বীমা কোম্পানিগুলো সঠিক সময়ে ও ঠিকমতো গ্রাহককে বীমা দাবি পরিশোধ না করায় এ খাতে আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়েছে। বীমার ওপর সাধারণ মানুষ আস্থা রাখতে পারছে না। এ কারণে জাতীয় বীমা দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বীমা খাতে আস্থা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন। আজকের বাংলাদেশ উন্নয়ন সূচকের মাপকাঠিতে প্রতিবেশী অনেক দেশ, বিশেষত ভারত ও পাকিস্তান থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে এগিয়ে আছে। এ উন্নয়নের ব্যাপ্তি শিল্প-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা স্পষ্টভাবে প্রায় সর্বত্র পরিলক্ষিত হলেও বীমা খাতে এখনো চোখে পড়ার মতো তেমন সাফল্য আসেনি। এর মূলে রয়েছে এ দেশের মানুষের অনভিজ্ঞতা এবং বীমা সম্পর্কে অসচেতনতা, সর্বোপরি আস্থার সংকট। বিদ্যমান বাস্তবতায় বীমার প্রতি মানুষের আস্থা প্রতিষ্ঠায় নজরদারি বৃদ্ধি ও অনিয়ম বন্ধ করা প্রয়োজন। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে জাতীয় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ সংস্থাকেই (আইডিআরএ) এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে হবে।
দেশে বীমার বড় সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অর্থনীতিতে এ খাতের অবদান খুবই কম। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকের হিসাবে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে বীমা খাতের অবদান এখনো দশমিক ৫ শতাংশ, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে অনেক কম। বাংলাদেশে মাথাপিছু বীমা ব্যয় এখনো ১০ মার্কিন ডলারের নিচে। প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি জনসংখ্যার তুলনায় যা খুবই নগণ্য। এটি বাড়াতে হবে। বাড়ানোর অনেক সুযোগ রয়েছে। বাড়াতে পারলে বীমার মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরো গতিশীল হবে। দুঃখজনকভাবে সত্য, বিপুলসংখ্যক কোম্পানি থাকা সত্ত্বেও অর্থনীতিতে এ খাতের অবদান এখনো অনুল্লেখযোগ্যই বলা চলে। মূলত কিছু অন্তর্নিহিত সমস্যায় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বীমার প্রভাব হার (পেনিট্রেশন রেট) বাড়ছে না। এর মধ্যে একটি হলো গ্রাহকের দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা ও অনীহা। অন্যূন তিন মাসের মধ্যে দাবি নিষ্পত্তির আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকলেও কিছু কোম্পানি অর্থ পরিশোধে অযথা গড়িমসি করে। এমনকি মিথ্যা দাবি সাজিয়ে পূর্বতন তারিখে কাভার নোট ইস্যু এবং অন্য অন্যায্য প্রভাবের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট বীমা গ্রাহকের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও আছে কিছু কোম্পানির বিরুদ্ধে। এতে বীমার প্রতি মানুষের এক ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। সংকট রয়েছে দক্ষ জনবলেরও। এতসংখ্যক কোম্পানি অথচ সেগুলো পরিচালনার জন্য এমডি দূরে থাক, মধ্য থেকে মাঠ পর্যায় পর্যন্ত ভালো, পেশাদার ও দক্ষ লোকবল পাওয়া দুষ্কর। আবার এজেন্টরাও পলিসি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে মানুষকে যথাযথভাবে বোঝাতে পারছেন না। ফলে মানুষ বীমার ব্যাপারে আগ্রহী হচ্ছে না। সমরূপভাবে উচ্চ পরিচালন ব্যয়ও একটি সমস্যা। পরিচালন ব্যয়ের ক্ষেত্রে একটি নির্ধারিত সীমা থাকলেও কিছু বীমা কোম্পানি আয়ের তুলনায় বেশি ব্যয় করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আছে সুশাসনের সংকট। সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পদ পূরণের আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বীমা কোম্পানিতে বর্তমানে সিইও নেই। অনেকটা অ্যাডহক ভিত্তিতে চলছে। তদুপরি রয়েছে পরিবারের নিয়ন্ত্রণ। কোনো কোনো কোম্পানিতে একক বা যৌথভাবে পরিবারের মূলধন বা শেয়ার ধারণ সুনির্দিষ্ট সীমা ছাড়িয়ে গেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোয় পারিবারিক প্রভাব তৈরি হচ্ছে, যা করপোরেট মূল্যবোধ ও সুশাসনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। পণ্যে বৈচিত্র্য ঘাটতিও এ খাতের একটি সমস্যা।
অনেক উন্নত দেশেই যেখানে শতভাগ নাগরিক বীমা পলিসির আওতায়, সেখানে বাংলাদেশের চিত্রটি শুধুই হতাশার। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বা আইএলওর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ওডব্লিউআইডি কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১১ সালে কানাডা, জাপান, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ইত্যাদি ওইসিডি বা অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশে ১০০ শতাংশ নাগরিক ইন্স্যুরেন্স সেবার আওতাভুক্ত ছিল। ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৮৪ শতাংশ মানুষ বীমা সেবা পেত। তবে এশিয়ার অনেক দেশ এমনকি বাংলাদেশের নিকট প্রতিবেশী ভারতেও এ হার তেমন আশাব্যঞ্জক নয়। ওই সময়ে পাকিস্তানে প্রায় ২৭ শতাংশ মানুষ ইন্স্যুরেন্স সেবা পেলেও ভারতে তা ছিল প্রায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং বাংলাদেশে প্রায় ৩ শতাংশ। তবে দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যতিক্রম ছিল শ্রীলংকা, যাদের ইন্স্যুরেন্স সেবার আওতাধীন জনসংখ্যা প্রায় শতভাগ। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় জিডিপিতে বীমার অবদান উল্লেখযোগ্য। অথচ বাংলাদেশে এখনো তা ১ শতাংশেরও নিচে রয়ে গেছে। অর্থাৎ বেশির ভাগ বীমাযোগ্য জীবন ও সম্পদ বীমার আওতাবহির্ভূত থেকে যাচ্ছে।
