ইদানীং অর্থনীতি নিয়ে আমার ভাবনা কী জানতে চেয়েছেন আমার এক ফেসবুক বন্ধু। প্রথমে আমি ভাবতেই পারিনি অর্থনীতি নিয়ে আবার ভাবার কী আছে। পরে আমার মেয়েদের আগ্রহের কারণে ভাবতে গিয়ে দেখি ভাবনার তো অভাব নেই, বরং এত কিছু ভাবনা যে এগুলো সমন্বয় করে সাজিয়ে লেখাটাই সমস্যা।  

কম্পিউটারে চোখ বুলিয়ে দেখি সারা বিশ্ব এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ে ভাবছে। দুটি বিশেষ কারণে পৃথিবীর সব দেশেই এ দুশ্চিন্তা। প্রথমত, কভিড মহামারীর জন্য গত দুই বছর মানুষকে অনেকটা গৃহবন্দির মতো জীবন কাটাতে হয়েছে। সম্প্রতি এ মহামারী কিছুটা প্রশমন হওয়ার ফলে সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আবার চাঙ্গা হয়ে ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে বাজারদরের ওপর এমনিতেই কিছুটা চাপ সৃষ্টি হচ্ছিল। মানুষ ঘর থেকে বের হওয়া শুরু করেছে। বিয়ে-শাদি ও অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠান, যা এতদিন স্থবির হয়ে পড়েছিল, এখন পুরাদমে শুরু হয়েছে। দেশের ভেতরে ও বাইরে বিমান, সমুদ্রবন্দর ও স্থলবন্দরগুলো আবার প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে উঠেছে। ফলে চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাজারদরও বৃদ্ধি পাচ্ছিল। দ্বিতীয়ত, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ফলে যেসব দেশ খাদ্য, জ্বালানি তেল, গ্যাস ও ভোজ্যতেলের জন্য এ দুটি দেশের ওপর নির্ভরশীল, সেসব দেশে অনিবার্য কারণে এসব দ্রব্যের দাম বেড়ে গেছে এবং অব্যাহতভাবে বাড়ছে। সংগত কারণে এ বৃদ্ধ বয়সে অনেকটা কর্মহীন জীবনেও মূল্যস্ফীতির কথা না ভেবে পারছি না।

চায়ের টেবিলে আমার মেয়ে লুনা ও সানিয়া জিজ্ঞেস করল, মূল্যস্ফীতি নিয়ে এত দুশ্চিন্তার কারণ কী। আমি তাদের ১৯২২-২৩ সালে জার্মানিতে হাইপার ইনফ্লেশনের কথা বললাম। সে সময়ে চোরেরা নাকি ছালাভর্তি অর্থ মাটিতে ফেলে দিয়ে শুধু ছালাটাই চুরি করত। আরো বললাম আমার প্রিয় শিক্ষক ড. খলিলুর রহমান সাহেবের কাছে শোনা একটি গল্প।

এক বাবা মৃত্যুর আগে তার দুই ছেলের জন্য প্রচুর অর্থ ব্যাংকে রেখে যান। বড় ছেলে ছিল খুবই নিষ্ঠাবান, বুদ্ধিমান ও বৈষয়িক। বাপের দেয়া অর্থের পুরোটাই সে দীর্ঘমেয়াদি আমানত হিসেবে ব্যাংকে রেখে দেয় এবং নিজে কঠোর পরিশ্রম করে যা উপার্জন করে, তার একটা বিরাট অংশ ভবিষ্যতের জন্য জমাতে থাকে। বার্ধক্যে যাতে গ্রামে একটা বড়সড় বাড়ি করে আরাম আয়েশে থাকতে পারে, সে লক্ষ্যে যেকোনো অপচয় করা থেকে সতর্ক থাকে সে। অন্যদিকে ছোট ভাই ছিল ভীষণ অপচয়কারী। নেশা করা আর আনন্দ, হই-হুল্লোড় নিয়েই ছিল তার জীবন। বাবার দেয়া অর্থ খুব দ্রুতই শেষ হয়ে যায় তার। নিজের জীবনে তেমন কোনো উপার্জন নেই, সঞ্চয়ও নেই। এমন সময় এল হাইপার ইনফ্লেশন। দেখা গেল বড় ভাইয়ের জমানো সব অর্থ দিয়েও ছোট ভাইয়ের ব্যাক ইয়ার্ডে ফেলে রাখা খালি মদের বোতলগুলো কেনা সম্ভব না। 

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, তাহলে কি সঞ্চয়ী কিংবা সাবধানী লোকেরা নিজেদের অজান্তেই নিজেদের ক্ষতি করে যাচ্ছে? স্যার বলেছিলেন, এ গল্পের আলোকে আপাতত তা-ই মনে হচ্ছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে জার্মানির ব্যাপারটা সাধারণ মূল্যস্ফীতি বা মৃদু মূল্যস্ফীতি ছিল না, ছিল অতিমাত্রার মূল্যস্ফীতি। ফলে জার্মানদের অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে যেসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, তা আপাতত ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। যদিও এ অবস্থার জন্য সঞ্চয়কারীরা নিজেরা দায়ী ছিল না।

প্রকৃতপক্ষে কোনো দেশে সঞ্চয়ের পরিমাণ কমে গেলে সে দেশে বিনিয়োগ কমে যাবে আর বিনিয়োগ না থাকলে চাকরিবাকরি তথা অর্থনৈতিক উন্নতির কোনো সম্ভাবনাই থাকে না। ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা শিল্প প্রতিষ্ঠার জন্য উদ্যোক্তাদের নিজস্ব সম্পদই যথেষ্ট নয়। এজন্য দরকার ব্যাংকঋণ। আর ব্যাংকঋণের বৃহত্তর অংশই হচ্ছে সঞ্চয়কারীদের আমানত। ছোট ভাইয়ের মতো অপচয় করলে ধার দেয়ার মতো প্রচুর অর্থ ব্যাংকের হাতে থাকত না। ব্যাংকঋণের অভাবে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগ হাতে নিতে পারতেন না এবং চলমান শিল্প কিংবা ব্যবসা চালু রাখা ও সম্প্রসারণ সম্ভব হতো না। তার মানে হচ্ছে, নতুন কোনো চাকরি সৃষ্টি হতো না এবং আগে যাদের চাকরি ছিল, তারাও চাকরি হারাতে বাধ্য হতো। বলা বাহুল্য, বেকার লোকদের উপার্জন থাকে না, আর উপার্জন না থাকলে সঞ্চয়ও থাকে না। আবার সঞ্চয় না থাকলে বিনিয়োগ থাকে না। এভাবে অর্থনীতিতে একটা দুষ্ট চক্রের (vicious circle) সৃষ্টি হয়। ফলে অর্থনীতি আর পূর্ণ সম্ভাবনায় বিকাশ লাভ করতে পারে না। এ অবস্থা নিরসনের জন্য তখন সরকারের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। বাজার অর্থনীতির প্রবক্তা অ্যাডাম স্মিথ যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য সৃষ্টির কথা বলেছেন, তখন আর তা সম্ভবপর হয় না।


আলোচনার এ পর্যায়ে আমার ছোট মেয়ে ইফা জানতে চাইল, হাইপার ইনফ্লেশন আর মৃদু ইনফ্লেশনের তফাত কীভাবে বুঝব? আমি বুঝিয়ে বললাম, প্রথমে বুঝতে হবে মূল্যস্ফীতি কী জিনিস! মনে রাখতে হবে জিনিসপত্রের উচ্চমূল্যের নাম মূল্যস্ফীতি নয়। অর্থনীতিতে দ্রব্যমূল্যের সাধারণ স্তর (যখন যে অবস্থায় আছে তার একটা স্ল্যাপশট) যখন উল্লেখযোগ্যভাবে ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তখনই তাকে মূল্যস্ফীতি বলা হয়। মনে করো, এক কেজি চালের দাম অস্ট্রেলিয়ায় ২ ডলার, অর্থাৎ বাংলাদেশের টাকায় ১৪০ টাকা। বাংলাদেশে একই মানের এক কেজি চালের দাম হচ্ছে ৭০ টাকা। অর্থাৎ অস্ট্রেলিয়ায় চালের দাম বাংলাদেশের তুলনায় দ্বিগুণ। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির হার অস্ট্রেলিয়ার তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে। যদি আগের তুলনায় বাংলাদেশে চালের দাম বেড়ে থাকে। হতে পারে এই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত চালের দাম অস্ট্রেলিয়ার তুলনায় অনেক কম। মূল্যস্ফীতি হলো একটা সময়ের দ্রব্যমূল্যের সাধারণ স্তরের সঙ্গে আরেকটা সময়ের দ্রব্যমূল্যের সাধারণ স্তরের তুলনা। একটা দেশের সঙ্গে আরেকটা দেশের দ্রব্যমূল্যের তুলনা নয়।

