শ্রীলংকার উপকূলের কাছাকাছি আন্তর্জাতিক জলসীমায় গতকাল ইরানি যুদ্ধজাহাজে হামলা চালিয়ে ডুবিয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে অন্তত ৮৭ জন নিহত হয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলায় গতকাল পর্যন্ত ইরানে নিহতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। ইসরায়েলের পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোয়ও হামলা অব্যাহত রেখেছে তেহরান। দুবাইয়ের একটি কনস্যুলেট, সৌদি আরবে সিআইএ স্টেশন এবং কাতারে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি হামলার শিকার হয়েছে। সব মিলিয়ে সংঘাত যেমন বিস্তৃত হচ্ছে, তেমনি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার শঙ্কাও বাড়ছে।
ইরানের আধাসরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৪৫ জনে পৌঁছেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৯৭ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১০ বছরের কম বয়সী ১৮১ শিশুও রয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ৫ হাজার ৪০২ জন। সংস্থাটি জানিয়েছে, গতকাল সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায়ই ইরানে অন্তত ১০৪টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি হাসপাতাল, স্কুল এবং আবাসিক এলাকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এছাড়া গতকাল শ্রীলংকার উপকূলে ইরানের যুদ্ধজাহাজে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। পেন্টাগন থেকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, আমেরিকার টর্পেডোতেই ডুবেছে ইরানের যুদ্ধজাহাজ। তিনি বলেন, ‘তারা ভেবেছিল আন্তর্জাতিক জলসীমায় নিরাপদ থাকবে। কিন্তু টর্পেডো দিয়ে ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে।’ শ্রীলংকার নৌবাহিনী জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন বাহিনীর হামলায় ডুবে যাওয়া ইরানি রণতরি থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৮৭টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কমান্ডার বুদ্ধিকা সম্পত এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, নৌবাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর সময় জাহাজটির কোনো চিহ্ন দেখতে পায়নি।
এদিকে ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে গতকালও একাধিক বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, তাদের বিমান বাহিনী তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলোতে ব্যাপক হামলা অব্যাহত রেখেছে। আইডিএফ জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানে পাঁচ হাজারের বেশি বোমা ফেলেছে তাদের বিমান বাহিনী। এ হামলার মাধ্যমে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত আরেক বিবৃতিতে ইসরায়েলি বাহিনী জানায়, তারা ইরানজুড়ে আকাশসীমার নিয়ন্ত্রণ আরো সুসংহত করার অভিযান চালাচ্ছে। এছাড়া ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির যে-ই উত্তরসূরি হোক, যদি সে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তবে তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
অন্যদিকে গতকাল ইরান দাবি করেছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একটি মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। ইরানের আধাসরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম এক সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে। তবে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনো মন্তব্য করেনি। পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটিকে লক্ষ্য করে দুটি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। এর একটি কাতারের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভূপাতিত করলেও অন্যটি সরাসরি আল-উদাইদ মার্কিন বিমানঘাঁটিতে আঘাত হানে। এ ঘাঁটিটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি। কাতার সরকার জানিয়েছে, হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। এছাড়া লেবাননে ইরানি দূতাবাসে কোনো ধরনের হামলা হলে বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের সব দূতাবাসকে নিশানা করে হামলা চালানো হবে বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। বুধবার দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল ফজল শেকারচি এ হুমকি দিয়েছেন।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে গতকাল মার্কিন দূতাবাসের ভেতরে অবস্থিত সিআইএর একটি স্টেশন ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, হামলার সঙ্গে ইরানের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুটি ড্রোন দূতাবাস এলাকায় আঘাত হেনেছে। এতে সীমিত অগ্নিকাণ্ড ও অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে।
আরব উপসাগরে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় পাঁচটি জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) এ কথা জানিয়েছে। সংস্থাটি জানায়, ফুজাইরাহ উপকূলে দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত লেগেছে। এতে জাহাজ দুটির ফানেল ও স্টিলের পাত সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সময় আরেকটি কনটেইনারবাহী জাহাজেও হামলা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে ওমান উপকূল এবং দুবাইয়ের পশ্চিমে আরো দুটি জাহাজের খুব কাছে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
জ্বালানি বাজার পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেপলার জানিয়েছে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা শুরুর পর থেকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি তেলের ট্যাংকার চলাচল ৯০ শতাংশ কমে গেছে।
এদিকে ইসরায়েলি হামলার পর লেবাননে ৬৫ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে নিবন্ধন করেছেন। দেশটির সামাজিক সম্পর্ক বিষয়ক মন্ত্রী হানিন সাঈদ জানিয়েছেন, আরো প্রায় ১০ থেকে ২০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি বলেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং অনেক মানুষের কাছে এখনো পর্যাপ্ত সহায়তা পৌঁছায়নি।
হরমুজ প্রণালির কাছে মাল্টার পতাকাবাহী একটি মালবাহী জাহাজে গতকাল ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলার পর দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালায় ওমানি নৌবাহিনী। ওমান নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, জাহাজটির ২৪ জন ক্রুকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং তারা সবাই সুস্থ আছেন।
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে মার্কিন নৌবাহিনীকে নিজেদের বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দেয়ার অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ডগলাস ম্যাকগ্রেগর কট্টরপন্থী সংবাদমাধ্যম ‘ওয়ান আমেরিকা নিউজ নেটওয়ার্ক (ওএএন)’-এ দাবি করেছিলেন, সংঘাতে মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলো ভারতীয় বন্দর ব্যবহার করে থাকতে পারে। এর প্রতিবাদ জানিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওএএন নামের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চ্যানেলে মার্কিন নৌবাহিনীর ভারতীয় বন্দর ব্যবহারের যে দাবি করা হয়েছে, তা ভুয়া ও মিথ্যা। এ ধরনের ভিত্তিহীন ও বানোয়াট মন্তব্যের ব্যাপারে আমরা আপনাদের সতর্ক করছি। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংকট মোকাবেলায় ফ্রান্স ভূমধ্যসাগরে তাদের বিমানবাহী রণতরি ‘চার্লস দ্য গল’ পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল সুরক্ষিত রাখতে একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠনের চেষ্টা করছে ফ্রান্স।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রেজা তালাই নিক বলেন, ‘যুদ্ধের প্রথম দিনেই আমরা আমাদের সব উন্নত অস্ত্র ব্যবহার করি না। আমাদের সবচেয়ে উন্নত অস্ত্র এখনো ব্যবহার করা হয়নি।’ খামেনির উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবারও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার কোনো ভিত্তি নেই এবং ইরান চাইলে দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে।
দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রও। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার জানিয়েছেন, ইরানে হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ হাজারের বেশি সেনা অংশ নিচ্ছে। এ অভিযানে প্রায় ২০০ যুদ্ধবিমান, দুটি বিমানবাহী রণতরি এবং বোমারু বিমান মোতায়েন করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে ইরানের প্রায় দুই হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এখন পর্যন্ত ইরান সরকারের মালিকানায় থাকা অন্তত ২০টিরও বেশি জাহাজে হামলা বা ডুবিয়ে দেয়ার দাবিও করেছে সেন্টকম।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানে যৌথ অভিযান শুরু করে, তখন তাদের লক্ষ্য ছিল দ্রুত তেহরানের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে যুদ্ধ নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ায় সেই হিসাব এখন নতুন করে করতে হচ্ছে। মাঠের পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, ইরানের শাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি; বরং দেশটি বিভিন্ন ফ্রন্টে পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে সংঘাতটি সীমিত সামরিক অভিযান থেকে ধীরে ধীরে একটি দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।