সরকার বীমা খাত সম্প্রসারণে বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে, যার মধ্যে জাতীয় বীমা নীতি প্রণয়ন এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গঠন উল্লেখযোগ্য। বীমা খাতে জনসচেতনতা বাড়াতে জাতীয় বীমা দিবস পালন করা হচ্ছে নিয়মিত। পদ্মা বহুমুখী সেতু, ঢাকা মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের মতো মেগা প্রকল্পগুলোর বীমা ঝুঁকি সাধারণ বীমা করপোরেশন গ্রহণ করেছে। বিদেশগামী বাংলাদেশী কর্মীদের জন্য প্রবাসী কর্মী বীমা, বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি মোকাবেলায় হাওর এলাকায় সীমিত পরিসরে আবহাওয়া সূচকভিত্তিক শস্য বীমা চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মা-বাবা বা অভিভাবকের অকালমৃত্যুতে, শারীরিক অক্ষমতায় তাদের শিক্ষাজীবন যাতে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ‘বঙ্গবন্ধু শিক্ষা বীমা’ পরিকল্পনা চালু করা হয়েছে। তার পরও বীমা খাতের সম্প্রসারণ আশানুরূপ নয়। অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর এখনো মিলছে, যা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে আইডিআরএ ও ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল, বাংলাদেশ ব্যাংক বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
ব্যাংক ও শেয়ারবাজারের মতো দেশের অর্থনীতির আরেকটি স্তম্ভ বীমা। অথচ ব্যাংক ও শেয়ারবাজার নিয়ে জনমনে যতটা আগ্রহ ও আস্থা, এর ঠিক বিপরীত অবস্থানে বীমা খাত। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে খুব একটা আগ্রহ নেই, আস্থার সংকটও প্রকট। অথচ একটি দেশের পুরো আর্থিক খাতকে সচল রাখতে সহায়তা করে বীমা। উন্নত দেশগুলোয় বীমা আর্থিক খাতে সরাসরি অবদান রাখে। সেসব দেশের নাগরিকদের বাধ্যতামূলক ইন্স্যুরেন্স করতে হয়। বীমা খাতের সম্পদমান, দায় ও ইকুইটি স্থিতি নিয়ে আরো পর্যালোচনা প্রয়োজন। হিসাবমান অনুসারে যাতে বীমা কোম্পানিগুলো আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করে, আমাদের সেদিকে নজর দিতে হবে। আইনি সংস্কারের মাধ্যমে এ খাতে জনগণের আস্থা বাড়ানো প্রয়োজন। আইন ও তার প্রয়োগ শক্তিশালী হলে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে, যা গ্রাহককে ভালো মানের সেবা নিশ্চিত করতে সহযোগিতা করবে। পলিসিগুলোর প্রস্তাবপত্র ও বীমা চুক্তিপত্র খুবই জটিলভাবে লেখা। এসব বিষয় স্পষ্ট করতে কোম্পানিগুলোকে উদ্যোগ নিতে হবে। সহজ ও স্বচ্ছ ধারণা দেয়া গেলে সাধারণ মানুষ জীবন বীমা, স্বাস্থ্য বীমাসহ সম্পত্তির বীমা করবে।
গ্রাহকের দাবি নিষ্পত্তিজনিত সৃষ্ট আস্থাহীনতা, সুশাসন সংকট দূর করতে আইডিআরএর নজরদারি বাড়াতে হবে। কোম্পানিগুলোর উচ্চ পরিচালন ব্যয়ে রাশ টানতে হবে। নতুন নতুন পণ্য ডিজাইনের জন্য পর্যাপ্ত অ্যাকচুয়ারিস্ট প্রয়োজন। দেশে থাকা মাত্র তিনজন ডিগ্রিধারী অ্যাকচুয়ারিস্টের মধ্যে একজনই প্র্যাকটিস করেন। তাদের সংখ্যা বাড়াতেও এ-সম্পর্কিত পঠন-পাঠনের সুযোগ বৃদ্ধি দরকার। এজেন্টদের জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়াতে ব্যবস্থা করতে হবে প্রশিক্ষণের। বর্তমানে বীমা পেশাজীবীদের প্রশিক্ষণের জন্য বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স একাডেমি আছে বটে, কিন্তু নানা সীমাবদ্ধতায় প্রতিষ্ঠানটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। এর পাঠ্যক্রম যুগোপযোগী করে এটিকে বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমির মতো কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কোনো দেশের জাতীয় অর্থনীতি ও তার অগ্রগতি অর্জন এবং তা ধরে রাখার জন্য সর্বস্তরে বীমা সেবা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। হাতেগোনা কিছু বীমা কোম্পানি ব্যবসায়িক দিক থেকে সফল হলেও অনেক কোম্পানির অবস্থা খুব বেশি সুখকর নয়। প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যার এ দেশে বিভিন্ন বীমা পলিসি জনপ্রিয় করে তোলার জন্য একদিকে কোম্পানিগুলোকে নিত্যনতুন উদ্ভাবনী সেবা নিয়ে আসতে হবে, সেসব সেবা সবার কাছে খুব সহজে বোধগম্য করে তোলার জন্য ব্যাপক কার্যক্রম হাতে নিতে হবে, অন্যদিকে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে বীমা খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।










