ইউরোপে গত বছর হামে আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় আক্রান্তদের মধ্যে ৪০ শতাংশের বেশি পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক তহবিল ইউনিসেফের যৌথ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। খবর বিবিসি।

ইউরোপে ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক পরিচালক হ্যান্স হেনরি ক্লুগ বলেন, ‘হাম ফিরে এসেছে। আর এটি গুরুতর সতর্কবার্তা। পর্যাপ্ত টিকাদান বাস্তবায়ন সম্ভব না হলে স্বাস্থ্য সুরক্ষা বলে কিছু থাকবে না। হাম, মাম্পস ও রুবেলা থেকে সুরক্ষা দেয় এমএমআর টিকা, যা ৯৭ শতাংশ কার্যকর।’

প্রতিবেদনটির তথ্যমতে, ২০২৪ সালে ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার ৫৩টি দেশে মোট ১ লাখ ২৭ হাজার ৩৫০টি হাম সংক্রমণের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে, যা ১৯৯৭ সালের পর সর্বোচ্চ।

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, যা কাশি ও হাঁচির মাধ্যমে ছড়ায়। এর প্রধান উপসর্গগুলো হলো উচ্চমাত্রার জ্বর, লাল ও পানিযুক্ত চোখ, কাশি, হাঁচি। যথাযথ চিকিৎসা করা না হলে হাম, নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস), এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বছরের ৬ মার্চ পর্যন্ত ইউরোপ অঞ্চলে হামজনিত কারণে ৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। ১৯৯৭ সাল থেকে হাম রোগের সংক্রমণ কমছিল। কিন্তু ২০১৮-১৯ সালে এ প্রবণতায় পরিবর্তন হতে শুরু করে। ২০২৩-২৪ সালে সংক্রমণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়, যার প্রধান কারণ কভিড-১৯ মহামারীর সময়ে পর্যাপ্ত টিকাদান বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এখনো অনেক দেশ মহামারীর আগের টিকাদান হারের কাছাকাছি পৌঁছতে পারেনি। ফলে নতুন প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি বাড়ছে।

২০২৪ সালে ইউরোপ অঞ্চলে বিশ্বব্যাপী হাম সংক্রমণের এক-তৃতীয়াংশ ঘটনা ঘটেছে। রোমানিয়ায় সর্বাধিক ৩০ হাজার ৬৯২টি ও কাজাখস্তানে ২৮ হাজার ১৪৭টি সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফ সতর্ক করে বলেছে, হাম এখনো বৈশ্বিক স্বাস্থ্য হুমকি। সরকারগুলোকে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি নতুন সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

হাম রোগ এখন যুক্তরাষ্ট্রেও ছড়িয়ে পড়ছে, যেখানে ২০০০ সালে এটি নির্মূল বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে এ রোগে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। কানাডায়ও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা জানান, টিকাদান কমে যাওয়ায় হাম আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

ইউরোপীয় রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের (ইসিডিসি) তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে হাম আক্রান্ত ১০ জনের মধ্যে আটজনই টিকা নেননি। ২০২৩ সালের হিসাবে হাঙ্গেরি, মাল্টা, পর্তুগাল ও স্লোভাকিয়া ইউরোপে মাত্র এ চার দেশ হামের প্রাদুর্ভাব রোধে ৯৫ শতাংশ টিকাদান হার অর্জন করতে পেরেছে। যুক্তরাজ্যে দুই ডোজ টিকার হার ৯০ শতাংশের নিচে নেমে আসায় বিশেষজ্ঞরা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টিকা নিয়ে ভুল তথ্য দ্রুত ছড়ায়। এর মাধ্যমে মানুষের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের ড. বেন কাস্তান-দাবুশ বলেন, ‘কভিড-১৯ টিকাদান কর্মসূচির সময় আমরা দেখেছি, কীভাবে ভুল তথ্য কত দ্রুত ছড়ায়। টিকার বিষয়ে বিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়া জরুরি।’

ডব্লিউএইচও ও অন্যান্য সংস্থা টিকাদান কর্মসূচি প্রচার ও জনসচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে হাম প্রতিরোধে কাজ করছে। টিকাদানের হার বাড়ানোই হাম ঠেকানোর একমাত্র কার্যকর উপায় বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।