আন্তর্জাতিক বাজারে চপ্পল ঘিরে আলোচনা তুঙ্গে। আলোচনার শুরু ইতালির মিলান ফ্যাশন উইকে। অভিযোগ উঠেছে, সেই আয়োজনের পুরুষদের পোশাক প্রদর্শনীতে প্রাডা যে নতুন চামড়ার স্যান্ডেল প্রদর্শন করেছে, তা দেখতে অবিকল ভারতের কোলাপুরি চপ্পলের মতো। অথচ ব্র্যান্ডটি তাদের বিবরণীতে একে শুধু ‘লেদার স্যান্ডেল’ বলেই উল্লেখ করেছে। কোনো ভারতীয় সংযোগের কথা বলেনি। খবর আল জাজিরা।

এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে গত সপ্তাহে কোলাপুরি চপ্পল নির্মাতাদের একটি প্রতিনিধি দল মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবীশের সঙ্গে দেখা করে অভিযোগ জানায়।

বিজেপির লোকসভার সদস্য ও কোলাপুর জেলার নেতা ধনঞ্জয় মহাডিক এই প্রতিনিধি দলের পাশে দাঁড়ান। তিনি বলেন, চপ্পল নির্মাতারা বোম্বে হাইকোর্টে প্রাডার বিরুদ্ধে মামলা করতে চলেছেন। তিনি ফড়নবীশকে লেখা চিঠিতে বিষয়টিকে মহারাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর আঘাত ও কারিগরদের অধিকারে লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেন। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, প্রাডার চপ্পলগুলোর সম্ভাব্য দাম একজোড়া প্রায় ১ হাজার ৪০০ ডলার। অথচ প্রকৃত কোলাপুরি চপ্পল স্থানীয় বাজারে মাত্র ১২ ডলারে পাওয়া যায়।

এই ঘটনার পর মহারাষ্ট্র চেম্বার অব কমার্স, ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার প্রাডার বোর্ড চেয়ারম্যান প্যাট্রিজিও বার্তেল্লিকেও একটি চিঠি পাঠায়। দুদিন পর এ চিঠির জবাব দেয় প্রাডা।

ফিরতি চিঠিতে প্রাডা জানায়, ‘আমরা ভারতীয় হস্তশিল্পের সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে গভীরভাবে স্বীকৃতি দিই। বর্তমান সংগ্রহ এখনো ডিজাইনের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, এবং কোনো পণ্য এখনো বানানো বা বিক্রির জন্য চূড়ান্ত হয়নি।’ প্রাডা দায়িত্বশীল ডিজাইন চর্চার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আর তাই ভারতীয় হস্তশিল্পী সম্প্রদায়ের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপে আগ্রহের কথাও জানায় প্রতিষ্ঠানটি।

প্রাডা-কোলাপুরী ঘিরে এই আলোচনার প্রেক্ষিতে হায়দরাবাদের ফ্যাশন উদ্যোক্তা শ্রীহিতা ভাঙ্গুরি বলেন, প্রাডার কাজ ‘হতাশাজনক, কিন্তু বিস্ময়কর নয়।’ বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলো দীর্ঘদিন ধরে ঐতিহ্যবাহী কারুকাজ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে কৃতিত্ব না দিয়ে ডিজাইন করছে। আর এটি সাংস্কৃতিক আত্মসাৎ বলে মন্তব্য করেন তিনি। ভাঙ্গুরি বলেন, কোলাপুরি শুধুই একটি ডিজাইন নয়; এটি মহারাষ্ট্র ও কর্ণাটকের কারিগর সম্প্রদায়ের শতাব্দী পুরনো ঐতিহ্য।

কোলাপুর দক্ষিণ-পশ্চিম মহারাষ্ট্রের একটি শহর। রাজকীয় ঐতিহ্য, ধর্মীয় গুরুত্ব ও কারুশিল্পের জন্য বিখ্যাত শহরটি। বিখ্যাত মন্দির, ঝালখাবার ও কোলাপুরি চপ্পল একে বিশেষত্ব এনে দিয়েছে।

এই চপ্পলের ইতিহাস ১২শ শতাব্দী পুরনো। বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার পরিবার এ কারুশিল্পের সঙ্গে জড়িত। তবে কারিগরি দক্ষতা থাকলেও মার্কেটিং ও কাঁচামালের অভাবে পণ্যটির উৎপাদন বেশ কমে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০১৯ সালে দীর্ঘ প্রচারের পর ভারত সরকার কোলাপুরি চপ্পলকে ভৌগোলিক স্বীকৃতি দিয়েছে।

তবে প্রাডার বিরুদ্ধে নকলের অভিযোগ এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০১৮ সালে প্রাডামালিয়া নামে এক সংগ্রহে বর্ণবাদী প্রতীক ব্যবহারের অভিযোগে প্রবল সমালোচনার মুখে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি। সে সময় বাজার থেকে পণ্য তুলে নিতেও বাধ্য হয় প্রাডা। এছাড়াও প্রাণী-ভিত্তিক বিলাসবহুল পণ্য, যেমন উটপাখি বা দুর্লভ চামড়ার ব্যবহার নিয়েও পরিবেশবাদী ও শ্রমিক অধিকার সংগঠনগুলো প্রাডার সমালোচনা করেছে।

তবে শুধু প্রাডাই নয়। ২০১৯ সালে মেক্সিকান ঘোড়সওয়ারীদের পোশাক থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে কোনো স্বীকৃতি না দিয়েই নিজেদের পণ্য বানিয়েছিল ক্রিশ্চিয়ান ডিওর। আর ২০১৫ সালে ফরাসি ডিজাইনার ইসাবেল মারঁ মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী মিক্সে সম্প্রদায়ের নকশা হুবহু অনুকরণ করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন।