ভারতের আহমেদাবাদে ২৪২ আরোহী নিয়ে আবাসিক ভবনের ওপর বিধ্বস্ত হয়েছে ভারতের সরকারি আকাশ পরিবহন সংস্থা এয়ার ইন্ডিয়ার একটি উড়োজাহাজ। বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার মডেলের উড়োজাহাজটি গতকাল দুপুরে উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই বিধ্বস্ত হয়। এতে উড়োজাহাজের ২৪১ আরোহী নিহত হয়েছেন। এক যাত্রীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। উড়োজাহাজটি হায়দরাবাদের আবাসিক এলাকার একটি মেডিকেল কলেজের হোস্টেলের ওপর বিধ্বস্ত হয়। এতে সেখানে অবস্থানরত ৫ জনসহ মোট নিহতের সংখ্যা ২৪৬ ছাড়িয়েছে বলে রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে। যদিও এর আগে শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তার বরাতে রয়টার্স জানিয়েছিল নিহতের সংখ্যা ২৯৪ জন ছাড়িয়ে গেছে।

তেলেঙ্গানা রাজ্যের শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা বিধি চৌধুরী রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা এখনো মৃতের সংখ্যা নিশ্চিত করছি। এর মধ্যে কয়েকজন শিক্ষার্থীও রয়েছেন। বিমানটি যে ভবনে বিধ্বস্ত হয়েছে, সেখানে তারা অবস্থান করছিলেন। অধিকাংশ মৃতদেহ চেনার কোনো উপায় নেই। হতাহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।’

তিনি আরো জানান, পুলিশ এক জীবিত ব্যক্তিকে উদ্ধার করেছে—তিনি জরুরি নির্গমনের পাশে ১১এ নম্বর আসনে ছিলেন। উড়োজাহাজ নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি সম্ভবত বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার মডেলের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা। এ মডেলটি ২০১১ সাল থেকে চালু হলেও এত বড় দুর্ঘটনা আগে ঘটেনি।

মে ডে সংকেত পাঠানোর পর বিধ্বস্ত: এয়ার ইন্ডিয়ার ওই উড়োজাহাজটি গতকাল স্থানীয় সময় বেলা দেড়টার দিকে আহমেদাবাদের সরদার বল্লভভাই প্যাটেল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে যায়। এটি যুক্তরাজ্যের লন্ডনের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। উড্ডয়নের প্রায় ১ মিনিটের মধ্যেই পাইলটরা ‘মে ডে’ সংকেত পাঠান। এরপর উড়োজাহাজটি রাডার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মাত্র ৬২৫ ফুট উচ্চতায় পৌঁছে শহরের মেঘানিনগর এলাকায় একটি আবাসিক ভবনে বিধ্বস্ত হয়। ঘটনাস্থলের বেশকিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে দেখা গেছে, উড্ডয়নের পর কিছুদূর উঠেছিল উড়োজাহাজটি। এরপর আর পারেনি। ক্রমেই সেটি নামতে শুরু করে। তার পরমুহূর্তেই উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয়। এয়ার ইন্ডিয়ার দুর্ঘটনাগ্রস্ত উড়োজাহাজটিতে ছিলেন গুজরাটের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বিজয় রূপাণী। তিনিও মারা গেছেন।

Untitled-1

কোন দেশের কতজন: ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং গুজরাট রাজ্য সরকারের তথ্য অনুসারে, উড়োজাহাজটিতে মোট ২৪২ জন ছিলেন। এর মধ্যে ২৩০ জন যাত্রী ও ১২ জন কেবিন ক্রু। আরোহীদের মধ্যে ১৬৯ জন ভারতীয়, ৫৩ জন ব্রিটিশ নাগরিক, সাতজন পর্তুগিজ এবং একজন কানাডীয় ছিলেন। ভারতের বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রী রামমোহন নাইডু গতকাল বিকালে জানান, আরোহীদের মধ্যে কেউ বেঁচে নেই।

