যুদ্ধ এখন আর শুধু স্থল, সমুদ্র বা আকাশে সীমাবদ্ধ নয়। একবিংশ শতকে এর নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে মহাকাশ। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে চলমান রুশ অভিযান যেন এ বাস্তবতাকে আরো স্পষ্ট করে তুলছে। সম্প্রতি রাশিয়ার বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ চলাকালে ক্রেমলিনের সমর্থক হ্যাকাররা পৃথিবীর নির্দিষ্ট কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করা একটি স্যাটেলাইট হাইজ্যাক করে। স্যাটেলাইটটি ইউক্রেনকে টেলিভিশন পরিষেবা সরবরাহ করে।

ঘটনাটি ঘটে চলতি বছরের মে মাসে। তখন ইউক্রেনীয় দর্শকরা তাদের নিয়মমাফিক অনুষ্ঠান দেখতে পাননি, বরং মস্কো থেকে সরাসরি প্রচারিত কুচকাওয়াজের ভিডিও দেখতে হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্যাংক, সৈন্য ও সামরিক সরঞ্জামের সারি দেখানো সেই দৃশ্যটি ছিল এক ধরনের কৌশলগত বার্তা। এর মাধ্যমে এটাই বোঝানো হয়েছে যে, ২১ শতকের যুদ্ধ এখন সাইবারস্পেস ও মহাকাশেও সমানভাবে চলছে।

কোনো প্রকার গুলি খরচ না করেই পুরো একটি স্যাটেলাইট বিকল করে দেয়া সম্ভব। যার মাধ্যমে ভয়াবহ ক্ষতি করা যেতে পারে। এটি করা যায় স্যাটেলাইটের নিরাপত্তা সফটওয়্যারকে লক্ষ্য করে অথবা পৃথিবী থেকে সংকেত পাঠানো বা গ্রহণের সক্ষমতাকে ব্যাহত করে।

সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান নেটরাইজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) টম পেস বলেন, ‘আপনি যদি কোনো স্যাটেলাইটের যোগাযোগের ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারেন, তবে তা মারাত্মক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে।’

জিপিএস বা বৈশ্বিক অবস্থান নির্ণয় ব্যবস্থার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘ভাবুনতো একবার, যদি কোনো জনগোষ্ঠীর হাত থেকে এর নিয়ন্ত্রণ চলে যায়, তবে কী ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে!’

satellite space

ক্যালিফোর্নিয়ার ভ্যান্ডেনবার্গ স্পেস ফোর্স বেসে অবতরণ করছে মার্কিন মহাকাশযান এক্স-৩৭বি, ছবি: ইউনাটেড স্টেটস স্পেস ফোর্স

বর্তমানে পৃথিবীর কক্ষপথে ১২ হাজারেরও বেশি স্যাটেলাইট প্রদক্ষিণ করছে। এগুলো শুধুমাত্র টিভি চ্যানেল বা মোবাইল নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং সামরিক অভিযানসহ বিভিন্ন মাধ্যমে জিপিএসের মতো নেভিগেশন ব্যবস্থা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও অর্থনৈতিক সাপ্লাই চেইনেও একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

মূলত এসব কারণে স্যাটেলাইটগুলো এখন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। যে কোনো পক্ষ তার প্রতিপক্ষের অর্থনীতি বা সামরিক প্রস্তুতিকে দুর্বল করতে চাইলেই এগুলোতে আঘাত হানতে পারে।

স্যাটেলাইটের সুরক্ষায় থাকা সফটওয়্যার বা হার্ডওয়্যারের দুর্বল অংশগুলোকে হ্যাকাররা টার্গেট করে। অনেক সময় স্যাটেলাইটটি সুরক্ষিত থাকলেও, যদি এর সফটওয়্যার পুরনো হয়, তবে তা সহজেই হ্যাক করা সম্ভব। ২০২২ সালে রাশিয়া যখন ইউক্রেন আক্রমণ করে, তখন একটি হ্যাকের মাধ্যমে ইউক্রেন সরকার ও সামরিক বাহিনী কর্তৃক ব্যবহৃত মার্কিন স্যাটেলাইট কোম্পানি ভায়াস্যাটকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। ওই হ্যাকের ফলে ইউরোপের একটি বিশাল অংশের ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

satellite space

কেপ ক্যানাভেরালের কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে স্পেসএক্স ফ্যালকন ৯ রকেটের সফল উৎক্ষেপণ, ছবি: এপি

তবে কেবল সাইবার হামলা নয়, পারমাণবিক অস্ত্রও মহাকাশের জন্য হুমকির কারণ। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাশিয়া এমন একটি পারমাণবিক, মহাকাশ-ভিত্তিক অস্ত্র তৈরি করছে যা নিম্ন-কক্ষপথের প্রতিটি স্যাটেলাইটকে একবারে ধ্বংস করতে সক্ষম। এ অস্ত্রের পারমাণবিক উপাদান স্যাটেলাইটের ইলেকট্রনিক্সকে নষ্ট করে দিতে পারে। যদি অস্ত্রটি ব্যবহার করা হয়, তবে এর প্রভাব হবে মারাত্মক। এটি এক বছরের জন্য নিম্ন-কক্ষপথকে স্যাটেলাইটের জন্য সম্পূর্ণরূপে অকেজো করে দিতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্রদের অর্থনৈতিক এবং এমনকি পারমাণবিক হামলার ঝুঁকিতেও ফেলতে পারে।

বর্তমানে, চাঁদ ও গ্রহাণুতে মূল্যবান খনিজ পদার্থ ও অন্যান্য উপাদান পাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় ভবিষ্যৎ সংঘাত আরো বাড়তে পারে। নাসার ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক শন ডাফি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে চীনের আগে চাঁদে একটি ছোট পারমাণবিক চুল্লি পাঠাতে হবে। চাঁদে ঘাঁটি স্থাপন করতে আমাদের শক্তির প্রয়োজন।’

অন্যদিকে, চীন যেকোনো বহির্জাগতিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার বিরোধিতা করে আসছে। ওয়াশিংটনে চীনের দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ পেংইউ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রই মহাকাশকে সামরিকীকরণের হুমকি দিচ্ছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে 'দায়িত্বজ্ঞানহীন বাগাড়ম্বর' বন্ধ করার এবং মহাকাশে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার আহ্বান জানান।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ঘটনা থেকে স্পষ্ট যে, মহাকাশ এখন একটি যুদ্ধক্ষেত্র। এটি এমন একটি জায়গা, যেখানে দেশগুলো বাণিজ্যিক সুবিধা কাজে লাগাতে এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে।

- এপি অবলম্বনে