নির্বাচন হিমালয়ঘেরা দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নেপালজুড়ে ব্যাপক হারে জেঁকে বসা দুর্নীতির রাশ টানা ও বেকারত্ব নিরসনের বিষয়গুলো এবারের নির্বাচনে বড় প্রভাবক হতে পারে। সেই সঙ্গে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে।

এবারের নির্বাচনে দীর্ঘদিন ধরে নেপালের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর পাশাপাশি নতুন শক্তির উত্থানও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দেশটির কেন্দ্রপন্থী নেপালি কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফায়েড মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট) বহু বছর ধরে নেপালের রাজনীতিতে প্রভাবশালী। তবে গত বছরের আন্দোলনের সময় এ দলগুলো ক্ষমতায় থাকায় তাদের বিরুদ্ধে জন-অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রতি হতাশা প্রকাশ করেছে।

এ প্রেক্ষাপটে নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বালেন্দ্র শাহ, যিনি বালেন শাহ নামে পরিচিত। একসময় সংগীতজগতের সঙ্গে যুক্ত থাকা বালেন শাহ পরে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং ২০২২ সালে গঠিত ন্যাশনাল ইনডিপেনডেন্ট পার্টির নেতৃত্ব দেন। অনেক পর্যবেক্ষক তাকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা দ্রুত বেড়েছে।

র‍্যাপার থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া বালেন শাহ ভোটের মাঠে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওলির মুখোমুখি হচ্ছেন। ঝাপা-৫ আসনে লড়বেন তারা। এ আসন ওলির দীর্ঘদিনের নিরাপদ দুর্গ হিসেবে পরিচিত। বালেন শাহ এবারের নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির (আরএসপি) হয়ে লড়ছেন। ২০২২ সালের সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আরএসপি চতুর্থ অবস্থানে ছিল। বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, এবারের নির্বাচনে দলটি আরো ভালো করতে পারে। দলটির পক্ষ থেকে বালেন শাহকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

এবারের সাধারণ নির্বাচনে আরেক শক্তিশালী প্রতিপক্ষ নেপালি কংগ্রেস। দলটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবার পরিবর্তে ৪৯ বছর বয়সী গগন থাপাকে নেতা নির্বাচিত করেছে। কাজেই গগন থাপা আরেকজন প্রভাবশালী প্রার্থী।

ভোটের লড়াইয়ে থাকা অন্য প্রধান পক্ষগুলোর মধ্যে রয়েছে কে পি শর্মা ওলির দল নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি (ইউএমএল)। দলটি সর্বশেষ নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসনে জয় পেয়েছিল। এছাড়া মাওবাদী নেতা পুষ্প কমল দহল প্রচন্ডর নেতৃত্বাধীন নেপালি কমিউনিস্ট পার্টিও এবারের নির্বাচনে প্রভাবশালী একটি পক্ষ।

নেপালের এবারের সাধারণ নির্বাচনে ভূরাজনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দেশটির রাজনীতিতে ঐতিহাসিকভাবে প্রতিবেশী ভারতের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। নেপালের এবারের নির্বাচনও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে দিল্লি। অতীতে নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির সঙ্গে ভারতের টানাপড়েনের সম্পর্ক ছিল। এর কারণ দিল্লি মনে করে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে কে পি শর্মা ওলি ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়তে সক্রিয় ছিলেন। নেপালে বেইজিংয়ের প্রভাবও ব্যাপক। চীন এবারের নির্বাচনের দিকে সতর্ক নজর রাখছে। চীনের প্রত্যাশা, নেপালের পরবর্তী যেকোনো সরকার আগামী দিনে তাদের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’সহ অন্যান্য স্বার্থের অনুকূলে থাকবে।

প্রায় তিন কোটি মানুষের দেশটিতে এ ভোটের মাধ্যমে নতুন সংসদ গঠিত হবে এবং বিদায়ী অন্তর্বর্তী প্রশাসনের স্থলাভিষিক্ত হবে নির্বাচিত সরকার। নেপালের নির্বাচন কমিশনের ঘোষণানুযায়ী আজ সকাল ৭টা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে এবং বিকাল ৫টা পর্যন্ত চলবে। দেশজুড়ে ২৩ হাজারেরও বেশি ভোটকেন্দ্রে ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। ভোটারদের নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গিয়ে ভোট দেয়ার সুযোগ করে দিতে সরকার তিনদিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে। দেশের বিভিন্ন স্কুল, সরকারি ভবন ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে অস্থায়ী ভোটকেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়েছে, যেখানে দুর্গম হিমালয় অঞ্চলের গ্রাম থেকে শুরু করে দক্ষিণের তরাই সমভূমির শহর ও বসতিতে বসবাসকারী নাগরিকরা ভোট দেবেন।

নির্বাচনে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ ভোটার অংশ নেয়ার জন্য নিবন্ধিত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৮ লাখ নতুন ভোটার রয়েছেন, যারা প্রথমবারের মতো ভোট দিচ্ছেন। নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে প্রায় ৯৬ লাখ ৬০ হাজার পুরুষ এবং প্রায় ৯২ লাখ ৪০ হাজার নারী। নেপালে ভোট দেয়ার ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর। ২০২২ সালের সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এবার নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, গত বছরের তরুণ নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের ফলে রাজনীতির প্রতি তরুণদের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

নেপালে ২০১৫ সালে সংবিধান প্রণয়নের পর থেকে মিশ্র নির্বাচনী পদ্ধতি চালু রয়েছে। এ ব্যবস্থায় ভোটাররা সরাসরি ১৬৫ জন সংসদ সদস্য নির্বাচন করবেন, যারা প্রতিনিধি পরিষদের নিম্নকক্ষে দায়িত্ব পালন করবেন। একই সঙ্গে মোট ২৭৫ আসনের সংসদের বাকি ১১০টি আসন আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে প্রার্থীদের মনোনীত করে সংসদে পাঠাবে। নেপালের রাজনৈতিক বাস্তবতায় অতীতে বেশির ভাগ সরকারই জোটভিত্তিক ছিল, যেখানে দুই বা ততোধিক দল একত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতা গঠন করে সরকার পরিচালনা করেছে।

নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ক্ষেত্রেও সময়সূচি নির্ধারণ করেছে নির্বাচন কমিশন। প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত ১৬৫টি আসনের ফলাফল ভোটগ্রহণের দুইদিনের মধ্যেই ঘোষণা করা হতে পারে বলে জানিয়েছে স্থানীয় গণমাধ্যম। আর আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে নির্ধারিত বাকি ১১০টি আসনের ফলাফল প্রকাশে আরো দুই থেকে তিনদিন সময় লাগতে পারে।

এ নির্বাচনকে নেপালের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ এটি সেই গণ-আন্দোলনের পর অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় নির্বাচন, যেখানে তরুণ প্রজন্ম দেশের পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল। আন্দোলনের সময় দুর্নীতি, রাজনৈতিক অদক্ষতা এবং কর্মসংস্থানের সংকটের বিরুদ্ধে তরুণদের ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছিল। ফলে এবারের নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার জন্য দুর্নীতি দমন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আজকের নির্বাচন কেবল একটি সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নয়; এটি নেপালের রাজনীতিতে প্রজন্মগত পরিবর্তনের একটি বড় পরীক্ষা। তরুণদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলনের প্রভাব সংসদে কতটা প্রতিফলিত হয় এবং পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলো কতটা নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারে, সেদিকেই এখন দৃষ্টি রাখছে পুরো নেপাল।