অলৌকিক বেঁচে যাওয়া: বিধ্বস্ত উড়োজাহাজের যে যাত্রী বেঁচে গেছেন তার নাম বিশ্বাস কুমার রমেশ। যুক্তরাজ্যের নাগরিক ওই ব্যক্তিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বাস কুমার রমেশ ও তার ভাই অজয় কুমার রমেশ (৪৫) একই ফ্লাইটে যুক্তরাজ্যে যাচ্ছিলেন। বিশ্বাস কুমারের আসন নম্বর ছিল ‘১১ এ’। বিশ্বাস কুমার বলেন, উড়োজাহাজটি বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের মাত্র ৩০ সেকেন্ড পরই বিকট শব্দ হয়, এরপরই বিধ্বস্ত হয়। যখন উঠে দাঁড়ালাম, চারপাশে শুধু লাশ পড়ে ছিল। আমি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি; উঠে দাঁড়িয়ে দৌড় দিই। আমার চারপাশে উড়োজাহাজের ভাঙা টুকরো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। কেউ একজন আমাকে ধরে অ্যাম্বুলেন্সে তোলেন এবং হাসপাতালে নিয়ে আসেন।’

ডাইনিংয়ে আছড়ে পড়ে উড়োজাহাজ: উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয় আহমেদাবাদের বিখ্যাত বি জে মেডিকেল কলেজের একটি হোস্টেলের ওপর। এটি একটি পুরনো আবাসিক ভবন, যেখানে প্রায় ১৫০ জন মেডিকেল শিক্ষার্থী ও তরুণ চিকিৎসক থাকতেন। বিধ্বস্ত হওয়ার সময় উড়োজাহাজটি ভবনের ডাইনিং এরিয়া ও ছাদ বরাবর ধাক্কা দেয়। এতে ডাইনিংয়ে থাকা কয়েকজনের মৃত্যু হয়। তারা সেখানে দুপুরের খাবার খেতে জড়ো হয়েছিলেন। এছাড়া বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন। ভবনটির একাধিক তলা ধসে পড়ে। চারপাশে আগুন ও ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের সদস্যরাও চরম বিপাকে পড়েন। বিধ্বস্তের পরপরই ভারতের ফায়ার সার্ভিস, জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বাহিনী (এনডিআরএফ) এবং বেসামরিক প্রশাসনের উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। ঘটনাস্থলের কাছাকাছি বসবাসকারী অনেক সাধারণ মানুষও উদ্ধারকাজে অংশ নেন। পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। আশপাশের বাসিন্দাদের সরিয়ে নেয়া হয় নিরাপদ স্থানে।

ঘটনাস্থল থেকে এক প্রত্যক্ষদর্শী এনডিটিভিকে বলেন, ‘আমি বাড়িতে ছিলাম। আচমকা প্রচণ্ড একটা শব্দ শুনলাম। মনে হলো যেন ভূমিকম্প হচ্ছে। কী হয়েছে, দেখতে যখন বাইরে বেরোলাম, ততক্ষণে কালো ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে চারপাশ। মোটা কালো ধোঁয়া। আমরা ঘটনাস্থলে ছুটে চলে আসি। দেখি চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ। ধ্বংসস্তূপ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।’

