পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে কয়েকশ যাত্রী বহন করা একটি ট্রেনে হামলা ও জিম্মির ঘটনা ঘটেছে। হামলার দায় স্বীকার করে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন দ্য বালুচ লিবারেশন আর্মির (বিএলএ) দাবি, তারা ২১৪ জন যাত্রীকে জিম্মি করেছে। যাদের মধ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও আইএসআই সদস্যও রয়েছে। তবে ‘জাফর এক্সপ্রেস’ নামে ট্রেনটির বাকি যাত্রীদের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ ঘটনায় হতাহতের বিষয়ে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ও বেলুচিস্তানের প্রাদেশিক সরকার বিস্তারিত জানায়নি। যদিও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরী জানিয়েছেন, যাত্রীদের একটি অংশকে উদ্ধার করা হয়েছে। আরেকটি অংশকে জিম্মি করেছে সন্ত্রাসীরা। তবে কতজনকে উদ্ধার করা হয়েছে, কতজন জিম্মি সে বিষয়ে কিছু জানাতে পারেননি তিনি। বিএলএ তাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে দাবি করেছে, তারা অন্তত ২০ পাকিস্তানি সেনাসদস্যকে হত্যা করেছে। অন্যদিকে নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে জিও নিউজ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে অভিযানে বিএলএর অন্তত ১৩ সদস্য নিহত হয়েছেন। এছাড়া ৮০ জিম্মিকে উদ্ধার করেছে নিরাপত্তা বাহিনী।

পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যমে রেডিও পাকিস্তান ও পিটিভি নিউজ নিরাপত্তা সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, কোয়েটা থেকে পেশোয়ারগামী জাফর এক্সপ্রেস ট্রেনটিতে ধাদর এলাকার বোলান পাসে হামলা চালায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। এ সময় তারা নারী-শিশুসহ জিম্মি করে। খবরে আরো বলা হয়, নিরাপত্তা বাহিনী ওই এলাকা ঘিরে রেখেছে। সন্ত্রাসীদের নিশ্চিহ্ন না করা পর্যন্ত অভিযান চলবে।

এর আগে বেলুচিস্তান প্রাদেশিক সরকারের মুখপাত্র শহীদ রিন্দ বলেন, ট্রেনটিতে ব্যাপক গোলাগুলি হয়েছে। সিবির সীমান্তবর্তী এলাকার একজন সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পাহাড় ঘেরা একটি টানেলের ঠিক আগে ট্রেনটি আটকে আছে। ট্রেনটি যে এলাকায় আটকে আছে, সেখানে ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক খুবই দুর্বল।

কোয়েটার রেলওয়ে কন্ট্রোলার মুহাম্মদ কাশিফ বিবিসিকে জানিয়েছেন, ট্রেনে ৪০০-৫০০ জন যাত্রীর টিকিট বুক করা ছিল। তবে ঠিক কতজন যাত্রী ভ্রমণ করছিলেন তার সঠিক তথ্য নেই। তিনি বলেন, ‘সশস্ত্র ব্যক্তিরা ট্রেনটি ৮ নম্বর টানেলের কাছে থামিয়েছিল।’ পাকিস্তান আর্মির একটি সূত্র বিবিসিকে জানিয়েছে ওই ট্রেনে শতাধিক সেনাসদস্যও ছিলেন। পাকিস্তানি গণমাধ্যম ডনের খবরে বলা হয়েছে, প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ যাত্রী নিয়ে ‘জাফর এক্সপ্রেস’ নামে ট্রেনটি বেলুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটা থেকে পেশোয়ার যাচ্ছিল।

এদিকে ঘটনার দায় স্বীকার করেছে দ্য বালুচ লিবারেশন আর্মি। সশস্ত্র সংগঠনটি এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, প্রত্যন্ত সিবি জেলায় ট্রেনটিতে হামলা চালানোর আগে রেললাইনে বোমা মেরেছে তারা। ট্রেনটি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বিএলএ বলেছে, নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তাসহ ট্রেনের যাত্রীদের একটি বড় অংশকে তারা জিম্মি করছে। তাদের উদ্ধারের কোনো প্রচেষ্টা নেয়া হলে ‘ভয়াবহ পরিণতি’ হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা। এদিকে বিএলএ সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, তারা অন্তত ১৮০ যাত্রীকে জিম্মি করেছে।