দ্রব্যমূল্য যদি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, তখন মানুষ ধীরে ধীরে তাদের আয়ের পরিমাণ বাড়িয়ে নিতে সমর্থ হয়। বিনিয়োগকারীরা লাভের আশায় অধিক বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন। দেশের সামগ্রিক অবস্থার উন্নতি হয়। কিন্তু দ্রব্যমূল্য যদি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে তাহলে দেশের শ্রমিক, শিক্ষক-কর্মচারীরা তাদের আয় বাড়াতে সমর্থ হন না। কারণ আয় যত না বাড়ে, তার চেয়ে বেশি বেড়ে যায় পণ্যের দাম। ফলে এসব মানুষ আগের তুলনায় গরিব হয়ে পড়ে, তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে সমর্থ হয় না। ধীরে ধীরে বাড়াটাকে বলা যায় মৃদু ইনফ্লেশন আর লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়াটাকে বলা যায় হাইপার ইনফ্লেশন। কিন্তু উভয় পরিস্থিতিতেই আরেক  শ্রেণীর মানুষ জিনিসপত্রের দাম যে হারে বাড়ে, তার চেয়ে বেশি হারে তাদের আয় বাড়াতে সক্ষম হয়। সাধারণত ব্যবসায়ীরা এ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। মূল্যস্ফীতির সময়ে এ শ্রেণীর মানুষ লাভবান হয়। কিন্তু জিনিসপত্রের দাম যখন ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়তে থাকে তখন ব্যবসায়ীরাও খেই হারিয়ে ফেলেন। শিল্প কিংবা ব্যবসার পরিকল্পনা ঠিক করার সুযোগ থাকে না। কোন ব্যবসায় কত টাকা মূলধনের দরকার তা ঠিক করাও সম্ভব হয় না। কোনো বিনিয়োগ শুরু করার পর আর শেষ করা যায় না।

লুনার জিজ্ঞাসা—জার্মানিতে কীভাবে হাইপার ইনফ্লেশন শুরু হয়েছিল? আমি প্রফেসর খলিলুর রহমান সাহেবের উদ্ধৃতি দিয়ে বললাম, প্রথম মহাযুদ্ধের গোড়ায় জার্মান সরকার আইন করে মার্ক থেকে স্বর্ণে রূপান্তর নিষিদ্ধ করে দেয়। অর্থাৎ অর্থ ছাপানোর জন্য তখন আর কেন্দ্রীয় ব্যাংককে স্বর্ণ মজুদ রাখার দরকার হতো না। লাগামহীনভাবে অর্থের অংক বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে অর্থের পরিমাণ তত্ত্বের (Quantity Theory of Money) নিয়ম মেনে এমনিতেই মূল্যস্ফীতি হচ্ছিল। তদুপরি ১৯২১ সালে ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে মিত্রশক্তি জার্মানির ওপর যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি বাবদ ১৩২ বিলিয়ন গোল্ড মার্কের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিল। জার্মানির হাতে ছিল কাগজের মার্ক এবং যথেষ্ট স্বর্ণও ছিল না হাতে। বাধ্য হয়েই জার্মানি তখন খোলাবাজারে ডলার কিনতে শুরু করল। আর ডলারের দাম হু-হু করে বাড়তে লাগল। প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে জার্মান মুদ্রায় আমেরিকান ডলারের দাম ছিল ৪ দশমিক ২ মার্ক। যুদ্ধ শেষে ১৯১৯ সালে ৬ দশমিক ৭ মার্ক, কিন্তু মাত্র দুই বছরের মাথায় ১৯২১ সালের প্রথম দিকে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৬০ মার্কে দাঁড়ায়। অর্থনীতিবিদরা এ অবস্থাকেও মোটামুটি স্থিতিশীল হিসেবেই ধরে নেন। কিন্তু ১৯২১ সালের নভেম্বরেই ১ আমেরিকান ডলারের দাম বেড়ে যায় ৩৩০ জার্মান মার্কের সমান এবং ১৯২২ সালের ডিসেম্বরের শেষের দিকে ৮০০ মার্কের সমান। এ সময় থেকে মোটামুটি এক বছরের মাথায় ১৯২৩ সালের নভেম্বরে আমেরিকান ১ ডলারের সমান ছিল ৪,২১০,৫০০,০০০,০০০ মার্ক। এ সময় থেকে জার্মানির বাজারে ডলার তথা বিদেশী কারেন্সি বেচাকেনা বন্ধ হয়ে যায়, কারণ জার্মান মার্ক বস্তুত এক টুকরো অর্থহীন কাগজে পরিণত হয়ে পড়েছিল।

