সম্প্রতি মিশরের উত্তর উপকূলে বহু বছর আগে ভূমধ্যসাগরের নিচে হারিয়ে যাওয়া বন্দর আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রাচীন এ বন্দরের বিশাল ধ্বংসাবশেষটি পাওয়া গিয়েছে ‘টাপোসিরিস ম্যাগনা’ নামের এক প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের কাছে। এটির অবস্থান আলেকজান্দ্রিয়া থেকে প্রায় ৩০ মাইল পশ্চিমে।
ডমিনিকান প্রত্নতত্ত্ববিদ ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের এক্সপ্লোরার ক্যাথলিন মার্টিনেজ এবং টাইটানিক আবিষ্কারের জন্য বিখ্যাত বব ব্যালার্ড যৌথভাবে এ ডুবে যাওয়া বন্দরের সন্ধান পেয়েছেন। মার্টিনেজ মনে করেন, এটি ক্লিওপেট্রার সময়ে একটি সক্রিয় বন্দর ছিল। যদি তাই হয় তাহলে এটি ইতিহাসের অন্যতম রহস্য—মিশরের শেষ রানি ‘ক্লিওপেট্রার সমাধিস্থল’ উন্মোচনের পথে এটি এক বড় পদক্ষেপ।
ভূমধ্যসাগরের নিচে প্রায় ৪০ ফুট গভীরে অবস্থিত এ প্রাচীন বন্দরে রয়েছে ৬ মিটার উঁচু পাথরের ভবনে পলিশ করা পাথরের মেঝে। এছাড়াও বিশাল স্তম্ভ, সিমেন্ট ব্লক, প্লুটার্ক যুগের অ্যাম্ফোরা (প্রাচীন পাত্র), এবং বহু নোঙর পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে এটি শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, বরং একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল, যা স্থলপথ ও লেক মারেউতিসের মাধ্যমে আলেকজান্দ্রিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। মার্টিনেজ বলেন, ‘এটি এমন একটি জায়গা হতে পারে যেখানে ক্লিওপেট্রা ও অ্যান্টনি একসাথে সমাধিস্থ হয়েছেন।’
মার্টিনেজ বলেন, ‘আমরা এমন একটি জায়গায় ২ হাজার ৬০০টিরও বেশি বস্তু আবিষ্কার করেছি, যেখানে সবাই ভেবেছিল কিছুই নেই। আমরা ইতিহাস বদলে দিয়েছি।’
অন্যদিকে বব ব্যালার্ড-এর নেতৃত্বে ডুবুরিরা ২০ ফুট উঁচু পাথরের কাঠামো, নোঙর, এবং ‘সালাম-০৫’ নামে একটি বিশাল পাথরের ভিত্তি আবিষ্কার করেন, যা ভাঙা মূর্তির পাদদেশের মতো দেখতে।
প্রাচীন মিশর বিষয়ক অধিকাংশ গবেষক মনে করেন ক্লিওপেট্রা আলেকজান্দ্রিয়ায় সমাধিস্থ হন। কিন্তু মার্টিনেজ মনে করেন, টাপোসিরিস ম্যাগনায়ই তার সমাধি রয়েছে। এর আগে ২০২২ সালে তার দল ৪,হাজার ৩০০ ফুট দীর্ঘ সমুদ্র বরাবর চলে যাওয়া একটি সুড়ঙ্গের সন্ধান পায়। সেখানে ক্লিওপেট্রার সময়কার সিরামিক ও পাত্র পাওয়া গিয়েছিল। নতুন আবিষ্কৃত বন্দরের অবস্থান এই সুড়ঙ্গের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত, যা ইঙ্গিত দেয় এটি সম্ভবত রানির শেষ যাত্রার সমন্বিত নেটওয়ার্কের একটি অংশ ছিল।
৩৬৫ খ্রিস্টাব্দে ভূমিকম্প ও সুনামির ফলে আলেকজান্দ্রিয়ার রাজপ্রাসাদ এলাকা এবং টাপোসিরিস ম্যাগনার অংশগুলো পানিতে ডুবে যায়। মার্টিনেজ মনে করেন, ক্লিওপেট্রা রোমানদের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে গোপনে এমন একটি প্রতীকী ও নিরাপদ স্থানে সমাধি তৈরি করেছিলেন। মন্দিরে ক্লিওপেট্রার মুখমণ্ডলযুক্ত মুদ্রা, সোনার পাতযুক্ত মমি, এবং পাত্র পাওয়া গেছে।
৬৯ খ্রিস্টপূর্বে জন্ম নেওয়া ক্লিওপেট্রা ১৮ বছর বয়সে সিংহাসনে বসেন। তিনি ছিলেন টলেমিক যুগের শেষ রানি। রোমানদের দৃষ্টিভঙ্গিতে তিনি ছিলেন ‘বিপজ্জনক ও প্রলোভন সৃষ্টিকারী’ নারী। ক্লিওপেট্রা ও অ্যান্টনির সম্পর্ক ছিল রাজনৈতিক ও আবেগপূর্ণ। যুদ্ধে পরাজয়ের পর অ্যান্টনি আত্মহত্যা করেন। কথিত আছে, ক্লিওপেট্রা নিজেও ৩৯ বছর বয়সে সাপের বিষ ব্যবহার করে আত্মহত্যা করেন।
প্লুটার্ক (প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক) লিখেছেন যে তারা একসঙ্গে সমাধিস্থ হন। কিন্তু আলেকজান্দ্রিয়ায় তাদের সমাধির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মার্টিনেজ মনে করেন, ক্লিওপেট্রা নিজেকে রোমানদের হাত থেকে রক্ষা করতে টাপোসিরিস ম্যাগনায় গোপনে সমাধি তৈরি করেছিলেন।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের ‘ক্লিওপেট্রা’স ফাইনাল সিক্রেট’ শীর্ষক ডকুমেন্টারিতে নতুন এ আবিষ্কার তুলে ধরা হবে। চ্যানেলটিতে ২৫ সেপ্টেম্বর এটি প্রচারিত হওয়ার কথা রয়েছে।