পাকিস্তানের পুলিশ স্থানীয় সাংবাদিকদের জানিয়েছে, হামলায় ট্রেনের চালকসহ তিনজন আহত হওয়ার তথ্য পেয়েছেন তারা। সিবির স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা রানা দালবার রয়টার্সকে বলেছেন, নারী ও শিশুসহ ট্রেনের প্রায় সাড়ে তিনশ যাত্রী নিরাপদে আছেন। কোয়েটার এক স্থানীয় রেলওয়ে কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন, অন্তত ৬০ জন যাত্রীর একটি দল ট্রেন থেকে নেমে নিকটবর্তী পানির রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছেছে। ওই কর্মকর্তা বলেছেন, এ দলটি মূলত বেলুচিস্তানের স্থানীয় বাসিন্দা। আধাসামরিক বাহিনীর সূত্র উদ্ধৃত করে কোয়েটার রেলওয়ে কর্মকর্তারা বিবিসিকে জানিয়েছেন, নারী ও শিশুরা ট্রেন থেকে নেমে সিবি শহরের দিকে হেঁটে যাচ্ছিল। তবে তারা সংখ্যায় কত তা নিশ্চিত করতে পারেনি সংবাদমাধ্যমটি।

বেলুচিস্তান প্রাদেশিক সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সিবি হাসপাতালে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে অ্যাম্বুলেন্স ও অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী পাঠানো হয়েছে। তবে সরকারের মুখপাত্র শহীদ রিন্দ জানান, পাহাড়ি পাথুরে এলাকার কারণে কর্মকর্তাদের ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সমস্যা হচ্ছে। বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য রেলওয়ে বিভাগ ঘটনাস্থলে উদ্ধারকারী ট্রেন পাঠিয়েছে। বিবৃতিতে জনসাধারণকে শান্ত থাকতে এবং গুজবে কান না দিতে অনুরোধ করো হয়েছে।

পেশোয়ারের রেলস্টেশনের ইনচার্জ তারিক মাহমুদ বলেন, ‘জাফর এক্সপ্রেস কোয়েটা থেকে ছেড়ে চারটি প্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চল পেরিয়ে ৩৪ ঘণ্টায় পেশোয়ার পৌঁছায়। পাঞ্জাবের বিভিন্ন অঞ্চলের অধিকাংশ যাত্রী কোয়েটা থেকে ট্রেন ছাড়ার পর এতে ওঠেন।’ এদিকে কোয়েটার সিভিল হাসপাতালে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। কোয়েটা স্বাস্থ্য বিভাগের মুখপাত্র ডা. ওয়াসিম বেগ জানান, সমস্ত বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট, স্টাফ নার্স এবং প্যারামেডিকেল কর্মীদের হাসপাতালে ডাকা হয়েছে।

পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভি এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, ‘নিরীহ যাত্রীদের ওপর গুলি চালানো পশুদের কোনো ছাড় দেয়া হবে না।’ তিনি গুলিবিদ্ধ আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন।

প্রসঙ্গত, বেলুচিস্তানে কয়েক দশক ধরে যে বিদ্রোহ চলছে, তাতে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী খনিজ সম্পদে ভরপুর ওই অঞ্চলে নিয়মিতই সরকার, সেনাবাহিনী ও চীনা স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা চালিয়ে আসছে। কেন্দ্রীয় সরকার বেলুচিস্তানের গ্যাস ও খনিজ সম্পদে অন্যায্য শোষণ চালাচ্ছে দাবি করা বিএলএর আকাঙ্ক্ষা স্বাধীন বেলুচিস্তান। দশকের পর দশক ধরে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ওই অঞ্চলে যারা লড়াই করছে, তাদের মধ্যে বিএলএই সবচেয়ে বড় সশস্ত্র সংগঠন।