৮০ বছরে দুই হাজারেরও বেশি পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালানো হয়েছে, যার ক্ষতিকর প্রভাব বিশ্বজুড়ে এখনো বিদ্যমান। এসব অস্ত্রের পরীক্ষা স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। এখনো বহু মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম এ বিষাক্ত তেজস্ক্রিয়তার পরিণাম বহন করে চলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ রাজ্যের সল্ট লেক সিটিতে গত শতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বড় হওয়া মেরি ডিকসন ছিলেন লক্ষ লক্ষ মার্কিন স্কুলছাত্রীর মধ্যে একজন, যাদের শীতল যুদ্ধের সময় পারমাণবিক হামলা থেকে আত্মরক্ষার জন্য ‘ডাক অ্যান্ড কভার’ অনুশীলন করানো হতো। সে সময় তিনি জানতেন না যে পার্শ্ববর্তী নেভাদা রাজ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। তিনি যেখানে থাকতেন, সেখান দিয়ে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের মেঘ প্রবাহিত হতো।
ডিকসন জানান, তিনি থাইরয়েড ক্যান্সারে ভুগেছেন। তার বোন চল্লিশের কোঠায় লুপাস রোগে মারা যান এবং তার ভাগ্নিরাও বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন।
তিনি আরো জানান, তিনি যে পাড়ায় ছোটবেলায় থাকতেন, সেখানকার পরিচিত ৫৪ জনের ক্যান্সার, জন্মগত ত্রুটি বা গর্ভপাতের মতো নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা গিয়েছিল।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, বিকিরণের সংস্পর্শে এলে ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ কারণেই নেভাদায় পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালানো স্থানের আশপাশের রাজ্যগুলোয় বসবাসকারী ‘ডাউনউইন্ডার’ নামে পরিচিত মানুষ স্বাস্থ্য সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে।
ডিকসন বলেন, ‘আমাদের জন্য শীতল যুদ্ধ কখনো শেষ হয়নি। আমরা এখনো এর প্রভাব নিয়ে বেঁচে আছি।’
১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে পারমাণবিক বোমা হামলার মাধ্যমে পারমাণবিক যুগের সূচনা হয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নসহ যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও চীন আরো শক্তিশালী পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতায় নামে। তারা ১৯৪৫-৯৬ সাল পর্যন্ত দুই হাজারেরও বেশি পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকাংশের পরীক্ষা চালায়। এ পরীক্ষাগুলো জাপানের মতোই আশপাশের মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও ভূমিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
সোভিয়েত ইউনিয়ন কাজাখস্তানে ১৯৪৯-৮৯ সাল পর্যন্ত ৪৫০টিরও বেশি পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা চালায়। কাজাখস্তানের একজন বিশেষজ্ঞ আইগেরিম সাইতেনোভা জানান, তার বহু আত্মীয় ৪০ ও ৫০ বছরের কোঠায় মারা গেছেন এবং তার পরিবারের বহু সদস্য দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন।
তিনি আরো জানান, কাজাখস্তানের মানুষের এ ধরনের অভিজ্ঞতা ফ্রান্সের স্বশাসিত দ্বীপপুঞ্জ পলিনেশিয়া, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ ও অস্ট্রেলিয়ার মানুষের অভিজ্ঞতার মতোই।
পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষার ফলে পরিবেশেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মার্শাল দ্বীপপুঞ্জে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, সেখানকার মাটিতে ও খাদ্য উৎসগুলোয় তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা এখনো অনেক বেশি। উদাহরণস্বরূপ, নারকেল কাঁকড়ার শরীরে উচ্চ মাত্রার তেজস্ক্রিয়তা পাওয়া গেছে। কারণ তারা মাটি ও নারকেল থেকে দূষিত উপাদান গ্রহণ করেছে।
এসব পরীক্ষার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবগুলো ধীরে ধীরে স্বীকৃত হওয়ায় কিছু ভুক্তভোগী ক্ষতিপূরণ পেতে শুরু করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো যদিও ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। তবে ভুক্তভোগীরা বলছেন, ক্ষতির তুলনায় এ ক্ষতিপূরণের পরিমাণ খুবই কম। অনেক ভুক্তভোগীর পক্ষে পুরনো নথি জোগাড় করে ক্ষতিপূরণের জন্য আবেদন করাও কঠিন।
চিলির বিচার ও মানবাধিকারমন্ত্রী জাইমে গাজার্দো ফ্যালকন বলেন, ‘পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ৮০ বছর পরও এর ক্ষত এখনো তাজা। দশকের পর দশক আগে হওয়া এসব পরীক্ষার পরিণতি শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।’ —সিএনএন অবলম্বনে










