ইউরোপের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে এবারের বসন্ত মৌসুম ছিল অস্বাভাবিক শুষ্ক। আর মে মাস ছিল বিশ্বজুড়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উষ্ণতম মাস। এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ু পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ সংস্থা কোপার্নিকাস।

২০২৫ সালের মে মাসে গড় বৈশ্বিক তাপমাত্রা ছিল ১৫ দশমিক ৭৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ১৯৯১-২০২০ সালের গড়ের তুলনায় দশমিক ৫৩ ডিগ্রি বেশি। একই সঙ্গে এটি প্রাক-শিল্প যুগের গড়ের তুলনায় ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি বেশি। কোপার্নিকাস বলছে, গত ২২ মাসের মধ্যে ২১ মাসই ছিল ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সীমার উপরে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের গতি নিয়ে গভীর উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়।

এই চরম তাপপ্রবাহের কারণে মে মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত হারে গলেছে গ্রিনল্যান্ডের বরফ। এ অস্বাভাবিক বরফ গলন বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে বড় অবদান রাখতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জলবায়ুবিদরা।

ডেনমার্কের মেটিওরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট (ডিএমআই) জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ডের বরফস্তর মে মাসের প্রথম দিকেই ব্যাপক হারে গলতে শুরু করে। যা ওই সময় সাধারণত খুব একটা দেখা যায় না। প্রতিষ্ঠানটির গ্লেসিওলজিস্ট লুইসো রোমেরো বলেন, ১ মে থেকে ৫ জুন পর্যন্ত সময়টিতে প্রায় ৩৬ বিলিয়ন টন (৩৬ হাজার কোটি টন) বরফ গলেছে। এটি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। তিনি বলেন, ১৯৮১ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে ওই সময়কালে গড় বরফ গলনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৮০০ কোটি টন। এবারের গলন হার তা থেকে চারগুণেরও বেশি।

ডিএমআই জানায়, মে মাসে গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ছিল। কিছু অঞ্চলে একটানা এক সপ্তাহ পর্যন্ত তাপমাত্রা ঊর্ধ্বমুখী ছিল। এই অস্বাভাবিক উষ্ণতা বরফের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে যা বরফ গলন তরান্বিত করে।

জলবায়ুবিদদের মতে, গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলে গেলে তা বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় উৎস হয়ে উঠতে পারে। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম বরফস্তর হিসেবে এখানে প্রায় ২৩ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বরফ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল স্নো অ্যান্ড আইস ডেটা সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ডের সমস্ত বরফ গলে গেলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় সাত মিটার (২৩ ফুট) পর্যন্ত বাড়তে পারে।

এদিকে তীব্র তাপপ্রবাহের ফলে গত কয়েক মাসে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের অনেক দেশে খরার প্রকোপ দেখা দিয়েছে। পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে গ্রীষ্মে পানি সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকরা ফসলহানির খবর জানাতে শুরু করেছেন।

তীব্র খরা

কোপার্নিকাসের পরিচালক কার্লো বুয়োনতেম্পো জানিয়েছেন, গত এক দশকের প্রতিটি বছরই ইতিহাসের ১০টি উষ্ণতম বছরের মধ্যে রয়েছে। ফলে বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু সংকট এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে প্রতিটি মাসই রেকর্ড গড়ার ঝুঁকিতে।

এবার মে মাসে ইউরোপের বড় অংশ যেমন: দক্ষিণ রাশিয়া, ইউক্রেন, তুরস্ক, ও উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম বৃষ্টি হয়েছে। উত্তর-পশ্চিম ইউরোপে মাটির আর্দ্রতার স্তর ১৯৭৯ সালের পর সবচেয়ে নিচে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে আফ্রিকার হর্ন অঞ্চল, মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকাতেও শুষ্ক পরিস্থিতি বিরাজ করেছে।

এছাড়া উত্তর-পূর্ব আটলান্টিক মহাসাগরে মে মাসে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও আবহাওয়ার ওপর দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের রেকর্ড-ভাঙা উষ্ণতা ও খরা ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। আর তাই এখনই সাহসী ও কার্যকর জলবায়ু পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।