বিশ্ব পানি দিবস উপলক্ষে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা), বাংলাদেশ নিরাপদ পানি আন্দোলন (বানিপা) ও মানবাধিকার উন্নয়ন কেন্দ্রের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিশেষজ্ঞরা ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছেন। ভূগর্ভস্থ পানি অতিব্যবহারের ফলে পানির স্তর ক্রমে নিচে নেমে যাচ্ছে, সংকট দেখা দিচ্ছে সুপেয় পানির। পানি সংকট মোকাবেলা এবং পানিদূষণের হুমকি রোধে বর্জ্য পানির আধুনিক ব্যবস্থাপনা এবং বর্জ্য পানি পরিশোধন ও পুনর্ব্যবহার একটি বড় সমাধান হতে পারে। চলমান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বর্জ্য পানি একটি মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। বর্জ্য পানির নিরাপদ ব্যবস্থাপনাকে মানবস্বাস্থ্য, পরিবেশ-প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুসংস্থানের জন্য একটি সঠিক বিনিয়োগ বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পানি দিবস পালন এবং পানি দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য খুবই তাত্পর্যপূর্ণ। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে এর পরিকল্পিত ব্যবহার, ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের যেমন পুকুর-দীঘি, খাল-বিল, নদ-নদীর পানির ব্যবহার বাড়ানো এবং শিল্প-কারখানায় পানি পুনর্ব্যবহারে জোর দিতে হবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করতে হলে ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে হবে।
দেশে ফসল উৎপাদন, সেচ ও গৃহস্থালি কাজে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার ক্রমে বাড়ছে। মাটির নিচে পানির আধার সুরক্ষা ও গুণাগুণ বজায় রাখতে ভূ-উপরিস্থ ও ভূগর্ভস্থ পানির সমন্বিত ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ। অপরিকল্পিতভাবে পানি উত্তোলনে প্রতি বছরই এর স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ খাবার পানির সঙ্গে নলকূপে উঠে আসছে ক্ষতিকর ভারী ধাতু ও দূষিত পদার্থ, যা পান করায় মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে সাধারণত অগভীর নলকূপের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করা হয়। অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে এখন বছরের একটা সময়ে, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পানি পাওয়া যায় না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভূগর্ভস্থ পানিদূষণ। ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের দূষক পদার্থ চুইয়ে মাটির নিচে চলে গিয়ে পানিতে মিশছে। তা নলকূপের মাধ্যমে উঠে আসে। সে পানি মানবশরীরে প্রবেশ করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস করে। ফলে নতুন রোগ সৃষ্টি হচ্ছে। আর্সেনিক ভূগর্ভস্থ পানিতে ব্যাপক হারে দূষণ ঘটাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানি উন্নয়নে এটি সবচেয়ে বড় বাধা। আর্সেনিক দূষণের আগে গ্রামের মানুষ অনেকাংশে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। মাটির নিচে বিশেষ স্তরে আর্সেনিক সঞ্চিত থাকে। নলকূপের পানির মাধ্যমে তা উত্তোলিত হয়। কয়েক দশক ধরে কৃষি উৎপাদনে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানিতে এসব মিশে দূষিত করছে নদী-নালা, খাল-বিল, সমুদ্রের পানি; এমনকি ভূগর্ভস্থ পানিও। জমিতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার আর্সেনিক দূষণের অন্যতম কারণ।
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার পেছনে শিল্প-কারখানার পানি উত্তোলন এবং প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত ব্যবহারও কোনো অংশে কম দায়ী নয়। পানি উত্তোলনসংক্রান্ত কোনো ধরনের বাধ্যবাধকতা বা নজরদারি না থাকা এবং এজন্য বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয় না বলেই এর অপচয় হচ্ছে। দেশে কেবল গার্মেন্ট শিল্পই কী পরিমাণ পানির অপচয় করছে, বিশ্বব্যাংকের অন্যতম সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন বা আইএফসির এক প্রতিবেদন থেকে তা জানা যায়। এতে বলা হয়, বৈশ্বিক মান অনুযায়ী প্রতিটি জিন্স ধোয়া ও রঙ করার কাজে পানির ব্যবহার হয় ৬০ থেকে ৭০ লিটার। অথচ দেশে এক্ষেত্রে গড়ে ২৫০ লিটার পানি ব্যবহার করা হয়। এর পুরোটাই মিঠা পানি। বাংলাদেশের আরএমজি খাতে প্রতিদিন ৪১১ কোটি লিটার পানির প্রয়োজন হয়। প্রতি বছর গার্মেন্ট শিল্পের সুতা ও পোশাকে ডায়িং ও ওয়াশের কাজে ব্যবহার হচ্ছে ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি লিটার পানি। বলার অপেক্ষা রাখে না, সহজলভ্য ও পয়সা খরচ ছাড়াই পাওয়ার কারণে কত বেশি পানি খরচ করা হলো, তা কেউই বিবেচনায় নেন না। প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়, ঢাকা ও এর আশপাশে প্রতি বছর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দুই থেকে তিন মিটার নিচে নেমে যাচ্ছে। এতে একসময় আমাদের ভূগর্ভস্থ পানি অনেক নিচে নেমে যাবে, এমনকি পুরো শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তা-ই যদি হয়, তবে তেল-গ্যাসের মতো পানি আমদানির ঝুঁকি তৈরি হবে বৈকি!
দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলংকার একটি বড় এলাকা শুষ্ক হিসেবে পরিচিত। দেশটির উত্তরাঞ্চলের অর্ধেক ও পূর্বাঞ্চলের পুরো অংশেই পানির ঘাটতি রয়েছে। যদিও পৃথিবীর যে কয়েকটি দেশে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হয়, তার মধ্যে শ্রীলংকা অন্যতম কিন্তু দেশটির সব এলাকায় সমান বৃষ্টিপাত হয় না। সেজন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে পানির চাহিদা পূরণ করা হয়। বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য শ্রীলংকার গ্রামাঞ্চলে নানা উপায় অবলম্বন করা হয়। এ সংরক্ষণের কাজ ২৬ বছর ধরে চলছে। ২০১৯ সালের তথ্যমতে, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য পুরো শ্রীলংকায় প্রায় ৪৫ হাজার ছোট-বড় ট্যাংক আছে। এছাড়া পুকুর, কুয়া ও জলাধার পরিষ্কার করা হয় এবং মানুষ এগুলো দূষিত করে না। বিভিন্ন হাসপাতাল, শিল্প-কারখানা ও মন্দিরে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য ট্যাংক স্থাপন করা হয়েছে। কলম্বোর মতো বড় শহরগুলোয় পানির প্রধান সরবরাহ আসে ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগ থেকে। এর মধ্যে বৃষ্টির পানি একটি বড় উৎস। বাংলাদেশও নদী পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি ও উজান থেকে নেমে আসা পানি সংরক্ষণপূর্বক কৃষি ও শিল্পে ব্যবহার করতে পারে। সেক্ষেত্রে নদী দখল ও দূষণ বন্ধ করতে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে সর্বাগ্রে।
ভূগর্ভস্থ পানির বিকল্প ব্যবস্থা খোঁজার পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের ওপর বারবার জোর দিচ্ছেন গবেষকরা। তাদের মতে, একসময় না একসময় ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের চিন্তা থেকে সরে আসতেই হবে। তখন বিকল্প ছাড়া উপায় থাকবে না। তবে যত বিকল্পই গ্রহণ করা হোক না কেন, সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকলে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি সরবরাহ করেও চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে না। তাই মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সবকিছুর পরও পানি সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য দ্রুতই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নদী ও জলাশয়ের দিকে নজর দিতে হবে। কৃষি থেকে শুরু করে কলকারখানার রাসায়নিক দূষিত বর্জ্য, পয়োনিষ্কাশন ড্রেনের ময়লা বর্তমানে যেভাবে সরাসরি নদীতে পড়ছে এবং যত্রতত্র দখল করে যেভাবে ব্যাহত করা হচ্ছে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, তাতে নদীর দূষিত পানির বিশোধন ব্যয়সাপেক্ষ। তবে সরকারি উদ্যোগে নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধ এবং দখল করা ভরাট জমি আবার খনন করে প্রবাহ স্বাভাবিক করা গেলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবেই দূষণের মাত্রা কমানো সম্ভব। সেখান থেকে তখন স্বল্প খরচে বিশোধিত করে চাহিদামতো পানি সংগ্রহ করা যাবে। পানিদূষণ রোধে এবং নদীর পুনঃসংরক্ষণকল্পে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-৪১-এর মতো দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশলগুলোয়ও পানির মূল্য অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। প্রধান ইনপুট হিসেবে পানি ব্যবহার করে এমন প্রকল্পগুলোর তুলনামূলক সুবিধা বিশ্লেষণে পুনর্মূল্যায়ন করার জন্য পরিকল্পনা কমিশন একটি পাইলট গবেষণা করতে পারে। পাইলট গবেষণা সম্পন্ন করার পর বর্তমানে সংশোধন করতে থাকা উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদনের নির্দেশিকায় পানির মূল্য বিবেচনায় নেয়া উচিত। এর সবচেয়ে