যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং ইউরোপীয় মিত্রদের রক্ষা করার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ট্রাম্পের অনিশ্চিত অবস্থান ইউরোপীয় নেতাদের বিস্মিত করেছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সঙ্গে মিলে ন্যাটো গঠন করেছিল। যার উদ্দেশ্য ছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা। ন্যাটোর বিখ্যাত অনুচ্ছেদ ৫ অনুযায়ী, জোটের যে কোনো সদস্য দেশ আক্রমণের শিকার হলে অন্যরা তার প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসবে।
এতদিন যুক্তরাষ্ট্র ছিল এই জোটের প্রধান শক্তি। তবে এখন ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এমনকি জার্মানির নতুন চ্যান্সেলর হতে যাওয়া ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎসও বলেছেন, তিনি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে চান।
চ্যাথাম হাউসের ইউরোপীয় কর্মসূচির প্রধান আর্মিদা ভ্যান রিজ বলেন, ট্রাম্প ন্যাটোকে দুর্বল করেছেন, ন্যাটোর মহাসচিবকে উপেক্ষা করেছেন এবং সমষ্টিগত প্রতিরক্ষার মূলনীতি অনুচ্ছেদ ৫-এর বিশ্বাস নষ্ট করেছেন।
ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, তারা ন্যাটো ছাড়ছে না এবং ইউরোপের সঙ্গে প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব বজায় রাখবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এই ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্ক’ আর মেনে নেবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তাদের ইঙ্গিত, ইউরোপীয় দেশগুলো প্রতিরক্ষায় যথেষ্ট আর্থিক অবদান রাখছে না।
ট্রাম্প বারবার ইউরোপীয় দেশগুলোকে প্রতিরক্ষার জন্য বেশি খরচ করার আহ্বান জানিয়েছেন। এমনকি গত বছর তিনি প্রকাশ্যে পুতিনকে উৎসাহিত করেছিলেন সেই দেশগুলো আক্রমণ করতে, যারা যথাযথ অর্থ পরিশোধ করেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালীন ট্রাম্পের এ ধরনের মনোভাব বেশ উদ্বেগজনক। চ্যাথাম হাউসের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মিন্না আলান্ডার বলেন, এমনও মনে হচ্ছে যে ট্রাম্প সরাসরি রাশিয়ার পক্ষে চলে গেছেন।
অবশ্য ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কার্যক্রমের দিকে মনোযোগ দিলে সেরকম ভাবার কারণ খুঁজে পাওয়া কষ্টকর হবে না। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের প্রশংসা করেছেন ট্রাম্প। চলতি মাসের শুরুতে পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপও হয়েছে তার, যা ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর প্রথম মার্কিন-রাশিয়া যোগাযোগ।
তাছাড়া, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে আলোচনায় ইউক্রেন বা ইউরোপীয় মিত্রদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে ‘একনায়ক’ও বলেছেন ট্রাম্প। সে সঙ্গে, পুতিনের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে ট্রাম্প বলেছেন, রাশিয়া নয়, যুদ্ধ শুরু করেছিল ইউক্রেন।
ট্রাম্প আরো বলেছেন, এই যুদ্ধ ইউরোপের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ, আমাদের জন্য নয়। আমাদের মাঝে বড় ও সুন্দর একটি মহাসাগর রয়েছে।
এমন অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপকে সাহায্য করবে কিনা এবং ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫ অকেজো হয়ে গেছে কিনা— তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এ বলা হয়েছে, কোনো সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে অন্যরা সামরিক সহায়তা দেবে। কিন্তু এর মানে সব সময়ই সেনা পাঠানো নয়।
লন্ডনের প্রতিরক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠান আরইউএসই-এর বিশ্লেষক এডওয়ার্ড আর্নল্ড বলেন, রাশিয়া যদি এস্তোনিয়ায় আক্রমণ চালায় তবে যুক্তরাষ্ট্র শুধু একটি নজরদারি বিমান পাঠালেও তা অনুচ্ছেদ ৫-এর শর্ত পূরণ করবে। তবে এটি মূল চেতনার সঙ্গে যায় না। আগের মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সময় এটা ছিল স্বাভাবিক প্রত্যাশা যে, যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি সহায়তা করবে। কিন্তু এখন মানুষ আতঙ্কিত।
যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর সামরিক শক্তির প্রায় ৭০ শতাংশে অবদান রাখে এবং ইউরোপে ১ লাখেরও বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। ন্যাটোর প্রধান সামরিক কমান্ডারও সবসময় একজন আমেরিকান হয়ে থাকেন।
চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষক রিজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এতটাই শক্তিশালী যে, তারা স্বাভাবিকভাবেই ন্যাটোর নেতা হয়ে গেছে। কিন্তু এখন ইউরোপের কেউই সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে পারবে না। কারণ কারো পর্যাপ্ত সামরিক শক্তি নেই।
যুক্তরাষ্ট্র এক দশক আগেই সতর্ক করেছিল যে, ইউরোপকে নিজেদের প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করতে হবে। জার্মানির নতুন নেতা ম্যার্ৎস বলেন, আমার প্রধান লক্ষ্য হবে ইউরোপকে যত দ্রুত সম্ভব শক্তিশালী করা, যাতে আমরা ধাপে ধাপে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে পারি।
তিনি আরো বলেন, আমরা জুনে যখন ন্যাটোর বৈঠকে বসব, তখন হয়তো এটি আগের মতো থাকবে না। আমাদের একটি স্বাধীন ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।
ইউরোপ দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে। গ্রিস, নরওয়ে ও অন্যান্য দেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আর ডেনমার্ক বাড়িয়েছে সামরিক বাজেট।
যুক্তরাজ্যও প্রতিরক্ষা খরচ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে, যেখানে অতিরিক্ত ১৩ বিলিয়ন পাউন্ড খরচ করা হবে। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, এটি বেশ কঠিন সিদ্ধান্ত। তবে জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য এটি প্রয়োজনীয়।
বিশ্লেষক এডওয়ার্ড আর্নল্ড বলেন, আমরা এখন বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন দেখছি। যুক্তরাষ্ট্র আগের মতো বিশ্বস্ত মিত্র নয় এবং তারা সম্ভবত আর আগের অবস্থানে ফিরে যাবে না।








