দেশের সব নাগরিককে পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আনতে যাচ্ছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী এক বছরের মধ্যেই চালু করা হবে সবর্জনীন পেনশন। বুধবার সরকারি ক্রয় ও অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে এ তথ্য জানান অর্থমন্ত্রী। দেশের মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। এখন তা ৭৩ বছরে উন্নীত হয়েছে। সামনে আরো বাড়বে। স্বাভাবিকভাবে বাড়বে নির্ভরতার হারও। কাজেই বয়স্ক জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে সবর্জনীন পেনশন স্কিম চালুর যে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, তা সময়োচিত। অন্য দেশগুলোর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এর সুষ্ঠু বাস্তবায়নই বাঞ্ছনীয়।

জাতীয়ভাবে সবর্জনীন পেনশন ব্যবস্থা প্রবর্তন আওয়ামী লীগের অন্যতম রাজনৈতিক অঙ্গীকার। ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে এ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিল দলটি। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ করে ছয় বছর ধরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। আর ২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকে অর্থমন্ত্রীরা প্রতি বাজেটেই প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু খুব একটা অগ্রগতি হচ্ছিল না। অবশেষে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু হওয়া নিয়ে সুনির্দিষ্ট আভাস মিলেছে। কিছুটা দেরিতে হলেও সামাজিক সুরক্ষা বিবেচনায় এটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ অনেক। ক্রমেই রাষ্ট্রীয় ব্যয় বাড়ছে। বিপরীতে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বাড়ছে না রাজস্ব আয়। অর্থ সংকটে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রকল্প চালিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। সবর্জনীন পেনশন স্কিমের জন্য প্রাথমিক তহবিলটা রাষ্ট্রীয়  কোষাগার  থেকে জোগাতে হবে। কাজেই সেই অর্থ কোথা থেকে সংস্থান করা হবে, সেটি নিয়ে রয়ে যাচ্ছে অনিশ্চয়তা। আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কেমন হবে, কীভাবে গঠন হবে পেনশন কর্তৃপক্ষ, তাদের দায়দায়িত্ব কী হবে, কার্যপ্রণালি কেমন হবে, ন্যূনতম প্রিমিয়াম হার কত হবে, তহবিল ব্যবস্থাপনা কেমন হবে, কীভাবে এবং কোথায় পেনশন তহবিল বিনিয়োগ হবে, লভ্যাংশ কীভাবে বণ্টন করা হবে, সেগুলো নিয়েও রয়ে গেছে অস্পষ্টতা। তাছাড়া বিপুলসংখ্যক মানুষের নামে পৃথক হিসাব খোলা, সেটি স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালনা করা যাবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন অনেকে। সব মিলিয়ে উদ্যোগটি বাস্তবায়ন বেশ চ্যালেঞ্জিং।

বিশ্বের অনেক দেশেই এরই মধ্যে কার্যকর করা হয়েছে সর্বজনীন পেনশন। যদিও পেনশন ব্যবস্থার উত্কর্ষে বিভিন্ন দেশের মধ্যে রয়েছে বিস্তর তারতম্য। বর্তমানে বিশ্বের সর্বোত্তম পেনশন ব্যবস্থা পরিচালনা করছে আইসল্যান্ড। এর পরে ভালো করছে নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক, ইসরায়েল, অস্ট্রেলিয়া, নরওয়ে, নিউজিল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, কানাডা, জার্মানি, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, সিঙ্গাপুর প্রভৃতি দেশ। সুদক্ষ ব্যবস্থাপনা, সুশাসন, বয়স্ক সব জনগোষ্ঠীকে পর্যাপ্ত অবসর সুবিধার আওতায় আনা, রাষ্ট্রীয় উদার আর্থিক সমর্থন নিশ্চিতের কারণে দেশগুলো বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হচ্ছে। এমনকি প্রতিবেশী ভারতও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। দেশটির কয়েকটি রাজ্যে কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা। সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে সেখানে লাভজনক বিভিন্ন উদ্যোগে লগ্নি করা হচ্ছে পেনশন তহবিল। সেখান থেকে প্রাপ্ত রিটার্নের একটা অংশ দিয়ে পরিচালন ব্যয় মেটানো হচ্ছে। আরেকটা অংশ সুবিধাভোগীকে দেয়া হচ্ছে। ফলে সরকারের ওপর চাপ থাকছে কম, আবার বিপুল জনগোষ্ঠী পাচ্ছে অবসর সুবিধা। সুতরাং ভারতসহ উল্লিখিত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা ও কর্মপ্রক্রিয়া আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।