কেন এই দুর্ঘটনা: প্রাথমিকভাবে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে ‘বার্ড হিট’ বা পাখির আঘাতের আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। এয়ার ইন্ডিয়ার সাবেক সিনিয়র পাইলট ক্যাপ্টেন সৌরভ ভাটনগর এনডিটিভিকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে এটি একাধিক বার্ড হিটের ঘটনা, যার ফলে দুই ইঞ্জিনই শক্তি হারিয়েছে। টেকঅফটি ছিল স্বাভাবিক, কিন্তু মনে হচ্ছে গিয়ার তোলার আগেই উড়োজাহাজটি হঠাৎ করে নিচে নামতে শুরু করে। এমনটা সাধারণত ইঞ্জিনের শক্তি হারালে বা উড়োজাহাজের লিফট উৎপাদন বন্ধ হলে ঘটে থাকে। তদন্তে বিস্তারিত কারণ জানা যাবে।’ তবে এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেন সাবেক পাইলট এহসান খালিদ। তার মতে, উড়োজাহাজটি সম্ভবত শক্তি হারানোর মুখে পড়ে, যা ইঞ্জিনের ত্রুটির কারণে ঘটতে পারে। একসঙ্গে দুটি ইঞ্জিনের ব্যর্থতা—বিশেষ করে ১ মিনিটের মধ্যে বার্ড স্ট্রাইকের কারণে—অত্যন্ত অস্বাভাবিক। এ ধরনের শক্তি হারানো ইঞ্জিন ত্রুটির কারণে হতে পারে। তবে একসঙ্গে দুই ইঞ্জিনই কাজ করা বন্ধ করে দেবে, তা খুবই অসম্ভব। বিমান দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে ফ্লাইট ডাটা রেকর্ডার, ককপিট ভয়েস রেকর্ডার এবং একারস ডাটার গুরুত্বের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ‘চিত্রে দেখা যাচ্ছে বিমানটি উড়ন্ত অবস্থায় নিচে নেমে গেছে। এর মানে মাঝ আকাশে কোনো বিস্ফোরণ ঘটেনি।’

ব্ল্যাকবক্স উদ্ধার: ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উদ্ধারকর্মীরা উড়োজাহাজের ব্ল্যাকবক্স—ফ্লাইট ডাটা রেকর্ডার ও ককপিট ভয়েস রেকর্ডার উদ্ধার করেন। ব্ল্যাকবক্স বিশ্লেষণের জন্য তা ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ও এয়ার ইন্ডিয়ার বিশেষজ্ঞদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কয়েক দিনের মধ্যেই প্রাথমিক তথ্য প্রকাশ করা হবে।

শোক ও সমবেদনা: উড়োজাহাজ বিধ্বস্তের এ ঘটনায় বিশ্বজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘এ দুর্ঘটনা হৃদয়বিদারক। নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। কেন্দ্রীয় সরকার উদ্ধার ও তদন্তে সর্বোচ্চ সহায়তা দেবে।’ যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এ মর্মান্তিক ঘটনায় আমরা গভীরভাবে শোকাহত। নিহতদের পরিবারের প্রতি আমাদের সহানুভূতি রইল।’ ব্রিটিশ রাজা চার্লস তৃতীয় ও রানি ক্যামিলাও নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসও। তিনি বলেন, ‘এ অপ্রত্যাশিত ঘটনায় আমরা গভীরভাবে মর্মাহত। প্রয়োজনে বাংলাদেশ সহযোগিতার হাত বাড়াবে।’

এছাড়া রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ, ইউরোপিয়ান কমিশনের সভাপতি উরসুলা ভন ডার লিয়েন, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবেনিস, আইরিশ প্রধানমন্ত্রী মাইক্যাল মার্টিন, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি, মালদ্বীপ, শ্রীলংকা, নেপাল ও সিঙ্গাপুরের রাষ্ট্রপ্রধানরাও শোকবার্তা পাঠিয়েছেন।

এয়ার ইন্ডিয়ার ইতিহাসের বড় বিপর্যয়: এয়ার ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ দুর্ঘটনা কোম্পানির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। সংস্থার সিইও ক্যাম্পবেল উইলসন বলেন, ‘এটা সত্যি আমাদের জন্য সবচেয়ে কঠিন দিন। আমরা দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানার জন্য সর্বাত্মক সহায়তা করছি। যাত্রীদের পরিবারকে আমরা প্রতিটি পর্যায়ে সহযোগিতা করব।’

উড়োজাহাজ নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি সম্ভবত বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার মডেলের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা। এ মডেলটি ২০১১ সাল থেকে চালু হলেও এত বড় দুর্ঘটনা আগে ঘটেনি। উড়োজাহাজটির মূল বৈশিষ্ট্য ছিল দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ার সক্ষমতা, জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহার এবং উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। তবে এ দুর্ঘটনার পর মডেলটি নিয়ে আবারো প্রশ্ন উঠেছে।