বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) আয়োজিত ‘ওয়াটার ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ: পাস্ট প্রেজেন্ট অ্যান্ড ফিউচার’ শীর্ষক বইয়ের আলোচনায় জাতিসংঘের উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ড. নজরুল ইসলাম ভারতের ফারাক্কা বাঁধের প্রভাব রিভিউ করার জন্য সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছেন। ফারাক্কা বাঁধের বয়স ৫০ বছর হতে চলল। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী প্রতি ৪০ বছর পর নদীতে দেয়া বাঁধ রিভিউ করতে হয়। কিন্তু ফরাক্কা বাঁধ রিভিউর কোনো উদ্যোগ নেই। ফারাক্কা বাঁধের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশ। অনেক নদী মরে গেছে, পানিপ্রবাহ মারাত্মক কমে যাওয়ায় উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ সর্বত্র নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে পানি ধারণক্ষমতা কমেছে। ভারতের দিকে থেকেও এ বাঁধের ফলে সৃষ্ট ক্ষতির বিষয়টি উঠে আসছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে। এমন পরিস্থিতিতে শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, ভারতের জন্যও ফারাক্কা বাঁধের যথাযথ রিভিউ হওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ভারত এককভাবে অথবা উভয় দেশ যৌথভাবে এ রিভিউ করতে পারে। রিভিউ থেকে উঠে আসা বিষয় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণও জরুরি।
বাংলাদেশের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি ফারাক্কা বাঁধ আজ ভারতেরও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ফারাক্কা বাঁধের কারণে গঙ্গার উজানে বিপুল পলি জমে প্রতি বছর বন্যা দেখা দিচ্ছে বিহারসহ উত্তর প্রদেশের বিস্তীর্ণ এলাকায়। অন্যদিকে গ্রীষ্ম মৌসুমে পানি আটকে রাখার ফলে নদীর স্বাভাবিক গতি হারিয়ে ব্যাপক ক্ষতির শিকার হচ্ছে ভাটি অঞ্চল বাংলাদেশ। ফারাক্কার প্রভাবে নদীর স্বাভাবিকতা হারিয়ে গঙ্গার উজানে বিহার ও উত্তর প্রদেশ এবং ভাটিতে সুন্দরবন পর্যন্ত পরিবেশ বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে। সাম্প্রতিককালে বন্যায় বিহারে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ছিল অন্তত ২০ লাখ। এতে বিহারের তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে ফারাক্কার সমস্যা তুলে ধরে এ সমস্যার একটা স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়ে ফারাক্কা বাঁধ অপসারণের কথা বলেছেন। তবে শুরু থেকেই এ প্রকল্পের বিরুদ্ধে ছিলেন নদী বিশেষজ্ঞরা। পদ্মা থেকে জন্ম নেয়া শত শত নদ-নদী ও খাল ভরাট হতে হতে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে অনেক জায়গায় নদীর চিহ্ন পর্যন্ত নেই। পদ্মার পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের উত্তর অববাহিকায়, বিশেষ করে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভূগর্ভস্থ পানির প্রথম স্তর নিচে নেমে গেছে। মৌসুমি বৃষ্টি ও এ স্তরের সারফেস রিচার্জ করে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। পানির অভাবে মাটির আর্দ্রতা শুষ্ক মৌসুমে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। পানিপ্রবাহের এমন করুণ অবস্থা থেকে সৃষ্ট হয় মরুকরণ প্রক্রিয়া। ফারাক্কা বাঁধের ফলে বাংলাদেশের খুলনা অঞ্চলের মাটির লবণাক্ততা বেড়েছে। মিঠা পানির সরবরাহ কমে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে লবণ, ভূ-অভ্যন্তরস্থ পানিতে প্রবেশ করতে পারে না। কৃষির অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ। পানির স্তর অনেক নেমে যাওয়ায় দক্ষিণ অঞ্চলের গড়াইকেন্দ্রিক জিকে সেচ প্রকল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেচযন্ত্রগুলো হয়তো বন্ধ হয়ে আছে অথবা সেগুলোর ওপর তার ক্ষমতার চেয়ে বেশি চাপ পড়ছে। শুধু তা-ই নয়, শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের ৩২০ কিলোমিটারের বেশি নৌপথ নৌ-চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। ফলে কয়েক হাজার লোক বেকার হয়, নৌ-পরিবহনের খরচ বেড়ে যায়। এ নৌপথ এখন বর্ষা মৌসুমেও পুরোপুরি চলাচলের উপযোগী থাকে না।
