বৈশ্বিক উষ্ণায়নের তিন ভাগের মধ্যে দুই ভাগের জন্য দায়ী বিশ্বের শীর্ষ ধনী ১০ শতাংশ মানুষ। নেচার ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য দেয়া হয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯০ সালের পর থেকে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী বিশ্বের শীর্ষ ধনী ১০ শতাংশ মানুষ। ধনী ব্যক্তিদের উচ্চমাত্রার নিঃসরণ বিশ্বের দরিদ্র অঞ্চলগুলোতে খরা ও তাপপ্রবাহের মতো চরম জলবায়ু পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। খবর— দ্য গার্ডিয়ান।

গবেষণায় প্রথমবারের মতো বিশ্লেষণ করা হয়েছে, কার্বন নিঃসরণের ক্ষেত্রে আয়ভিত্তিক বৈষম্য কীভাবে বৈশ্বিক জলবায়ু বিপর্যয়ের দায়ে রূপ নিচ্ছে। বলা হয়েছে, ধনী দেশগুলোর নাগরিক, যাদের অনেকেই যুক্তরাজ্যের পূর্ণকালীন কর্মজীবীদের মধ্যেই পড়েন—জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী। ফলে জলবায়ু অর্থায়ন এবং এ খাতে ব্যবহারের জন্য ধনীদের ওপর কর আরোপের পক্ষে এই গবেষণা জোরালো যুক্তি দিচ্ছে।

গবেষণার প্রধান লেখক ও জলবায়ু মডেল বিশ্লেষক সারাহ শ্যোনগার্ট বলেন, ‘চরম জলবায়ু প্রভাব কেবল বিমূর্ত বৈশ্বিক নিঃসরণের ফল নয় বরং তা আমাদের জীবনধারা ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত—যা আবার সম্পদের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ধনী নিঃসরণকারীরা জলবায়ু চরম অবস্থার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে, যা তাদের প্রতি লক্ষ্য করে নিঃসরণ হ্রাসের নীতির পক্ষে শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে।’

গবেষণায় দেখা গেছে, ধনী গোষ্ঠীগুলো তাদের ভোগ ও বিনিয়োগের মাধ্যমে গড়ের চেয়ে অনেক বেশি কার্বন নিঃসরণ করে, অথচ তাদের কর্মকাণ্ডের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে নিরক্ষীয় অঞ্চলের দরিদ্র দেশগুলোর ওপর।

১৯৯০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বিশ্বের তাপমাত্রা ও চরম আবহাওয়ার প্রবণতার সঙ্গে আয়ভিত্তিক নিঃসরণ বৈষম্যের সম্পর্ক নিরূপণে গবেষকরা একটি জলবায়ু মডেল তৈরি করেন। এতে শীর্ষ ১০ শতাংশ, ১ শতাংশ ও শূন্য দশমিক ১ শতাংশ ধনীদের নিঃসরণ বাদ দিয়ে বিকল্প একটি জলবায়ুর চিত্র তুলে ধরা হয়, যা থেকে বোঝা যায় এই গোষ্ঠীগুলো না থাকলে জলবায়ুর অবস্থা কেমন হতো।

গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২০ সালে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ছিল ১৯৯০ সালের তুলনায় শূন্য দশমিক ৬১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি, যার প্রায় ৬৫ শতাংশ দায় শীর্ষ ১০ শতাংশ ধনীদের। এ গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত তারা, যাদের বার্ষিক আয় ৪২ হাজার ৯৮০ ইউরো বা তার বেশি, যা যুক্তরাজ্যের পূর্ণকালীন কর্মজীবীদের গড় আয়ের কাছাকাছি।

এছাড়া, শীর্ষ ১ শতাংশ ধনী—যাদের বার্ষিক আয় ১ লাখ ৪৭ হাজার ২০০ ইউরোর বেশি, তারা দায়ী ২০ শতাংশ উষ্ণায়নের জন্য। যাদের আয় বছরে ৫ লাখ ৩৭ হাজার ৭৭০ ইউরোর বেশি, শীর্ষ শূন্য দশমিক ১ শতাংশ মানুষ দায়ী আরো ৮ শতাংশ উষ্ণায়নের জন্য।

গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ‘শীর্ষ ১০ শতাংশ গড়ের তুলনায় ৬ দশমিক ৫ গুণ বেশি উষ্ণায়নের জন্য দায়ী। শীর্ষ ১ শতাংশ ও শূন্য দশমিক ১ শতাংশ যথাক্রমে ২০ গুণ ও ৭৬ গুণ বেশি দায়ী।’

গবেষণাপত্রের সহলেখক কার্ল ফ্রেডরিশ শ্লুসনার বলেন, ‘যদি সবাই বৈশ্বিক জনসংখ্যার নিম্ন ৫০ শতাংশের মতো নিঃসরণ করত, তাহলে ১৯৯০ সালের পর বিশ্বে খুব সামান্য উষ্ণায়ন হতো। কিন্তু যদি সবাই শীর্ষ ১০ শতাংশ, ১ শতাংশ কিংবা শূন্য দশমিক ১ শতাংশের মতো নিঃসরণ করত, তাহলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার হতো যথাক্রমে ২ দশমিক ৯, ৬ দশমিক ৭ কিংবা একেবারেই বিপর্যয়কর ১২ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।’

গবেষকরা আশা করছেন, এই বিশ্লেষণ এমন নীতিগত উদ্যোগে সহায়ক হবে, যা ধনীদের কার্বন নিঃসরণের দায় স্বীকার করে এবং সমাজে জলবায়ু উদ্যোগের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়।

এই গবেষণা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ দরিদ্র দেশগুলোর জন্য জলবায়ু অর্থায়ন হ্রাস বা বন্ধ করার দিকেই এগোচ্ছে। এমনকি যুক্তরাজ্যসহ কিছু ইউরোপীয় দেশও এই প্রবণতায় শামিল হয়েছে।

শ্লুসনার বলেন, ‘এটি কেবল একাডেমিক আলোচনা নয়—এটি জলবায়ু সংকটের বাস্তব অভিঘাতের প্রশ্ন। যদি জলবায়ু উদ্যোগ ধনীদের অতিরিক্ত দায় স্বীকার না করে, তাহলে আমরা ভবিষ্যতের ক্ষতি রোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হারাব।’