জাপানের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন সানায়ে তাকাইচি। গতকাল অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে জাপানের শাসক দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) এ নারী প্রার্থী নিম্ন ও উচ্চ—দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছেন। তিনি নিম্নকক্ষে ২৩৭ ও উচ্চকক্ষে পেয়েছেন ১২৫ ভোট।

জাপানের ‘আয়রন লেডি’ হিসেবে পরিচিত তাকাইচি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের ঘনিষ্ঠ অনুসারী এবং তার মতোই দৃঢ় রক্ষণশীল ভাবধারার রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত। তিনি সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারেরও ভক্ত। শেষ মুহূর্তের এক কোয়ালিশন চুক্তির মাধ্যমে তাকাইচিকে পার্লামেন্টে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করা হয়। তিনি অবশ্য গত পাঁচ বছরে জাপানের পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী।

বিশ্লেষকদের মতে, সানায়ে তাকাইচির এ উত্থান নারীবাদের কোনো বিজয় নয়, বরং ৬৪ বছর বয়সী এ নেত্রী চলতি মাসে ক্ষমতাসীন এলডিপির নেতৃত্বে এসেছেন। তিনি নিজেকে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকেন্দ্রিক কঠোর অবস্থানের রাজনীতিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

মুদ্রাস্ফীতি ও সম্প্রতি ঘুস কেলেঙ্কারির কারণে ভোটাররা এলডিপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। অন্যদিকে জনপ্রিয়তা বাড়ছে অভিবাসনবিরোধী দল সানসেইতোর। এ অবস্থায় হারানো সমর্থন পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় তাকাইচি অভিবাসন ও বিদেশী পর্যটন বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন, যা এলডিপির নেতৃত্ব নির্বাচনে বড় বিতর্কের বিষয় ছিল।

সাবেক অর্থনৈতিক নিরাপত্তামন্ত্রী তাকাইচি আগে চীনের সামরিক আগ্রাসন নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন এবং তাইওয়ানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। গত এপ্রিলে তাইপে সফরে তিনি বলেছিলেন, ‘টোকিও ও তাইপের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি।’

সানায়ে তাকাইচি নিয়মিত ইয়াসুকুনি মন্দিরেও যান, যেখানে যুদ্ধাপরাধীদের পাশাপাশি ২৫ লাখ নিহত সৈন্যের স্মৃতি সংরক্ষিত আছে। এ মন্দির এশীয় দেশগুলোর কাছে জাপানের সামরিক অতীতের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে সম্প্রতি তিনি চীনবিষয়ক বক্তব্যে কিছুটা নরম হয়েছেন এবং গত সপ্তাহে মন্দিরের উৎসবে অংশ নেননি।

কলেজ জীবনে হেভি মেটাল ব্যান্ডের ড্রামার ছিলেন তাকাইচি। প্রয়াত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারকে তিনি নিজের রাজনৈতিক অনুপ্রেরণা হিসেবে মনে করেন।

টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সদাফুমি কাওয়াতো বলেন, ‘তাকাইচির নির্বাচিত হওয়া রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে এক ধাপ অগ্রগতি হলেও তিনি পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তেমন আগ্রহী নন। উনিশ শতকের সেই আইন সংশোধনের বিরোধিতা করেন, যা দম্পতিকে একই পদবি ব্যবহার করতে বাধ্য করে। ফলে নারীদের অধিকাংশই স্বামীর পদবি গ্রহণ করেন।’

তাকাইচি একই ব্যক্তিকে দুইবার বিয়ে করেছেন। তার স্বামী দেশটির একজন সাবেক সংসদ সদস্য। প্রথম বিবাহে তিনি স্বামীর পদবি নেন। দ্বিতীয়বার স্বামী তার পদবি গ্রহণ করেন। এ বিষয়ে কাওয়াতো বলেন, ‘দম্পতিকে একই পদবি ব্যবহারের বিষয়টি তার মেয়াদকালে সমাধান হবে বলে মনে হয় না।’ তবে নির্বাচনী প্রচারে তাকাইচি প্রতিশ্রুতি দেন, তার মন্ত্রিসভায় লিঙ্গ ভারসাম্য ‘নরডিক দেশের পর্যায়ে’ উন্নীত করবেন।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ২০২৫ সালের জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট অনুযায়ী, সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে নারীর উপস্থিতি কম থাকায় জাপানের অবস্থান ১৪৮টি দেশের মধ্যে ১১৮তম। বিপরীতে আইসল্যান্ড, ফিনল্যান্ড ও নরওয়ে শীর্ষ তিন স্থানে রয়েছে।

এলডিপির রক্ষণশীল অংশ এবং প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের অনুসারীদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় তাকাইচি। এমনকি তিনি আবের ‘আবেনমিকস’ নীতির অনুসারী, যেখানে আগ্রাসী মুদ্রানীতি শিথিলকরণ ও বড় সরকারি ব্যয়কে প্রাধান্য দেয়া হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এসব নীতি পুনরায় চালু হলে বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

জাপানে বিদেশীদের অর্থনৈতিক প্রভাব ও অপরাধ নিয়ে সম্প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাকাইচি। এ নিয়ে কঠোর নিয়ম প্রবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন, যা বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসনবিরোধী নতুন জাতীয়তাবাদী দলের দিকে চলে যাওয়া ভোটারদের ফেরানোরই কৌশল।