কোনো গ্রহণযোগ্য রিজার্ভ না থাকার ফলে জার্মান কারেন্সি বিদেশে তার গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছিল আগে থেকেই। বিদেশী পাওনাদাররা তখন তাদের পাওনা পণ্যজাত দ্রব্যাদির মাধ্যমে পেতে চায় এবং এ উদ্দেশ্যে ফ্রান্স ও বেলজিয়াম জার্মানির রাড় অঞ্চল (Ruhr) দখল করে নেয়। রাড় ছিল কয়লাসমৃদ্ধ অঞ্চল এবং এ অঞ্চল থেকে তখন তারা কয়লা আমদানি শুরু করে। বিদেশীদের এই অবিমৃষ্যকারিতায় জার্মান জণগণ এক চরম অপমান ও ক্ষোভে জ্বলতে থাকে। এই দখলের প্রতিবাদে জার্মানির রাড় অঞ্চলে ব্যাপক ধর্মঘট শুরু হয়ে যায়। এ ধর্মঘটিদের হাতে রাখার জন্যও সরকারের আরো অর্থ ছাপানো ছাড়া গত্যন্তর ছিল না।

লুনা জানতে চায়, প্রথম মহাযুদ্ধে যেসব দেশ জার্মানির বিপক্ষে ছিল সেসব দেশেও কি হাইপার ইনফ্লেশন হয়েছিল? না। কারণ প্রথমত, যুদ্ধে সেসব দেশ বিজয়ী হয়েছিল। ফলে তাদের যুদ্ধের কোনো খেসারত দিতে হয়নি। দ্বিতীয়ত, এসব দেশে তখনো গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড চালু ছিল এবং মুদ্রানীতির সঙ্গে সঙ্গে রাজস্ব নীতিও কাজে লাগানো হয়েছিল। ফ্রান্সে এ সময়ে প্রথমবারের মতো আয়কর চালু করা হয়। ফলে জার্মানির মতো সেখানে বেপরোয়াভাবে অর্থ ছাপানোর দরকার হয়নি এবং সম্ভবও ছিল না।

অতিমাত্রায় মূল্যস্ফীতির আরেকটা কারণ হচ্ছে অর্থের velocity of circulation। কোনো অর্থনীতিতে অর্থ কত দ্রুত হাত বদলায়, তার ওপরও নির্ভর করবে দ্রব্যসামগ্রীর দাম কত দ্রুত বৃদ্ধি পায়। জার্মানরা যখন বুঝতে পারল অর্থের মূল্যমান দ্রুত কমে যাচ্ছে তখন তারা যত দ্রুত সম্ভব অর্থ খরচ করতে লাগল। তার মানে যারা কোনো দ্রব্য কেনার ব্যাপারে আরো দু-এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে পারত, তারাও এখনই হাতের জঞ্জাল বিদায় করার জন্য (কেনার জন্য) উঠেপড়ে লাগল। অন্যদিকে বিক্রেতারা বর্তমান বাজারদরে বিক্রি করতে নারাজ। আরো দাম বাড়বে সেই বিশ্বাসে পণ্যসামগ্রী দোকান থেকে সরিয়ে গোপনীয় স্থানে মজুদ করা শুরু করল। মোট কথা জার্মান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (রাইখ ব্যাংক) ইস্যুকৃত ডয়েচে মার্কের ওপর জনগণের আর কোনো আস্থা ছিল না।

এ সময়ে জার্মানিতে আরো বেশকিছু পরিবর্তন ঘটেছিল। ১৯২৩ সালের ১৩ আগস্ট গাস্টভ স্ট্রেসম্যান (Gustav Stresemann) জার্মানির চ্যান্সেলর নিযুক্ত হন। ১৯২৩ সালে ২৬ সেপ্টেম্বর স্ট্রেসম্যান জার্মান শাসনতন্ত্রের সাতটি ধারা বিলোপ করে জরুরি অবস্থা জারি করেন। নবনিযুক্ত অর্থমন্ত্রী হ্যান্স লুথার (Hans Luther) এবং জার্মান ন্যাশনাল ব্যাংকের তদানীন্তন ম্যানেজিং ডিরেক্টর য্যাল্মার সাশটর (Hjalmar chacht) সহায়তায় ১৯২৩ সালের ১৫ অক্টোবর জার্মান কারেন্সি ডয়েচে মার্কের একটা অভিনব বিকল্প চালু করেন। এ বিকল্প মার্কের নাম দেয়া হয়েছিল রিটেনমার্ক এবং ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানের নাম রিটেনব্যাংক। 

