কাশ্মীরকে ঘিরে ভারত ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সংঘর্ষে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে চীনের জন্য একটি বিরল গোয়েন্দা সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাকিস্তানের বিপক্ষে ভারতের এই সামরিক তৎপরতা নয়াদিল্লির সামরিক সক্ষমতা ও যুদ্ধকৌশল পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে চীনের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংঘাতে ভারতের শক্তিমত্তার খুব কাছ থেকে স্পষ্ট দেখার বিরল সুযোগ পাচ্ছে চীন। যা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের সামরিক প্রযুক্তি ও প্রতিক্রিয়ার বহুমাত্রিক বিশ্লেষণে সহায়ক হবে।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক আলেকজান্ডার নেইল বলেন, এটা গোয়েন্দা দৃষ্টিকোণ থেকে এক অনন্য সুযোগ—ভারতের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের সামরিক নড়াচড়া সীমান্তেই সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে।

দুই মার্কিন কর্মকর্তা জানান, পাকিস্তানি বাহিনীর ব্যবহৃত চীনা নির্মিত জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান অন্তত দুটি ভারতীয় সামরিক বিমান ভূপতিত করেছে—যার মধ্যে একটি ছিল ফরাসি নির্মিত রাফায়েল জেট। ভারত অবশ্য তাদের কোনো যুদ্ধবিমানের ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করেনি। পাকিস্তান কেবল জেএফ-১৭ ব্যবহারের কথা নিশ্চিত করলেও ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র বা অস্ত্রের ধরন নিয়ে মুখ খোলেনি।

বিশ্বব্যাপী সামরিক বিশ্লেষকদের জন্য এই ধরনের যুদ্ধপরিস্থিতি একটি বিরল উপলক্ষ—যেখানে পাইলটের দক্ষতা, যুদ্ধবিমানের কার্যকারিতা ও আকাশ থেকে আকাশে ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার সরাসরি পর্যবেক্ষণ করে বিশ্লেষণ করা যায়।

চীন ও ভারত—এই দুই আঞ্চলিক পরাশক্তি। দীর্ঘমেয়াদে একে অপরকে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে। যাদের মধ্যে ৩,৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ হীমালয় সীমান্ত নিয়ে দশকের পর দশক ধরে উত্তেজনা চলছে। সর্বশেষ সীমান্ত সংঘর্ষ ঘটে ২০২০ সালে, যার কিছুটা বরফ গলে ২০২৪ সালের শেষভাগে একটি যৌথ টহল চুক্তির মধ্য দিয়ে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, উভয় দেশই সীমান্তে তাদের সামরিক সুবিধা ও সক্ষমতা বাড়িয়েছে। তবে চীনের গোয়েন্দা সংগ্রহের সবচেয়ে বড় শক্তি মহাকাশ থেকে পর্যবেক্ষণ। লন্ডনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস) এর তথ্য অনুযায়ী, চীনার এখন ২৬৭টি স্যাটেলাইট সক্রিয় রয়েছে— যার মধ্যে ১১৫টি গোয়েন্দা, নজরদারি ও টহলের জন্য এবং আরও ৮১টি সামরিক ইলেকট্রনিক ও সংকেত পর্যবেক্ষণের জন্য। এটি ভারতসহ আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় অনেক বেশি এবং শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।

বিশ্লেষক ও কূটনীতিকরা বলছেন, ভারত যদি ব্রহ্মোস সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো কোনো কৌশলগত অস্ত্র ব্যবহার করে, তাহলে সেটি চীনের জন্য বিশেষ আগ্রহের বিষয় হবে। এখন পর্যন্ত এই অস্ত্রটি সরাসরি যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে বলে জানা যায়নি। ফলে তার গতি, নির্ভুলতা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে চীন মরিয়া থাকবে।

এছাড়া সামুদ্রিক পর্যবেক্ষণেও চীন এখন বেশি সক্রিয়। ভারত মহাসাগরে চীনা গবেষণা জাহাজ, মহাকাশ পর্যবেক্ষণ জাহাজ ও তথাকথিত মাছ ধরার নৌবহর নিয়মিত মোতায়েন করা হচ্ছে—যাদের মধ্যে অনেকগুলো ‘গোপন গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রাহক’ হিসেবে কাজ করে, বলছেন ওপেন সোর্স গবেষক ড্যামিয়েন সাইমন।

তিনি এক্সে এক পোস্টে জানান, মে ১ তারিখে ভারতীয় নৌবাহিনীর মহড়ার কাছে ২২৪টি চীনা মাছ ধরার জাহাজ একত্রে ঘোরাফেরা করেছে, যা আদতে গোয়েন্দা নজরদারির অংশ হতে পারে।

এই ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাই একদিকে যেমন দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তুলছে, তেমনি চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের জন্য এটি হয়ে উঠছে একটি স্বর্ণখনি—যেখানে পরাশক্তি হয়ে ওঠার দৌড়ে তারা আরেকধাপ এগিয়ে যেতে চায়।