অর্থনীতিতে নোবেলজয়ীর নাম ঘোষণার মধ্য দিয়ে আজ ১৩ অক্টোবর শেষ হল এবছরের নবেলবিজয়ীদের নাম ঘোষণা। চিকিৎসা, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, সাহিত্য, অর্থনীতি ও শান্তি—এই ছয়টি শাখায় ২০২৫ সালে নোবেল পুরস্কার জিতেছেন মোট ১৪ জন। চলুন জেনে নিই কে কোন বিভাগে এবছর পেল বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ এই নোবেল পুরস্কার।

অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ীরা

এ বছর অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেলেন তিনজন। তারা হলেন- যুক্তরাষ্ট্রের জোয়েল মোকিয়ার, ফ্রান্সের ফিলিপ আগিয়ো এবং কানাডীয় বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের পিটার হাউইট। সোমবার বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটের দিকে তাদের নাম ঘোষণা করে রয়েল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস। উদ্ভাবননির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাখ্যা করার জন্য তাদের নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।

প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মাধ্যমে টেকসই প্রবৃদ্ধির পূর্বশর্তগুলো চিহ্নিত করার জন্য পুরস্কারের অর্ধেক পেয়েছেন জোয়েল মোকিয়র। আর সৃজনশীল বিনাশের মাধ্যমে টেকসই প্রবৃদ্ধির তত্ত্ব প্রণয়নের জন্য বাকি অর্ধেক যৌথভাবে পেয়েছেন ফিলিপ আগিয়ো ও পিটার হাউইট।

১৯৯২ সালের এক প্রবন্ধে তারা গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেন, যখন নতুন ও উন্নত কোনো পণ্য বাজারে আসে, তখন পুরোনো পণ্য বিক্রি করা প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে টিকে থাকতে পারে না। এই প্রক্রিয়াই অর্থনীতিতে ‘সৃজনশীল বিনাশ’ নামে পরিচিত।

জোয়েল মোকিয়ার যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক, ফিলিপ আগিয়ো ফ্রান্সের কলেজ দ্য ফ্রান্স ও ইনসিয়াডের অধ্যাপক এবং পিটার হাউইট যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক।

শান্তিতে নোবেল বিজয়ী

নোবেল পুরষ্কারের ৬ টি বিভাগের মধ্যে বিশ্বব্যাপী আলোচিত ও আগ্রহের জায়গা শান্তিতে নোবেল। বিশ্ব জানতে উদগ্রীব থাকে এইবার শান্তিতে নোবেল কে পাচ্ছেন? ১০ অক্টোবর ঘোষণা করা হয়ে সেই বহুল প্রতিক্ষীত নাম।

এবছর শান্তিতে নোবেল জিতেছেন গণতন্ত্র আন্দোলনের নেতা ভেনেজুয়েলার মারিয়া কোরিনা মাচাদো। এক বছর ধরে আত্মগোপনে থাকা মাচাদো দেশের মধ্যে থাকলেও তার জীবন ছিল গুরুতর হুমকির মুখে। তবু তিনি বিরোধী দলগুলোর মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করেছেন এবং সামরিকীকরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছেন। শান্তিপূর্ণভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তাঁর অটল প্রতিশ্রুতি লাখ মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে।

৫৮ বছর বয়সী মাচাদো শুধু রাজনীতিক নন, একজন শিল্প প্রকৌশলীও। তিনি ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিকোলা মাদুরোর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি।

নোবেল কমিটির ভাষ্য: ‘অন্ধকারের মধ্যে গণতন্ত্রের আলো জ্বালিয়ে রাখার অসাধারণ সাহস ও প্রতিশ্রুতির জন্য মাচাদোর এই পুরস্কার।‘

দুই দশক আগে গণতন্ত্রপন্থী সংগঠন ‘সুমাতে’ প্রতিষ্ঠা করে তিনি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আন্দোলন শুরু করেছিলেন। তার মূলমন্ত্র— ‘গোলাগুলির বদলে ব্যালটবক্সই লড়াইয়ের পথ। এরপর থেকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও জনগণের প্রতিনিধিত্বের দাবিতে তিনি নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন।

সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী

সাহিত্যে এ বছর নোবেলে পেয়েছেন হাঙ্গেরির লেখক লাসলো ক্রাসনাহোরকাই। ৯ অক্টোবর রয়েল সুইডিশ একাডেমি তার নাম ঘোষণা করে। নোবেল কমিটি জানিয়েছে, ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতেও শিল্পের শক্তি দেখানো তার প্রভাবশালী ও দূরদর্শী সাহিত্যকর্মের জন্য এ বছর তিনি সাহিত্যে নোবেল পেলেন।

লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের জন্ম ১৯৫৪ সালে, হাঙ্গেরির গিউলা শহরে। ১৯৮৫ সালে সাহিত্যজগতে তার অভিষেক প্রথম উপন্যাস সাতানত্যাঙ্গো প্রকাশের মাধ্যমে। উপন্যাসটিতে একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত গ্রামীণ সমাজের বিষণ্ণ চিত্র তুলে ধরেছিলেন তিনি। ক্রাসনাহোরকাই পাঁচটি উপন্যাস, অনেক ছোটগল্প ও প্রবন্ধ লিখেছেন। 'দ্য প্রিজনার অব উর্গা', 'ডিসট্রাকশন অ্যান্ড সরো বিনিথ দ্য হেভেনস', 'ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার', দ্য মেলানকোলি অব রেজিস্ট্যান্স’, ‘দ্য ভার্কমেইস্টার হারমোনিজ’ অন্যতম। ক্রাসনাহোরকাইয়ের বেশ কয়েকটি উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে।

সাহিত্য সমালোচকরা তাকে একজন পোস্ট-মর্ডান লেখক হিসেবে আখ্যায়িত করেন। দীর্ঘ ও জটিল বাক্যে তার লেখায় ডিস্টোপিয়ান ও বিষণ্ণতা প্রাধান্য পায়। তার লেখার স্বতন্ত্র ধরণের কারণেই তাকে গোগোল, মেলভিল ও কাফকার সঙ্গে তুলনা করে থাকেন সাহিত্য সমালোচকরা।

৭১ বছর বয়সী ক্রাসনাহোরকাই ১৯৯৩ সালে জার্মান বেস্টেনলিস্টে পুরস্কার, ২০১৫ সালে ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল পুরস্কার এবং ২০১৯ সালে ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড ফর ট্রান্সলেটেড লিটারেচার পেয়েছেন।

রসায়নে নোবেল বিজয়ীরা

৮ অক্টোবর সুইডেনের স্টকহোম থেকে রসায়নে নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করেছে দ্য রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস। এবছর পুরস্কার পেয়েছেন তিন বিজ্ঞানী— সুসুমু কিতাগাওয়া, রিচার্ড রবসন এবং ওমর এম. ইয়াগি—ধাতব জৈব কাঠামো বা মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্ক বিকাশের জন্য।

১৯৮৯ সালে রবসন প্রথমবার হীরকের মতো স্ফটিক কাঠামো তৈরি করেন, তবে তা ছিল অস্থিতিশীল। পরবর্তী সময়ে কিতাগাওয়া ও ইয়াগি ১৯৯২–২০০৩ সালের মধ্যে একাধিক আবিষ্কারে এটি স্থিতিশীল করেন। নোবেল কমিটি মন্তব্য করেছে, এমওএফ-এর বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে কাস্টম-মেড উপকরণ এবং নতুন কার্যকারিতা তৈরি করার ক্ষেত্রে।

সুসুমু কিতাগাওয়ার জন্ম ১৯৫১ সালে জাপানের কিয়োটোয়। বর্তমানে তিনি কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক। রিচার্ড রবসনের জন্ম ১৯৩৭ সালে যুক্তরাজ্যের গ্লাসবার্নে। বর্তমানে মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক। ওমর এম. ইয়াগির জন্ম ১৯৬৫ সালে জর্ডানের আম্মানে। তিনি বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক।

পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ীরা

এবছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছেন তিন মার্কিন বিজ্ঞানী। তারা হলেন জন ক্লার্ক, মিশেল এইচ দেভোরে এবং জন এম মার্টিনিস। বৈদ্যুতিক সার্কিটে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের টানেলিং ও শক্তির কোয়ান্টাইজেশন প্রমাণ করায় তারা নোবেল পেয়েছেন। ৭ অক্টোবর সুইডেনের স্টকহোম থেকে এ বছরের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করে দ্য রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস।

জন ক্লার্ক, ১৯৪২ সালে যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে অধ্যাপনা করছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। মিশেল দেভোরে ১৯৫৩ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। এবং জন এম মার্টিনিসের জন্ম ১৯৫৮ সালে। তিনি ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে রয়েছেন।

১৯৮৪ ও ১৯৮৫ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এই তিন সহকর্মী সুপারকন্ডাক্টর দিয়ে তৈরি একটি বৈদ্যুতিক সার্কিটে একাধিক পরীক্ষা চালান। সার্কিটে দুটি সুপারকন্ডাক্টরকে পৃথক করেছিল একটি পাতলা অপরিবাহী স্তর, যা ‘জোসেফসন জাংশন’ নামে পরিচিত। এ সার্কিটে প্রবাহিত ইলেকট্রনগুলোর সম্মিলিত আচরণ ছিল এমন, যেন পুরো সিস্টেমটি একটিমাত্র কণার মতো কাজ করছে।

এই গবেষণা ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম কম্পিউটার, কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি এবং সেন্সর প্রযুক্তি উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞান ও শারীরতত্ত্বে নোবেল বিজয়ীরা

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে গবেষণায় এবছর নোবেল পেয়েছেন তিন বিজ্ঞানী। মেরি ই ব্রাঙ্কো, ফ্রেড রামসডেল ও শিমন সাকাগুচি। সুইডেনের স্টকহোম থেকে ৬ অক্টোবর এ বছরের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করে ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট।

পেরিফেরাল ইমিউন টলারেন্স অর্থাৎ শরীরের রোগ প্রতিরোধক কোষ জীবাণুকে আক্রমণ করতে গিয়ে যেন নিজের টিস্যু বা অঙ্গকে আক্রমণ না করে, সেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণার জন্য তাদের এ পুরস্কার দেয়া হয়েছে।

শিমন সাকাগুচির গবেষণা প্রথমবারের মতো রেগুলেটরি টি-সেলের ভূমিকা ব্যাখ্যা করে, যা শরীরের ইমিউন প্রতিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। পরবর্তীকালে মেরি ই ব্রাঙ্কো ও ফ্রেড রামসডেল এ সেলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফক্সপিথ্রি জিন চিহ্নিত করেন, যা ইমিউন সিস্টেমের ভারসাম্য রক্ষায় মুখ্য ভূমিকা রাখে।

এবারের নোবেলজয়ী মেরি ই ব্রাঙ্কো যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলের ইনস্টিটিউট ফর সিস্টেমস বায়োলজির সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার। ফ্রেড রামসডেল সান ফ্রান্সিসকোর সোনোমা বায়োথেরাপিউটিকসের বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা ও শিমন সাকাগুচি জাপানের ওসাকা ইউনিভার্সিটির ইমিউনোলজি ফ্রন্টিয়ার রিসার্চ সেন্টারের অধ্যাপক।

প্রতিটি বিভাগে পুরস্কার হিসেবে রয়েছে ১ কোটি ১০ লাখ সুইডিশ ক্রোনর, যা প্রায় ১২ লাখ ডলার বা প্রায় ১৪ কোটি বাংলাদেশি টাকা। সঙ্গে একটি ১৮ ক্যারেটের সোনার পদক আর একটি সম্মাননাপত্র। ১০ ডিসেম্বর, আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে অনুষ্ঠিত হবে পুরস্কার প্রদান।