দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির ওপর সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজয়ের ৮০তম বার্ষিকী উপলক্ষে শুক্রবার মস্কোর রেড স্কয়ারে সামরিক কুচকাওয়াজের আয়োজন করে রাশিয়া। কুচকাওয়াজে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার কয়েক ডজন নেতাসহ তাদের মিত্র দেশগুলোর প্রতিনিধিরা। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিত্রদের পাশে নিয়ে কুচকাওয়াজের আয়োজন করে পুতিন বিশ্বকে দেখাতে চেয়েছেন, ইউক্রেনে সংঘটিত যুদ্ধের জেরে পশ্চিমা দেশগুলো তাকে চাপে রাখলেও শেষ পর্যন্ত তিনি নিঃসঙ্গ নন।

এ ঘটনার একদিন পর গতকাল কিয়েভ সফর করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমার, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ, জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মার্জ ও পোলিশ প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক। মিত্রদের নিয়ে পুতিনের কুচকাওয়াজের পর পশ্চিমা নেতাদের এ সফরকে ইউক্রেনের প্রতি তাদের সংহতির শক্ত বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তারা এমন এক সময় ইউক্রেন সফর করছেন, যখন ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ নতুন মোড় নিচ্ছে। পশ্চিমা নেতারা জেলেনস্কির সঙ্গে একজোট হয়ে বৈঠক ও যুদ্ধাহত ইউক্রেনীয় সৈন্যদের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন।

সংবাদমাধ্যম জানায়, মস্কোর কুচকাওয়াজে সাড়ে ১১ হাজার সৈন্য অংশ নেয়, যার মধ্যে দেড় হাজার সরাসরি ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। প্যারেডে উত্তর কোরিয়া ও চীনা সৈন্যদের অংশগ্রহণ এবং আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার নেতাদের উপস্থিতি তাদের সঙ্গে রাশিয়ার কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতা স্পষ্ট করে। এ সময় ড্রোন, ট্যাংক ও পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনে সক্ষম ইন্টারকন্টিনেন্টাল ‘ইয়ার্স’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শন করা হয়। অনুষ্ঠানে দেয়া ভাষণে পুতিন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন। অবশ্য বক্তব্যে তিনি পশ্চিমা মিত্রদের অবদানও স্বীকার করেন। তবে পুরো আলোচনায় চলমান ইউক্রেন যুদ্ধের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান তিনি।

এর আগে ৮-১০ মে পর্যন্ত ৭২ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন পুতিন। অবশ্য ইউক্রেন জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির মধ্যেও রুশ বাহিনীর গোলাবর্ষণ ও ড্রোন হামলা অব্যাহত ছিল। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসা আহত সৈন্যরাও বলছেন, বাস্তবে যুদ্ধবিরতির কোনো প্রতিফলন তারা দেখেননি।

যুদ্ধবিরতির শেষ দিনে ইউরোপীয় নেতাদের কিয়েভ সফর ও জেলেনস্কির সঙ্গে দেয়া তাদের যৌথ বিবৃতিকে রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়ার কূটনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। পশ্চিমা নেতারা এ দফায় ৩০ দিনের একটি পূর্ণ যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন। এক যৌথ বিবৃতিতে এ চার নেতা বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মতো আমরাও পূর্ণ ও নিঃশর্ত ৩০ দিনের যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানাচ্ছি, যাতে একটি ন্যায়সংগত ও স্থায়ী শান্তি আলোচনার পথ তৈরি হয়।’ গত বৃহস্পতিবার রাশিয়ার প্রতি ৩০ দিনের যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানান, যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন না হলে রাশিয়ার ওপর আরো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। এতেও কোনো অগ্রগতি না হলে তিনি শান্তি প্রচেষ্টা থেকে সরে দাঁড়াবেন বলেও হুঁশিয়ারি দেন।

ট্রাম্পের এ আহ্বানের পর জেলেনস্কি জানান, যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের জন্য তারা তখনই প্রস্তুত। তবে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ গত শুক্রবার বলেছেন, ‘রাশিয়াও ৩০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকরে সম্মত, তবে কিছু “সূক্ষ্ম বিষয়” বিবেচনায় রাখতে হবে।’ পরদিন এবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি আরো বলেন, ‘পশ্চিমারা যদি ইউক্রেনে সামরিক সহায়তা পাঠানো বন্ধ না করে, তাহলে যুদ্ধবিরতি ইউক্রেনকে সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে যাবে।’