যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের বিপদ সম্পর্কে ইদানীং আলোচনার শেষ নেই। প্রকৃত পরিস্থিতি আরো কতটা ভয়ংকর—এবার তার হদিস দিলেন গ্লোবাল রিসার্চ অন অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (জিআরএএম) প্রকল্পের বিশেষজ্ঞরা। গত দুই দশকে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ৭৬ শতাংশ। এর মধ্যে আবার সবচেয়ে এগিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয়। এ অঞ্চলে দুই দশকে শিশুদের ওপর অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ বেড়েছে প্রায় ১১৬ শতাংশ। তালিকায় বাংলাদেশের নাম ওপরেই রয়েছে। দেশে নবজাতক মৃত্যুর অন্যতম কারণও শরীরে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতিরোধক্ষমতা (রেজিস্ট্যান্স) জন্মে যাওয়া। যার পেছনে নির্বিচারে অ্যন্টিবায়োটিক প্রয়োগের বড় ভূমিকা রয়েছে। এক্ষেত্রে শুধু জেলায় জেলায় শিশু ইউনিট চালু করে আত্মতুষ্টিতে ভুগলে চলবে না। একেবারে গোড়ার দিকের স্বাস্থ্যবিধিগুলো মেনে চলায় জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার সম্পর্কে প্রচার চালাতে হবে ডাক্তার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে বিদ্যমান নীতিমালার কার্যকর প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে।
গবেষণায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের (ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স) জেরে যেসব শিশু মারা গেছে, তারা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ নিয়েই জন্মেছিল। ডাক্তাররা তাদের ওপরে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করেছিলেন। কোনোটাই কাজে আসেনি এবং এরই কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহারের দিকে আঙুল উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দরকারে-অদরকারে খেয়াল-খুশিমতো অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার প্রবণতা এখন এমন পর্যায়ে যে বহু অ্যান্টিবায়োটিক কার্যক্ষমতা হারাচ্ছে। ফল হচ্ছে মারাত্মক। বেশকিছু বড় ধরনের অসুখে, যেমন সেপসিস, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ও মূত্রনালির সংক্রমণে অনেকের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না। রোগী যদি শিশু হয়, তাহলে ব্যাপারটা আরো ভয়াবহ। কেননা শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এমনিতেই খুব কম। অত্যধিক অ্যন্টিবায়োটিকের কুপ্রভাব যে কতটা, সে সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ছত্রে ছত্রে সতর্কতা জারি করেছে। স্পষ্ট জানানো হয়েছে, এ কারণেই ডাক্তাররা শিশুদের সাধারণ সংক্রমণ রুখতেও মাঝেমধ্যে যথেষ্ট বেগ পাচ্ছেন। অধিকাংশ হাসপাতালে অ্যান্টিবায়োটিক নীতি মানা হচ্ছে না।
প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ, সাধারণ ভাইরাসজনিত সর্দিজ্বরে ইচ্ছেমতো অ্যান্টিবায়োটিক নেয়া, ফার্মেসিগুলোয় প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রয়, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোয় চিকিৎসকদের নিয়ম না মেনে ইচ্ছামতো অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার, হাঁস-মুরগি, পশু ও কৃষিতে ব্যাপক হারে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে অজ্ঞতা/অসচেতনতাই এ সমস্যার মূল কারণ। দিন দিন সহজলভ্য অ্যান্টিবায়োটিকের এমন অকার্যকর হয়ে পড়াও চিকিৎসা পদ্ধতিকে কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল করে তুলছে। ফলে ক্রমবর্ধমান এ সমস্যার দিকে দৃষ্টি দেয়া এখন সময়ের দাবি। চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট ও নার্সদের অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারে বিশেষভাবে সচেতন হতে হবে এবং একই লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে জনগণকেও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণে সচেতন করতে হবে। এ ব্যাপারে বহির্বিশ্বের মতো বাংলাদেশের চিকিৎসকদের পাশাপাশি হাসপাতাল ও কমিউনিটি ফার্মাসিস্টদের বড় ভূমিকা রয়েছে। রোগীর কিডনি ও লিভারের কার্যক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে অ্যান্টিবায়োটিকের ডোজ নির্ণয় করা, রোগীকে ওষুধের কার্যকারিতা সম্পর্কে পরামর্শ দিয়ে চিকিৎসার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা—এসবই পারে সফলভাবে চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীকে সুস্থ করে তুলতে। এরই লক্ষ্যে রোগীকে অ্যান্টিবায়োটিক দেয়ার ক্ষেত্রে ডাক্তারের সচেতনতার পাশাপাশি ফার্মাসিস্টদের দায়িত্ব হবে ওষুধ ব্যবহার বিধি সম্পর্কে রোগীকে সচেতন করা, যেন সে সময়মতো ওষুধ সেবন করে এবং ডোজ সম্পন্ন করে।