ভালো উপায়গুলোর মধ্যে রয়েছে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ, পানির চক্রাকার ব্যবহার, সেচের বিকল্প ভেজা ও শুকনো পদ্ধতি, ওয়াটার স্মার্ট নগর উন্নয়ন ও সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা। বাংলাদেশ যে বিশ্বের শীর্ষ ১০ বৃষ্টিবহুল দেশের একটি, বৃষ্টির পানির ব্যাপারে আমাদের সাংস্কৃতিক ও কারিগরি প্রবণতা দেখে তা বোঝার অবকাশ নেই। অথচ এত পরিষ্কার ও সুপেয় পানি আর কোনো উৎস থেকে পাওয়া যায় না বলে বিশ্বজুড়েই বৃষ্টির পানির কদর সবচেয়ে বেশি। খাল, বিল, পুকুর ও শহরে ভবনে ভবনে সংরক্ষণাগার বাধ্যতামূলক করে বৃষ্টির পানি কীভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা যায়, তার উপায় সন্ধান করতে হবে। রোধ করতে হবে পানির অপচয়ও। নিত্যব্যবহার্য পানি আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশুদ্ধ করে পুনরায় ব্যবহার সিঙ্গাপুরসহ কিছু দেশে হচ্ছে। পানির অপচয় রোধ ও পুনর্ব্যবহারে এ ধরনের প্রযুক্তি বিনিময় করা যেতে পারে।
দুঃখের বিষয় বর্জ্য পানির ৯২ শতাংশই অপরিশোধিত অবস্থায় পরিবেশে মিশে যাচ্ছে। তার জন্য পরিবেশের অনেক বেশি দূষণ ঘটে। ঢাকায় যে পরিমাণ বর্জ্য পানি তৈরি হচ্ছে, তার ৮০ শতাংশই ব্যবস্থাপনার বাইরে থেকে যাচ্ছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে পানি ও বর্জ্য পানি ব্যবস্থাপনার ওপর আমাদের বিশেষ জোর দিতে হবে। বাংলাদেশে পানিসংক্রান্ত সমস্যা ক্রমেই বাড়ছে। দেশের ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ সুপেয় পানির অধিকার থেকে বঞ্চিত। আমাদের দেশের নদীর পানি স্রোত না থাকায় তা সমুদ্রে মিশছে না। ফলে এসব অঞ্চলে আগের চেয়ে কয়েক গুণ লবণাক্ততা ও আর্সেনিক সমস্যাও বাড়ছে। ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত তোলার ফলে ৪৭টি জেলার পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশ ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। তাছাড়া পানি দূষিত হওয়ার কারণে দেশ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের বিবেচনায় এসব বন্ধ করার জন্য সুসংহত পানি ব্যবস্থাপনা নীতি প্রয়োজন। বাংলাদেশে পানি ব্যবস্থাপনা নীতি রয়েছে কিন্তু তা অনেক পুরনো। একে সময়োপযোগী করতে হবে। এ নীতির পলিসি নবায়ন করা দরকার। যুগোপযোগী পানি ব্যবস্থাপনা নীতি প্রণয়নের সঙ্গে পানি, জনস্বাস্থ্য ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত সংস্থা বা সরকারি বিভাগগুলোর সমন্বয়ও বিশেষ প্রয়োজন। আশা করব সরকারের নীতিনির্ধারকরা এদিকে বিশেষ দৃষ্টি দেবেন।
জলাধার রক্ষায় পানি আইনের কঠোর বাস্তবায়ন, ভূপৃষ্ঠের পানি ব্যবহারের বিষয়টি নগর পরিকল্পনা, বসতবাড়ি পরিকল্পনায় বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত, প্রকৃতি ও পরিবেশবান্ধব পানি ব্যবস্থাপনায় চাষাবাদ পদ্ধতির প্রতি গুরুত্বারোপ, ড্রেজিং করে নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি করা এবং অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা প্রাপ্তির লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। খরা মৌসুমে সেচ ও রাসায়নিক সারনির্ভর ধান চাষের পরিবর্তে প্রাকৃতিকনির্ভর ধান চাষের উদ্যোগ গ্রহণ এবং নদীর পাশ থেকে সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে নদীর জায়গা নদীকে ফিরিয়ে দেয়ার পদক্ষেপ নিতে হবে। অপরিশোধিত শিল্প-কারখানায় বর্জ্য ও পয়োবর্জ্য, নৌযানের বর্জ্য নদীতে ফেলা বন্ধ করাও জরুরি। ঢাকার আশপাশের নদীসহ অন্য সব নদী ও জলাশয় দখল, ভরাট ও দূষণ রোধকল্পে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি নদীর পানি কৃষি ও শিল্পে এবং পরিশোধন করে ব্যবহার করতে হবে।










