যখন প্রাকৃতিক বিপর্যয় বিশেষ করে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে তখন কোনো শহরের বিধ্বস্ত কিংবা ধ্বংসস্তূপের নাটকীয় ছবি তুলতে ছুটে যায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। যে ছবিতে উঠে আসে বিপর্যয়ের ভয়াবহতা। তাইওয়ানের প্রত্যন্ত পূর্ব উপকূলীয় কাউন্টি হুয়ালিয়েনে চিত্র পুরোপুরি আলাদা। ভীতিকর কোণে ঝুঁকে থাকা একটি ভবন ঘিরে রেখেছেন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কর্মীরা। দৃশ্যটি ভয়ংকর। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো ৭ দশমিক ৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত একমাত্র ভবন এটি। অথচ মাত্র কয়েক মিটার দূরে পুরো শহরের চিত্র একদম স্বাভাবিক। দোকানগুলো খোলা, ক্যাফেতেও চলছে মানুষের আড্ডা। রাস্তায় অফিসগামী মানুষের ভিড়। চারদিকের দৃশ্য দেখে কোনোভাবে বোঝার উপায় নেই মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে এখানে আঘাত হেনেছে রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প।

মাত্র বছর খানেক ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিল সিরিয়া ও তুরস্ক। নিহত হয়েছিল ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ। ২০১১ সালে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চেও ৬ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে নিহত হয়েছিলেন ১৮৫ জন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নে উঠেছে উঁচু উঁচু ভবনে ভরা তাইওয়ান ৭ দশমিক ৪ মাত্রার এমন শক্তিশালী ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি প্রতিরোধ করল কীভাবে। এতবার এত ভয়াবহ ভূমিকম্পের মুখে পড়েও কীভাবেইবা নিজেদের রক্ষা করছে দ্বীপরাষ্ট্রটি?

তাইওয়ানে ভূমিকম্প নতুন কিছু নয়। প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘‌রিং অফ ফায়ার’-এ অবস্থিত তাইওয়ান টেকটোনিক প্লেটের কারণে ভূমিকম্পের হটস্পট। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে ২০১৬ সালে ভূমিকম্পে শতাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছিলেন। ২০১৮ সালে আঘাত হেনেছিল ৬ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প। ওই সময় সাতজন নিহত হয়েছিলেন। আর ১৯৯৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ৭ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্পে দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়। এ ভূমিকম্প ‘৯২১ কম্পন’ নামে পরিচিত। ওই ভূমিকম্পের পর দেশটির সরকার সতর্ক হয়। ইমারত বিধিমালায় আমূল পরিবর্তন আসে।

প্রতি বছর ২১ সেপ্টেম্বর দেশটিতে ‘দুর্যোগ মহড়া দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। নাগরিকদের প্রতীকী সতর্কতামূলক খুদে বার্তা পাঠানো হয়। পাশাপাশি স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীদের সরিয়ে নেয়ার মহড়াও দেয়া হয়।

ভবন তৈরিতে এমন উপকরণ ব্যবহার হয়, যেগুলো ভূমিকম্পসহনশীল। দেশটির সরকার নিয়মিত ভবনগুলো পরিদর্শন করে। ভূমিকম্পসহনশীল উপাদান ঠিকঠাক ব্যবহার হচ্ছে কিনা তা পরীক্ষা করে। কেউ আইন অমান্য করলে নেয়া হয় কঠোর ব্যবস্থাও।

ন্যাশনাল তাইওয়ান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইয়ি মিন বলেন, ‘তাইওয়ানে এত বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছে যে দুর্বল ভবনগুলো আর নেই। দুর্নীতিবাজ আবাসন প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তারা শাস্তির আওতায় এসে গেছে।’

এছাড়া ক্ষয়ক্ষতি এড়ানোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ কম্পনপূর্ব সতর্কতা। দ্বীপটির প্রায় সব জায়গায় সেন্সর বসানো আছে। যেগুলোর কারণে আঘাত হানার ২-৮ সেকেন্ড আগে দেশটির নাগরিকদের মুঠোফোনে ও টেলিভিশনে সতর্কতা জারি করা হয়। এছাড়া শহরজুড়ে থাকা নজরদারি ক্যামেরাগুলোই উদ্ধারকর্মীদের জানিয়ে দেয় কোন স্থানে আগে পৌঁছতে হবে। তাইওয়ানের শহর ও কাউন্টিতে ২৪ ঘণ্টা উদ্ধার সেবা রয়েছে। যেকোনো সময় যেকোনো দুর্যোগে তারা কাজ করতে প্রস্তুত।

মিসৌরি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির ভূমিকম্পবিদ ও অধ্যাপক স্টিফেন গাও বলেন, ‘‌তাইওয়ানের ভূমিকম্পের প্রস্তুতি বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত। আসলে ১৯৯৯ সালের ওই ভয়াবহ ভূমিকম্পের পরে দুর্যোগের প্রতিক্রিয়া বুঝে প্রস্তুতি নিতেই হতো তাইওয়ানকে। তারা তাই করেছে।’

সব মিলিয়ে এখানকার মজবুত ঘরবাড়ি, একটি বিস্তৃত সিসমোলজিক্যাল নেটওয়ার্ক ও ভূমিকম্প সুরক্ষার বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা এবং শিক্ষাই বাঁচিয়ে দিচ্ছে তাইওয়ানকে। বিবিসি অবলম্বনে