আমার মেয়েরা প্রায় একই সুরে জিজ্ঞেস করল রিটেনমার্কের মূল্যমান স্থিতিশীল রাখার জন্য তার বিনিময়ে কোনো স্বর্ণ-রুপা কিংবা ফরেন কারেন্সি মজুদ রাখা হয়েছিল কিনা? না। ইস্যুকৃত অর্থের বিনিময়ে যথেষ্ট স্বর্ণ-রুপা কিংবা ফরেন কারেন্সি থাকলে তো আর ডয়েচে মার্কের বিপর্যয় ঘটত না। নতুন কারেন্সির রিজার্ভ হিসেবে রাখা হয়েছিল ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন রিটেনমার্কের মূল্যমানসম রিয়েল এস্টেট ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাসেটের মর্টগেজ। ১ রিটেনমার্কের মূল্যমান নির্ধারিত হয়েছিল ১ ট্রিলিয়ন ডয়েচে মার্কের সমান এবং এক আমেরিকান ডলারের বিপরীতে ৪ দশমিক ২ রিটেনমার্ক। অর্থাৎ পুরনো মার্কের পরিমাণ থেকে ১২টা শূন্য বাদ দিলে একটা নতুন মার্ক পাওয়া যেত। এ ব্যবস্থার ফলে দেশের ধনী লোকদের কোনো ক্ষতি হয়নি, কারণ এসব লোক আগেভাগেই তাদের অর্থ বিদেশী ব্যাংকে সরিয়ে ফেলেছিল। দেশের গরিব লোকেরাও তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, কারণ তাদের হাতে তেমন কোনো অর্থকড়ি ছিল না। মধ্যবিত্তদের যারা অর্থ ধার দিয়েছিল (মহাজন) তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আর যারা ঋণগ্রহীতা (খাতক) তারা লাভবান হয়েছিল।

১৩ নভেম্বর য্যাল্মার কারেন্সি কমিশনার নিযুক্ত হন এবং ১৫ নভেম্বর থেকে ডয়েচে মার্কের প্রিন্টিং বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় থেকে সরকারি ঋণপত্র ও ট্রেজারি বিলের ডিসকাউন্টিংও বন্ধ হয়ে যায়। ২০ নভেম্বর থেকে য্যাল্মার রাইখব্যাংকের প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হন। ফলে রাজস্ব নীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয় অনেকটা সহজ হয়ে পড়ে। দেশের মানুষ নতুন মুদ্রাকে গ্রহণ করার ফলে জার্মানির অর্থনীতিতে স্বস্তি ফিরে আসে এবং হাইপার ইনফ্লেশন বন্ধ হয়ে যায়।

মেয়েরা জিজ্ঞেস করল, এর মধ্যে কী ঘটল যে রিটেনমার্কের ওপর জনগণের আস্থা ফিরে এল। আমি বললাম রিটেনমার্কের ওপর জনগণের আস্থা ফিরে এল না, বরং জন্মাল বলতে পারো, কারণ এর আগে বাজারে রিটেনমার্ক ছিল না। ডয়েচে মার্ক ও রিটেনমার্কের মধ্যে মূল পার্থক্য হচ্ছে, রিটেনমার্কের উৎপাদন ছিল সীমিত আর ডয়েচে মার্কের উৎপাদন ছিল বল্গাহীন। তাছাড়া এ সময়ে মুদ্রানীতির সঙ্গে সঙ্গে রাজস্ব নীতিও প্রয়োগ করা শুরু হয়েছে। আগে শুধু মুদ্রার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। মুদ্রানীতির ব্যবহার যুদ্ধের প্রথম থেকেই ছিল না, পরেও ছিল না।

সানির জিজ্ঞাস্য, বাংলাদেশে কি হাইফার ইনফ্লেশন ঘটতে যাচ্ছে? আমি বললাম, এ মুহূর্তেই আমাদের অত নিরাশ হওয়ার কারণ নেই। কী ঘটতে যাচ্ছে তা নির্ভর করবে সরকার কত দ্রুততার সঙ্গে, সততার সঙ্গে ও দক্ষতার সঙ্গে অবস্থার সামাল দিতে পারে তার ওপর। সরকার যখন জনগণকে কৃচ্ছ্রসাধনের কথা বলবে তখন দেখতে হবে এ মিতব্যয়টা সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য কিনা। অনাবশ্যক আমদানির ক্ষেত্রে, অনাবশ্যক বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে শুনে আশান্বিত হচ্ছি। আমাদের দেশকে বাঁচানোর জন্য আমাদের সব শ্রেণীর মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসুক, এটাই আমার আজকের দিনের ভাবনা।

 

আলী আহমাদ রুশদী: অর্থনীতিবিদ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক শিক্ষক