বিশ্বের অনুন্নত দেশগুলোয় সবচেয়ে বেশি অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার হয়। এসব দেশে অ্যান্টিবায়োটিক প্রায় সর্বত্রই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গ্রহণ করা হয়। এক জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে মাত্র ৮ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসকের উপদেশে বিক্রি করা হয়। উন্নত বিশ্বেও এ সমস্যা বিদ্যমান। সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (সিডিসি), আমেরিকার এক জরিপে দেখা গেছে, সেখানে চিকিৎসকদের অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রিপশনের মধ্যে কানের সংক্রমণের জন্য ৩০ শতাংশ, সাধারণ ভাইরাসজনিত ঠাণ্ডার জন্য ১০০ শতাংশ, গলাব্যথার জন্য ৫০ শতাংশ প্রেসক্রিপশন অপ্রয়োজনীয়। যত্রতত্র নিয়ন্ত্রণহীন অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার মানুষের জন্য বয়ে আনছে ব্যাপক স্বাস্থ্যঝুঁকি। অনেক খামারি গ্রোথ প্রমোটার হিসেবে খাবারের সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিক মিশিয়ে দিচ্ছেন গবাদিপশু মোটাতাজাকরণ অথবা ব্রয়লার উৎপাদনের জন্য। ফলে যেসব পশুপাখিকে স্বল্পমাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো হচ্ছে, সেসব পশুপাখির শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট জীবাণু তৈরি হয় এবং তা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে। সেখানে অন্যান্য জীবাণুও রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে এসে জিন ট্রান্সফরমেশন ও মিউটেশনের মাধ্যমে রেজিস্ট্যান্ট হচ্ছে। এভাবে একটি মহামারী নীরবে ঘটে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ সরকার অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের ব্যাপারটি খুবই গুরুত্বসহকারে নিয়ে এ থেকে উত্তরণের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে যাচ্ছে, যার মধ্যে অন্যতম ২০১৬ সালে ওষুধ বিক্রির নীতিমালায় ‘মডেল ফার্মেসি’ ও ‘মডেল ফার্মেসি শপ’-এর প্রবর্তন। যেখানে সুনির্দিষ্টভাবে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। ওই নীতিমালায় ফার্মেসিগুলোয় ফার্মেসি কাউন্সিল অব বাংলাদেশের লাইসেন্সপ্রাপ্ত ফার্মাসিস্ট (গ্রেড এ, বি ও সি) ব্যতীত ওষুধ ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আমরা মনে করি, উল্লিখিত নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন হলে অনেকাংশে অ্যান্টিবায়োটিকের রেজিস্ট্যান্স বন্ধ করা যাবে। কিন্তু আমরা দেখতে পাই, যে উদ্দেশ্যে মডেল ফার্মেসি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, বাস্তবে সেগুলো সেভাবে কাজ করছে না। এক্ষেত্রে নজরদারির অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে এবং মডেল ফার্মেসি থেকেও ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি হচ্ছে। এক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি এবং আইনি ব্যবস্থা নেয়া, প্রয়োজনে ড্রাগ লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবেলা এবং সীমিত করার ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক যে গ্লোবাল অ্যাকশন প্ল্যান ২০১৫ করা হয়েছে, সেটাকে বাংলাদেশে সফলভাবে প্রয়োগ করা গেলে নিরাপদ অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, গ্লোবাল অ্যাকশন প্ল্যান পাঁচটি অভীষ্ট নির্ধারণ করেছে। ক. কার্যকর যোগাযোগ, শিক্ষা ও ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স-সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং এর সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা; খ. নজরদারি ও গবেষণা শক্তিশালী করা; গ. সংক্রমণের হার হ্রাস করা; ঘ. অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার যুক্তিসংগত করা; ঙ. অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স প্রতিরোধ টেকসই বিনিয়োগ নিশ্চিত করা। বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কোনো স্ট্যান্ডার্ড নীতিমালা এখন পর্যন্ত প্রণয়ন করা হয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১১ সালে একটি গাইডলাইন প্রণয়ন করে। এর আলোকে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও অন্যান্য প্রেক্ষাপট বিবেচনায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের একটি বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের বড় সীমাবদ্ধতা হলো নীতিমালা প্রণয়নের পর সেটার সঠিক বাস্তবায়ন, কঠোরভাবে প্রয়োগ ও নজরদারি নিশ্চিত করা। প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধ করতে হবে। নিবন্ধনকৃত চিকিৎসকের লিখিত প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করা যাবে না মর্মে বিজ্ঞ হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছেন, তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে। এ-সংক্রান্ত আইনগুলো সুনির্দিষ্ট হতে হবে এবং কঠোর শাস্তির বিধান থাকতে হবে।