সর্বজনীন পেনশন চালু হলে সরকারি চাকরিজীবীদের বাইরেও অবসর সুবিধার আওতা বাড়বে। এরই মধ্যে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার ওপর একটি কৌশলপত্র তৈরি করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদানের পাশাপাশি এ-সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের তাগিদ দিয়েছেন। বলা হচ্ছে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইন ও বিধি তৈরি করা হবে। এজন্য একটি আলাদা কর্তৃপক্ষ করা হবে। তার অধীনে পরিচালনা করা হবে এ পেনশন সুবিধা। শুরুর দিকে ব্যবস্থাটি ঐচ্ছিক রাখা হলেও পরবর্তী সময় এটি বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা পরিহারপূর্বক বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে কার্যকর নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলাই এখন জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবর্তনিকভাবে পেনশন তহবিল পরিচালনা করতে হলে সরকারের দায় অনেক বেড়ে যাবে। আনুষঙ্গিক পরিচালন ব্যয় তো রয়েছেই। বিদ্যমান আর্থিক চাপের মধ্যে সরকারের পক্ষে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালিয়ে যাওয়া কতটা সম্ভব তা নিয়ে সংশয় রয়ে যায়। এজন্য একটি জুতসই তহবিল ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।  বলা হচ্ছে, পেনশন তহবিলে সুবিধাভোগী প্রতি মাসে নিয়মিত চাঁদা দেবেন, সরকারও সমপরিমাণ অর্থ দেবে। তবে মানুষকে কত হারে অর্থ রাখতে হবে, সেটা একটা বড় বিবেচ্য। তখন ব্যবস্থাটি কতটা সর্বজনীন হবে, সেটা বোঝা যাবে। দেশের দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী ও নিম্নমধ্যবিত্তদের পক্ষে প্রতি মাসে ১ হাজার টাকা দেয়াও কষ্টসাধ্য। কাজেই প্রিমিয়াম নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের কথা মাথায় রাখতে হবে। তাছাড়া প্রথম দিকে কারা কারা পেনশন সুবিধাভোগী হবেন, এর বৈশিষ্ট্য ঠিক করার ক্ষেত্রেও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কথা ভাবতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় কিংবা স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে যেন এ তালিকা তৈরি করা না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। তহবিলের অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও অনেক সাবধান হতে হবে। অতীতে তহবিল তসরুপ বা অর্থ লুটপাটের ঘটনা কম নয়। তাই যারা সুবিধাভোগীর টাকা বিনিয়োগ করবেন, তাদের স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। সঠিকভাবে বিনিয়োগ করতে পারলে এ পেনশন তহবিল থেকে যা আয় হবে তা দিয়েই মাসিক পেনশন দেয়া সম্ভব। তাই কোনোভাবে এ তহবিলের অর্থ যেন ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ না হয়, তার জন্য প্রয়োজন সতর্ক প্রয়াস। সার্বিকভাবে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় নিশ্চিত করতে হবে সুশাসন। প্রত্যেক সুবিধাভোগীর নামে বছরের প্রথমে পেনশন স্টেটমেন্ট প্রেরণ, প্রতি মাসে পেনশন বিতরণ করা, সেই সঙ্গে মেসেজ পাঠানো ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।  কাজেই শুরু থেকেই এক কম্প্রিহেনসিভ কম্পিউটার প্রযুক্তির মাধ্যমে এ কর্মযজ্ঞ চালু করতে হবে। এক্ষেত্রে দেশীয় কম্পিউটার প্রযুক্তিবিদদের কাজে লাগানো যেতে পারে। 

সরকার পেনশন ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী শক্তিশালী এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে চাইছে। এটি এক সঠিক নির্দেশনার পদক্ষেপ। তবে বিদ্যমান বাস্তবতায় তা বাস্তবায়ন খুব একটা সহজ নয়। বর্তমানে দেশে বিভিন্ন ধরনের অবসর সুবিধার বিধান রয়েছে। যেমন সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তারা নিয়মিত শতভাগ পেনশন পান অবসরে যাওয়ার পর। অনেক স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পেনশন সুবিধা না থাকলেও রয়েছে প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটির সুবিধা। আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও আছে এ ধরনের সুবিধা। বাকিদের কোনো অবসর সুবিধাই নেই। এ রকম ভিন্ন ধরনের পেনশন সুবিধা বহাল রেখে সর্বজনীন পেনশন চালু করা দুরূহ। আবার জোরপূর্বক অ্যাডহক ভিত্তিতে কোনো রকম একটা ব্যবস্থা চালু করলে তা দীর্ঘমেয়াদে সুফল দেবে না। অনেক ক্ষেত্রে টিকিয়ে রাখাও কঠিন হবে। তাই সব দিক পর্যালোচনা করে ধীরে-সুস্থে একটি সমন্বিত, কার্যকর সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা গড়ে তোলাই সমীচীন।