সে সময়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোটি অনুসারীর উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিয়েছিলেন ৩৫ বছর বয়সী র্যাপার থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা বালেন্দ্র শাহ, যিনি সবার কাছে ‘বালেন’ নামেই বেশি পরিচিত। তিনি লিখেছিলেন, ‘প্রিয় জেন-জি, তোমাদের হত্যাকারীর পদত্যাগ আসন্ন। এখন দেশকে নেতৃত্ব দিতে হবে তোমাদের প্রজন্মকেই। প্রস্তুত হও।’
পাঁচ মাসের ব্যবধানে সেই বার্তার রাজনৈতিক তাৎপর্য বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে। ২০২২ সালে কাঠমান্ডুর মেয়র হয়ে জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনায় আসা এ সংগীতশিল্পী-রাজনীতিক এখন নেপালের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দোরগোড়ায়। সেপ্টেম্বরের গণ-অভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত প্রথম সাধারণ নির্বাচনে তার দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) বিশাল ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক গণনা অনুযায়ী, প্রত্যক্ষ ভোটে নির্ধারিত ১৬৫ আসনের মধ্যে ১১১টিতে বিশাল ব্যবধানে এগিয়ে। দেশটির অন্যতম পুরনো দল নেপালি কংগ্রেস এগিয়ে ১০টি আসনে। কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল–ইউনিফায়েড মার্ক্সিস্ট- লেনিনিস্ট (সিপিএন–ইউএমএল) এগিয়ে ১০টি আসনে। নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি এগিয়ে রয়েছে আটটি আসনে।
১৬৫টি প্রত্যক্ষ ভোটে নির্ধারিত আসন এবং ১১০টি আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের আসন মিলিয়ে পূর্ণাঙ্গ ফল কয়েক দিনের মধ্যে প্রকাশ হওয়ার কথা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা নেপালি কংগ্রেস এরই মধ্যে পরাজয় মেনে নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পার্টির এ প্রাধান্য তাদের পরবর্তী সরকার গঠনের পথ অনেকটাই পরিষ্কার করে দিয়েছে।
গত ডিসেম্বরে সাবেক টেলিভিশন উপস্থাপক থেকে রাজনীতিক হওয়া রবি লামিছানের নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পার্টিতে যোগ দেন বালেন্দ্র শাহ। এরপর দলটি তাকে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে সামনে আনে। নির্বাচনী ইশতাহারে দলটি ১২ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বাধ্যতামূলক বিদেশগমন কমানো এবং বেকারত্ব ও স্বল্প মজুরির কারণে বিদেশমুখী হওয়া তরুণদের দেশে কাজে লাগানোর প্রতিশ্রুতি দেয়।
দলটি আরো বলেছে, পাঁচ বছরের মধ্যে নেপালের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৪৪৭ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৩ হাজার ডলারে নেয়া হবে, মোট দেশজ উৎপাদন ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হবে এবং দেশের জনগণের জন্য স্বাস্থ্যবীমাসহ সামাজিক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় পর্যায়ে বালেন্দ্র শাহর সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে তিনি কেমন দক্ষ ও যোগ্য সরকার গঠন করতে পারেন তার ওপর।
কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ বিপিন অধিকারী বলেন, ‘বালেন্দ্র শাহ এতটাই জনপ্রিয় যে এখন কাঠমান্ডুমুখী বাসেও লেখা দেখা যায়—বালেনের শহরে যাচ্ছি। তার মতে, শাহ যদি সত্যিই ক্ষমতায় যেতে পারেন, তবে তা হবে এমন এক মানুষের নাটকীয় উত্থানের পরিণতি, যিনি প্রথমে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কাঠামোর সমালোচনামূলক র্যাপ গানের মাধ্যমে পরিচিতি পান এবং পরে সেই জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে উচ্চ রাজনীতিতে উঠে আসেন।’
এমন সম্ভাবনা নেপালের রাজনীতিতেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। চীন ও ভারতের মাঝখানে অবস্থিত ছোট হিমালয়ান রাষ্ট্রটির রাজনীতি এতদিন ধরে কয়েকটি পুরনো ও প্রতিষ্ঠিত দলের নিয়ন্ত্রণে ছিল। বালেন্দ্র শাহর উত্থান সেই দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
বালেন শাহর জনপ্রিয়তার একটি বড় ভিত্তি কাঠমান্ডুর মেয়র হিসেবে তার কাজ। নগর অবকাঠামো উন্নয়ন, বিশেষ করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্বাস্থ্যসেবাসহ নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ তাকে তরুণ ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। তবে তার মেয়াদকাল পুরোপুরি বিতর্কমুক্ত ছিল না। পথের দোকানদার ও ভূমিহীন মানুষের সম্পত্তি দখলে পুলিশ ব্যবহারের অভিযোগে তিনি সমালোচনার মুখেও পড়েন। এ নিয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকেও প্রশ্ন তোলা হয়েছিল।
নেপালের পুরনো প্রজন্মের অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের মতো তিনি মূলধারার সংবাদমাধ্যমের সামনে খুব বেশি আসেন না। বরং ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ৩৫ লাখের বেশি অনুসারীর মাধ্যমে তিনি সরাসরি তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখেন। স্বাধীন রাজনৈতিক বিশ্লেষক পুরঞ্জন আচার্য বলেন, ‘সংক্ষিপ্ত সামাজিক বার্তার মাধ্যমে তরুণদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ রাখাই বালেনকে আলাদা করেছে। তবে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর পথটা তার জন্য মোটেই সহজ হবে না।’
বালেন্দ্র শাহর ব্যক্তিগত জীবনও তার রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। আয়ুর্বেদ চিকিৎসক বাবা ও গৃহিণী মায়ের সন্তান শাহ ছোটবেলা থেকেই কবিতার প্রতি আকর্ষণ অনুভব করতেন। পরে সেই ঝোঁক রূপ নেয় র্যাপ সংগীতে।
নেপালে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি নেয়ার পর তিনি দক্ষিণ ভারতে কাঠামো প্রকৌশলে স্নাতকোত্তর পড়তে যান। তবে তার আগেই নিজ দেশে তিনি র্যাপ তারকা হিসেবে পরিচিতি পেয়ে যান। নেপালের শাসকগোষ্ঠী ও ক্ষমতাকাঠামোর বিরুদ্ধে তার সমালোচনামূলক গান বিশেষ সাড়া ফেলেছিল। নেপালের জীর্ণ, দুর্নীতিগ্রস্ত ও অকার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে পাল্টাতে না পারলে জনপ্রিয়তা একা তাকে টিকিয়ে রাখতে পারবে না—এ সতর্কতাই এখন সবচেয়ে জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে।
নেপালের রাজনৈতিক বিশ্লেষক পুরঞ্জন আচার্যের ভাষায়, ‘বর্তমান রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে থেকে একা তার পক্ষে বড় পরিবর্তন আনা কঠিন। কার্যকরভাবে কাজ করতে হলে তার শক্তিশালী দল, বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক সমর্থন দরকার। তা না হলে দ্রুত ক্ষয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।’
তবু আপাতত নেপালের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে বালেন্দ্র শাহ। তরুণদের ক্ষোভ, প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর প্রতি অনাস্থা এবং বিকল্প নেতৃত্বের খোঁজ—এ তিনের সমাবেশে তিনি এক নতুন রাজনৈতিক মুহূর্তের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। সেপ্টেম্বরের রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থানের পর যে প্রজন্মকে তিনি নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত হতে বলেছিলেন, সেই প্রজন্মই এখন তাকে দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক দায়িত্বে পৌঁছে দেয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছে।










