জেনারেশন জেড বা জেন-জিদের তীব্র আন্দোলনের মুখে সরকার পতনের একদিন পরও নেপালজুড়ে নৈরাজ্য বিরাজ করছে। প্রশাসনিক শূন্যতা, দেশজুড়ে কারফিউ, সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামোয় ভাংচুর-আগুন, সব মিলিয়ে এক চরম অরাজক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশটি। এর মধ্যেই দেশটির অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে সামনে এসেছে সুশীলা কার্কির নাম। সংবাদ সংস্থা এপির খবরে বলা হয়েছে, বিক্ষোভকারীরা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দেশটির সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কিকে দায়িত্ব নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। নেপালের স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, সুশীলা অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নিতে রাজি হয়েছেন। কার্কি দেশটির একমাত্র নারী প্রধান বিচারপতি। ২০১৬-১৭ সালে দায়িত্ব পালন করা এ নারী বিচারক দেশটিতে বেশ জনপ্রিয়। আন্দোলনের শুরু থেকে তরুণদের সমর্থন দিয়ে এসেছেন তিনি।

দেশটির গণমাধ্যমের তথ্য বলছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মার পতনের পর কাঠমান্ডুর মেয়র বালেন্দ্র শাহকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া জেন-জির বিক্ষোভকারীরা। তবে এতে ৩৫ বছর বয়সী এ স্বতন্ত্র মেয়রের সাড়া মেলেনি। এ কারণে এখন তার পরিবর্তে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কিকে দেশের দায়িত্ব নেয়ার আহ্বান জানান তারা।

জানা গেছে, কেপি শর্মার পদত্যাগের পর গতকাল একটি ভার্চুয়াল বৈঠকে অংশ নেন প্রায় পাঁচ হাজার বিক্ষোভকারী। তাদের আলোচনায় সুশীলা কার্কির নাম উঠে আসে। বেশির ভাগই সুশীলা কার্কির নামকে সমর্থন করেছেন।

এদিকে গতকাল সন্ধ্যায় নেপালের নতুন নেতৃত্ব নিয়ে সেনাপ্রধান জেনারেল অশোক রাজ সিগদেলের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন জেন-জি আন্দোলনকারীদের সমন্বয়করা। তবে জেনারেল অশোক ‘দুর্গা প্রসাই’ নামে এক ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টিকে (আরএসপি) আন্দোলনের অন্যতম অংশীদার হিসেবে আখ্যায়িত করায় বৈঠক থেকে বেরিয়ে যান তারা।

একদিকে যেখানে পরবর্তী নেতৃত্ব নিয়ে চলছে আলোচনা, বৈঠক, সেখানে অন্যদিকে নেতৃত্বশূন্যতার সুযোগে সহিংস হয়ে উঠেছে অনেকে। দেশব্যাপী প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার বন্দি কারাগার ভেঙে পালিয়ে গেছে। অগ্নিসংযোগ আর ভাংচুরের পর থানা থেকে লুটপাট হয়েছে অস্ত্র। সেনা ও পুলিশ যৌথভাবে ৩০৩ জন আত্মঘাতী বন্দিকে আটক করেছে, উদ্ধার করা হয়েছে ৭৩টি অস্ত্র।

আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া তরুণরাও বলছেন, এ ধ্বংসযজ্ঞ জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। এর সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আন্দোলনটি বহিরাগত সুযোগসন্ধানীরা ছিনিয়ে নিয়েছে। এক বিবৃতিতে বিক্ষোভকারীরা বলেছেন, ‘আমাদের আন্দোলন অহিংস ছিল এবং থাকবে। শান্তিপূর্ণ নাগরিক অংশগ্রহণের নীতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে এ আন্দোলন।’ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্বেচ্ছাসেবী হয়ে মাঠে কাজ করছেন বলেও জানিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। বুধবারের পর থেকে তাদের আর কোনো বিক্ষোভ কর্মসূচি নেই বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সেনা ও পুলিশকে প্রয়োজন হলে কারফিউ জারি রাখার আহ্বান জানিয়েছে জেনারেশন জেড আন্দোলনের নেতারা।

সেনাবাহিনীরও একই অভিমত। সহিংসতা ও ভাংচুরে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছে সেনাবাহিনী। রাজধানীজুড়ে সামরিক চৌকি বসানো হয়েছে। যানবাহনের কাগজপত্র পরীক্ষা করা হচ্ছে। লাউডস্পিকারে ভেসে আসছে সেনাদের সতর্কবাণী—‘বিনা প্রয়োজনে বের হবেন না।’

এদিকে নেপালের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপ্রধান প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পাউডেলই সর্বোচ্চ পদে রয়েছেন। পোখারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক যোগ রাজ লামিছানে আল জাজিরাকে বলেন, ‘সরকারিভাবে সেনাবাহিনীর ভূমিকা শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ তাদের দায়িত্ব নয়।’ তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক উপ্রেতি জানান, আন্দোলনরত তরুণ প্রজন্ম প্রেসিডেন্টকে বিশ্বাস করছে না বলে কার্যত সেনাবাহিনীই এখন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম দুই-ই সামলাচ্ছে সেনাবাহিনী।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রক্রিয়া যদি সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে থাকে, তবে নতুন প্রধানমন্ত্রীকে বর্তমান সংসদের মধ্যে থেকেই আসতে হবে। কিন্তু নেপালের এখন যা পরিস্থিতি তাতে ১০ বছর আগে রচিত নেপালের বর্তমান সংবিধান অকার্যকর বলে অভিমত বিশ্লেষকদের। আর এ পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাই পরবর্তী পদক্ষেপ। প্রশাসনিক শূন্যতার সুযোগে রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিও মাথা তুলছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান আন্দোলনকারীরা রাজতন্ত্রে ফেরার পক্ষে নয়। প্রজাতন্ত্র ব্যবস্থাই আলোচনার মূল কাঠামো থাকবে।

অন্যদিকে ক্ষোভের আগুনে জ্বলতে থাকা এ ধ্বংসস্তূপের মধ্যে থেকেই আগামীর সম্ভাবনাময় নেপালকে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন তরুণরা। অব্যাহত নিষেধাজ্ঞা ও কারফিউয়ের মধ্যেই রাস্তায় বেরিয়েছেন অনেক তরুণ। মুখে মাস্ক পরে, হাতে প্লাস্টিকের ব্যাগ নিয়ে বিক্ষোভে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি পরিষ্কার করছেন তারা। তাদের অনেকেই বিক্ষোভে অংশ নেয়নি কিন্তু এ আন্দোলন থেকে পরিবর্তন আসুক এমনটাই প্রত্যাশা তাদের। নেপালের এখন স্বাধীন রাজনৈতিক নেতার প্রয়োজন বলেও জানিয়েছেন তারা।