ফারাক্কা ব্যারাজ দিয়ে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি সরিয়ে নেয়ায় বাংলাদেশকে ব্যাপক মাত্রায় গভীর নলকূপের মাধ্যমে সেচকাজ চালাতে হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় আর্সেনিকবাহী খনিজের অক্সিডাইজেশন হয়ে ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের বিষক্রিয়া ঘটে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় দুই কোটি মানুষ কম-বেশি আর্সেনিকের হুমকিতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটাকে ‘জনগোষ্ঠীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিষক্রিয়া’র ঘটনা বলে বর্ণনা করেছে। গঙ্গা নদী ব্যবস্থার পানিপ্রবাহ ফারাক্কার আগের স্তরে নিয়ে গেলে এর সমাধান হতে পারে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যাপনারত দুই বিশেষজ্ঞ স্থমাস ই ব্রিজ ও মির টি হোসেইন। তাদের গবেষণার শিরোনাম ‘গ্রাউন্ডওয়াটার আর্সেনিক পয়জনিং অ্যান্ড এ সলিউশন টু দ্য আর্সেনিক ডিজাস্টার ইন বাংলাদেশ’। তাদের মতে, আর্সেনিক সমস্যা মেটাতে হলে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার আন্তঃসীমান্ত নদী বিশেষত গঙ্গা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। এর অর্থ হলো, বাংলাদেশের ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে নিয়ে যেতে হবে ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হওয়ার আগের পর্যায়ে।
নদীমাতৃক বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে ২৩০টিরও বেশি নদ-নদী রয়েছে। এর মধ্যে ৫৭টি নদী আন্তর্জাতিক; যার মধ্যে ৫৪টির মূল উৎস চীন, নেপাল, ভুটান ও ভারতের পর্বতময় অঞ্চল। অবশিষ্ট তিনটি নদী এসেছে পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার থেকে। বাংলাদেশের অবস্থান ভাটি অঞ্চলে হওয়ায় উজানে যেকোনো ধরনের পানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ভারত কর্তৃক গঙ্গা নদীতে ফারাক্কা বাঁধের কারণে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। ভারত কর্তৃক ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানির ব্যাপক প্রত্যাহার বাংলাদেশের জনগণের জীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। মানবসৃষ্ট এ দুর্বিপাকে বাংলাদেশের কৃষি, মত্স্য, বনজ, শিল্প, নৌ-পরিবহন, পানি সরবরাহ ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
ভারতের
গঙ্গার পানি প্রত্যাহারের কারণেই
সুন্দরবনসহ দক্ষিণাঞ্চলের নদী, ভূমি ও বন লবণাক্ততার
শিকার হয়েছে;
যা সুন্দরবনের
জীববৈচিত্র্যকেও হুমকিতে
ফেলেছে। এ দক্ষিণাঞ্চল তথা পটুয়াখালী থেকে ফরিদপুর পর্যন্ত
অঞ্চল একসময়
ছিল বাংলাদেশের
সবচেয়ে উৎপাদনশীল
কৃষি এলাকা।
কিন্তু এখন সেখানে ফসল বিপর্যয় নিয়মিত
ঘটনা। ফারাক্কার
কারণে উজানের
পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় সুন্দরবনসহ
দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলো
পলি বহনের
বদলে পলিতেই
ভরাট হচ্ছে।
আর এটা প্রভাব ফেলছে
সুন্দরবনের গাছ, প্রাণী-পতঙ্গ,
জলজ জীবসহ
সব প্রাণের
বাস্তুসংস্থানে। সুন্দরবনের
ভেতরেই লবণাক্ততার
মাত্রা সবচেয়ে
বেশি। এর প্রভাব পড়ছে বনের বাস্তুসংস্থানে। অথচ এখানেই বসবাস
করে বিপন্ন
প্রজাতির সুন্দরী
গাছ, রয়েল বেঙ্গল টাইগার
এবং ডলফিন
ও কুমির।
সম্প্রতি সুন্দরবনের
বিষয়ে ইউনেস্কোর
প্রতিবেদনেও সুন্দরবনের
লবণাক্ততার জন্য ফারাক্কা ব্যারাজকেই
দায়ী করা হয়।
ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের ক্ষতির পরিমাণ কত এবং কী কী পরিবর্তন হয়েছে, তার একটি হিসাব খুবই জরুরি। ভারতের সঙ্গে আলোচনা এবং দেশে নদীকেন্দ্রিক ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্যও এটি প্রয়োজন। বাংলাদেশ সরকার ১০০ বছরের জন্য ব-দ্বীপ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। প্রত্যাশা থাকবে এ পরিকল্পনায় ফারাক্কা বাঁধের প্রভাব ও তা মোকাবেলায় সম্ভাব্য করণীয় বিষয় সংযুক্ত করা হবে। ফারাক্কা বাঁধের ফলে বাংলাদেশে কী ধরনের ক্ষতি হয়েছে সে-সম্পর্কিত তথ্য-উপাত্ত থাকলে আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়গুলো উপস্থাপনের মাধ্যমে এ সমস্যার একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানও আশা করা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা করতেও তথ্য প্রয়োজন।
ফারাক্কা বাঁধসহ অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানি ও পলি ব্যবস্থাপনায় কার্যকর কোনো চুক্তি না থাকায় দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। গঙ্গা চুক্তি থাকা সত্ত্বেও সবসময় বাংলাদেশ তার ন্যায্য হিস্যা অনুযায়ী পানি না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। গঙ্গানির্ভর বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ এরই মধ্যে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ এলাকার প্রায় চার কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, বাণিজ্য, পানীয় জল, নৌ-পরিবহন, শিল্প-কারখানা ও সুন্দরবনের ভূমি গঠন প্রক্রিয়া গঙ্গার স্বাভাবিক পানি ও পলিপ্রবাহের ওপর নির্ভরশীল। এক্ষেত্রে ভবিষ্যতে শুধু পানি চুক্তি নয়, অববাহিকার সব নদীর জন্য জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের পানিপ্রবাহ আইনের আওতায় সব দেশের অণুস্বাক্ষরের মাধ্যমে ‘গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদী কমিশন’ গঠন করা প্রয়োজন, যার মাধ্যমে সমন্বিত পানি-পলি ব্যবস্থাপনা এবং শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার পথ সুগম হবে।










