আর্কটিক অঞ্চলের শান্ত ও বরফে ঢাকা বিশাল দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড এখন বৈশ্বিক রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ডেনমার্কের আধা স্বায়ত্তশাসিত এ অঞ্চলকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ স্থানীয় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ, ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে দাবি করে একে নিয়ন্ত্রণে নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করার পর বিষয়টি নতুন করে আবারো আন্তর্জাতিক আলোচনায় উঠে এসেছে। খবর বিবিসি।

এ পরিস্থিতিতে আগামী সপ্তাহে ডেনমার্কের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। বৈঠকে গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ, নিরাপত্তা ও সহযোগিতার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। যদিও গ্রিনল্যান্ডের নিজস্ব সরকার ও সংসদ রয়েছে, তবু প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি এখনো ডেনমার্কের হাতে। অনেক গ্রিনল্যান্ডবাসীর অভিযোগ, তাদের ভবিষ্যতের ব্যাপারে তাদের মতামত না নিয়েই বড় শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে।

গ্রিনল্যান্ড বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বীপ। এটি আর্কটিক ও আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝামাঝি অবস্থিত। আয়তনে যুক্তরাজ্যের চেয়ে প্রায় নয় গুণ হলেও এখানে বসবাস করে মাত্র ৫৭ হাজার মানুষ। তাদের বেশির ভাগই আদিবাসী ইনুইট সম্প্রদায়ের। রাজধানী নুক শহরে এখনো জীবনযাপন স্বাভাবিকভাবে চললেও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে সেখানকার মানুষের মধ্যে রয়েছে এক ধরনের চাপা উৎকণ্ঠা, ভয় আর অনিশ্চয়তা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা করছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, ডেনমার্কের সঙ্গে ঔপনিবেশিক সম্পর্কের স্মৃতি এখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি, তার ওপর আবার নতুন করে বিদেশী শক্তির আগ্রহ তাদের শান্ত জীবনযাপনকে ব্যাহত করছে। এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৮৫ শতাংশ গ্রিনল্যান্ডবাসী যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে চায় না। তবে একই সঙ্গে অনেকেই ডেনমার্কের কাছ থেকে ভবিষ্যতে পূর্ণ স্বাধীনতা পাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। যদিও ডেনমার্কের আর্থিক সহায়তার ওপর এখনো অঞ্চলটি অনেকাংশেই নির্ভরশীল।

গ্রিনল্যান্ডের রাজনৈতিক নেতারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বিষয়ে তাদের কণ্ঠ আরো জোরালো হওয়া দরকার। দেশটির সংসদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির সহসভাপতি পিপালুক লিনগে-রাসমুসেন বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্ব বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে হবে।’ তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য, খনিজ সম্পদ উত্তোলন কিংবা সামরিক সহযোগিতা হতে পারে, তবে তা অবশ্যই গ্রিনল্যান্ডবাসীর সম্মতি, স্বার্থ ও সমতার ভিত্তিতে হতে হবে।

১৯৫১ সালের একটি চুক্তির আওতায় গ্রিনল্যান্ডে আগে থেকেই একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। শীতল যুদ্ধের সময় সেখানে প্রায় ১০ হাজার মার্কিন সেনা থাকলেও বর্তমানে সংখ্যা কমে প্রায় ২০০ জনে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, রাশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ গ্রিনল্যান্ডের ওপর দিয়ে যাওয়ায় অঞ্চলটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে আর্কটিক অঞ্চলে চীন ও রাশিয়া সামরিক ও বাণিজ্যিক তৎপরতা বাড়াচ্ছে। বরফ গলার কারণে নতুন নৌপথ তৈরি হওয়ায় এ অঞ্চলের গুরুত্ব আরো বেড়েছে। এতে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর উদ্বেগ বাড়ায় আর্কটিক অঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করতে চাইছে তারা।

সব মিলিয়ে গ্রিনল্যান্ড, ডেনমার্ক ও তাদের মিত্ররা আশা করছে, কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। তবে বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতার মাঝে গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিতই রয়ে গেছে।