হৃদরোগের ঝুঁকি প্রসঙ্গে কথা বলতে গেলে কোলেস্টেরলের কথা অবধারিতভাবেই চলে আসে। মোটা দাগে দুই ধরনের কোলেস্টেরলের কথা আমরা জানি— লো-ডেনসিটি লেপোপ্রোটিন বা এলডিএল যা খারাপ কোলেস্টেরল এবং হাই-ডেনসিটি লেপোপ্রোটিন যা ভালো কোলেস্টেরল হিসেবে পরিচিত। গত কয়েক দশক ধরে আমরা জেনে এসেছি, খারাপ কোলেস্টেরল হৃদযন্ত্রের আর্টারির দেয়াল বন্ধ করে হৃদরোগের আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে, আর্টারির দেয়াল পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে ভালো কোলেস্টেরল। সম্প্রতি কিছু ওষুধ তৈরি করা হয়েছে যা রক্তে ভালো কোলেস্টেরলের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে সক্ষম। কিন্তু এই ওষুধগুলো কার্ডিওভাস্কুলার রোগের ঝুঁকি কমাতে হতাশাজনকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ভালো কোলেস্টেরল যদি হৃদরোগ কমাতে সাহায্যই করে তাহলে এই ওষুধগুলো কাজ করলো না কেন— স্বাভাবিকভাবেই এমন প্রশ্ন সামনে চলে আসে। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গবেষণা করেন জেরেমি ফুরটাডো, ফ্র্যাংক স্যাকসসহ হার্ভার্ড টি.এইচ. চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেল্থের একদল গবেষক। গত ডিসেম্বরে এ সংক্রান্ত একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন তারা। সেই গবেষণার আলোকে কেন ভালো কোলেস্টেরল সবসময় ভালো নয়— তা ব্যাখ্যা করেছেন জেরেমি ফুরটাডো।

জেরেমি জানান, গত শতাব্দীর মধ্যভাগেও হৃদরোগের ঝুঁকি নির্ণয়ের জন্য সম্পূর্ণ কোলেস্টেরলকে (Total Cholesterol) একটি গুরুত্বপূর্ণ বায়োমার্কার হিসেবে বিবেচনা করা হতো। পরবর্তীতে, ১৯৭০ এবং ’৮০-র দশকে গবেষকরা আবিষ্কার করলেন সম্পূর্ণ কোলেস্টেরল আসলে এলডিএল এবং এইচডিএল নামে দুটি ভিন্নধর্মী সিস্টেমের সমন্বয়ে গঠিত এবং হৃদরোগের সঙ্গে এদের সম্পর্ক বিপরীপমুখী।

সম্প্রতি হার্ভার্ড চ্যান স্কুলের গবেষকরা এইচডিএল বা ভালো কোলেস্টেরলের মধ্যে আরো অনেকগুলো উপপ্রজাতি খুঁজে পান। তারা দেখতে পেলেন, এই উপপ্রজাতিগুলোর সঙ্গে থাকা প্রোটিনের ধরনও ভিন্ন ভিন্ন। বর্তমানে এইচডিএলের প্রোটিনসমৃদ্ধ সম্ভাব্য ২০০টি উপপ্রজাতির মধ্যে ১৬টি নিয়ে গবেষণা করছেন জেরেমি ও তার সহকর্মীরা। জেরেমি জানান, কিছু উপপ্রজাতি কার্ডিওভাস্কুলার রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করলেও কোনো কোনোটি কিছুই করছে না বা উল্টো ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

জেরেমি জানান, নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, ভালো কোলেস্টেরলের মধ্যে যেগুলোতে অ্যাপোলিপোপ্রোটিন সি৩ রয়েছে সেগুলো স্ট্রোক ও হৃদরোগের মতো কার্ডিওভাস্কুলার রোগ এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। সি৩ বা আলফা-২-ম্যাক্রোগ্লোব্যুলিনসমৃদ্ধ উপপ্রজাতিগুলোও উচ্চ ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। অন্যদিকে, যে এইচডিএলগুলোতে অ্যাপোলিপোপ্রোটিন ই বা অ্যাপোলিপোপ্রোটিন সি১ রয়েছে সেগুলো হৃদরোগের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ এইচডিএল (Total HDL) সুরক্ষা দিতে বেশি কার্যকর।

কোলেস্টেরিল ইস্টার ট্রান্সফার প্রোটিন (Cholesteryl ester transfer protein) বা সিইটিপি হলো এমন এক ধরনের প্রোটিন যা এইচডিএলকে এলডিএলে রূপান্তরিত করে ফেলে। গবেষকরা সিইটিপি নিরোধক ওষুধ তৈরি করে রক্তে এইচডিএলের পরিমাণ বাড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু তৃতীয় ধাপের ক্লিনিকাল ট্রায়ালের সময় দেখা গেল, হৃদরোগের মতো কার্ডিওভাস্কুলার রোগ উপশমে উল্লেখযোগ্য কোনো ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। অর্থাৎ সিইটিপি নিরোধক ওষুধগুলো হৃদরোগ বা মৃত্যুর হার কমাতে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য গবেষণাতেও দেখা গেছে, প্রাকৃতিকভাবে ঘটা জেনেটিক মিউটেশনের কারণে ভালো কোলেস্টেরলের পরিমাণ বেড়ে গেলেও এটি হৃদরোগের বিরুদ্ধে বিশেষ সুরক্ষা দিতে পারছে না।

এর কারণ হিসেবে জেরেমি জানান, তাদের দলের হাইপোথিসিস, কার্ডিওভাস্কুলার রোগের সঙ্গে প্রোটিনসমৃদ্ধ উপপ্রজাতিগুলোর একেকটির সম্পর্ক একেক রকম, কোনোটি ভালো, কোনোটি খারাপ। তাদের ধারণা, ওষুধগুলো সম্পূর্ণ এইচডিএলের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে ভালো কোলেস্টেরলের মধ্যে থাকা খারাপগুলো পরিমাণই বেশি হয়ে গেছে এবং সেজন্য ওষুধগুলো কাজ করেনি। গবেষণায় সেই প্রমাণও পেয়েছেন তারা।

জেরেমি বলেন, এই গবেষণার অন্যতম প্রধান একটি দিক হলো, এইচডিএলের উপপ্রজাতিগুলোতে থাকা প্রোটিনগুলো কী ধরনের কাজ করে সে সম্পর্কে আরো বেশি করে জানা। এইচডিএল শুধু কোলেস্টেরল বহনকারী মাধ্যম নয়, এতে রয়েছে অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ইম্যুনোলোজিকাল এবং রোগের ঝুঁকি কমানোর মতো অন্যান্য গুণাগুণও। তাই আগে খুঁজে বের করতে হবে কোন উপপ্রজাতিগুলো প্রতিরক্ষামূলক আর কোনগুলো ক্ষতিকর। এই তথ্য জানা গেলে ভালো এইচডিএলের পরিমাণ বাড়ানো বা খারাপ এইচডিএলের পরিমাণ কমানোর ওষুধ তৈরি করা সম্ভব হবে।

হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস এবং ভালো কোলেস্টেরলের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে পারে এমন স্বাস্থ্যকর খাবার নিয়ে জেরেমি এবং তার দলের নতুন গবেষণা শিগগিরই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।