের বেশি সময়ে জাপানি কোম্পানির সংখ্যা বেড়ে প্রায় পাঁচ গুণ হয়েছে। তথ্য বলছে, ২০০৮ সালে বাংলাদেশে কার্যরত জাপানি কোম্পানি ছিল ৭০টি। বর্তমানে তা ৩২১-এ উন্নীত হয়েছে। সিপিডি আয়োজিত সাম্প্রতিক এক সংলাপে দেশটির রাষ্ট্রদূত আরো অধিক কোম্পানি বাংলাদেশে বিনিয়োগে, ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহী বলে জানিয়েছেন। দুই দশক ধরে সরকার দেশে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চাইছে। এজন্য নানা উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। কিন্তু আশানুরূপ সুফল মেলেনি। সেদিক থেকে জাপানের কোম্পানিগুলো যে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠছে, তা আমাদের জন্য সুখবর। এ সুযোগ কাজে লাগাতে দেশে সহায়ক বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের প্রথম দিককার রাষ্ট্রগুলোর একটি জাপান। দুর্যোগ ও সংকট মোকাবেলা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে দেশটির সরকার স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের সহায়তা করছে। জুগিয়ে আসছে আর্থিক-কারিগরিসহ বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা। একক রাষ্ট্র হিসেবে বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন অংশীদার জাপান। এখন দেশটির ব্যক্তি খাতও এখানে বাণিজ্যিক সম্পৃক্ততা বাড়াতে চাইছে। নিজেদের বিনিয়োগ গন্তব্যের প্রাধিকার তালিকায় তারা রাখছে বাংলাদেশকে। কিন্তু এ সুযোগ কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে আমাদের দিক থেকে কিছু চ্যালেঞ্জ থেকে যাচ্ছে। ভৌত অবকাঠামোর বাধা অনেকটা কাটলেও দেশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তা দূর হয়নি। শুল্ক ব্যবস্থায় রয়ে গেছে ত্রুটি। যথাযথ প্রক্রিয়ায় কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের ক্ষেত্রে অনেক সময় লেগে যায়। বন্দরের সক্ষমতা ঘাটতিতে জাহাজীকরণ কিংবা পণ্য খালাস বিলম্বিত হয়। বিদেশী কোম্পানির ওপর আরোপ করা হয় বিভিন্ন ধরনের কর। অনেক ক্ষেত্রে দ্বৈত করেরও মুখোমুখি হতে হয় তাদের। বৈদ্যুতিন উপায়ে আমদানি ব্যয় পরিশোধের ক্ষেত্রে অযথা সময়ক্ষেপণের পাশাপাশি আছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানা বিধিনিষেধও। আবার ইপিজেড বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের পরিবেশেও রয়েছে কিছু ঘাটতি। স্থানীয় ও বিদেশী কোম্পানির মধ্যে রফতানি প্রণোদনায়ও বিস্তর বৈষম্য বিরাজমান। এসব বিষয়ে উন্নয়ন ছাড়া শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জাপানি কোম্পানিগুলো আগ্রহ কতটা ধরে রাখবে তা নিয়ে শঙ্কা থেকে যায়।

করোনা অতিমারী, প্রতিবেশীদের ওপর চীনের খবরদারি, মিয়ানমারের সেনাশাসনের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জাপানের উদ্যোক্তারা কোম্পানিগুলোকে চীনের বাইরে স্থানান্তরে উৎসাহিত করছে। আমরা দেখছি শুধু বাংলাদেশ নয়, আরো কয়েকটি দেশেও জাপানি কোম্পানিগুলো যাচ্ছে। দেশটির বৈদেশিক বাণিজ্য সংস্থা জাপান এক্সটারনাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) তথ্যে উঠে আসছে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি জাপানি বিনিয়োগ পাচ্ছে ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকা। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামের মতো আঞ্চলিক সংগঠন আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোয়ও জাপানি বিনিয়োগ অনেক বেশি হারে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশগুলো কিছু আইনি সংস্কার, প্রশাসনিক সংস্কার, সুশাসনে অগ্রগতি, বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির পদক্ষেপ নিয়েছে। সর্বোপরি ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নে সর্বোচ্চ জোর দিয়েছে। ওইসব নীতি ও কর্মপরিকল্পনা আমাদের জন্য অনুসরণীয়।

সরকারি মহল থেকে বলা হচ্ছে, জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকার সচেষ্ট। এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য এককভাবে নিবেদিত একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এটি অনেকটা প্রস্তুত। চলতি বছরের শেষের দিকে সেখানে প্লট পাওয়া শিল্প-কারখানাগুলো উৎপাদনে যেতে পারবে। এ অর্থনৈতিক অঞ্চল নিশ্চয়ই জাপানি উদ্যোক্তাদের জন্য বড় প্রেষণা হিসেবে কাজ করবে। জাপানি রাষ্ট্রদূতের ভাষ্যে উঠে এসেছে, এ অর্থনৈতিক অঞ্চল সফল হলে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে জাপান আরেকটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলবে। সেটি সফল হলে কক্সবাজারের মহেশখালীতে পরবর্তী অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে। এ থেকে বাংলাদেশকে ঘিরে জাপান সরকার ও দেশটির উদ্যোক্তাদের দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততা পরিকল্পনার ইঙ্গিত মেলে। কাজেই তাদের আগ্রহ ধরে রাখতে আমাদের সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য অবকাঠামোই সব নয়। ব্যবসায়িক কর্মপরিবেশ কেমন, বিধি-ব্যবস্থা কেমন, আমলাতন্ত্রের মানসিকতা কেমন, প্রক্রিয়াগত জটিলতা কতটুকু, আপেক্ষিক সুবিধা কতটুকু আছে প্রভৃতি বিষয়ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা দেখছি শুল্কায়ন প্রক্রিয়া, করায়ন, প্রণোদনা থেকে শুরু করে ব্যবসায়িক পরিবেশের ক্ষেত্রে দেশে এখনো নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। সুতরাং বাধাগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধান করতে হবে। নইলে দেশে জাপানি বিনিয়োগ সম্ভাবনা হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।

দেশ উন্নয়নের একটা রূপান্তরকালীন পর্যায়ে রয়েছে। সব ঠিক থাকলে ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ করবে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে বিরাজমান অনেক বাণিজ্য সুবিধাই পাবে না বাংলাদেশ। এটা জাপানের ক্ষেত্রেও সত্য। কাজেই শুধু জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি  নয়, দেশটির বাজারে বিরাজমান বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখার বিষয়েও সচেষ্ট হতে হবে। দেশটির রাষ্ট্রদূত অবশ্য বাংলাদেশকে এলডিসি উত্তরণের পরও  সেসব সুবিধা জাপান অব্যাহত রাখার চিন্তা করছে বলে জানিয়েছেন। এজন্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) অথবা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) সম্পাদন হওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে হবে। সর্বোপরি, উভয় দেশের বাণিজ্য-বিনিয়োগ বাড়াতে একটি যৌথ কার্য দল গঠন করা যেতে পারে। সরকারি-বেসরকারি প্রচেষ্টায় দেশে জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি অনুকূল ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি হবে এবং দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় হবে, এটিই প্রত্যাশা।