একটি ছবি, একটি বাড়ি বিক্রির বিজ্ঞাপন এবং একটি হারিয়ে যাওয়া শিল্পকর্ম। এই তিনটি বিষয় মিলে জন্ম নিয়েছে এক কাকতালীয় ঘটনার। ৮০ বছর আগে নাৎসিদের হাতে লুট হওয়া একটি ইতালীয় চিত্রকর্মের খোঁজ পাওয়া গেছে আর্জেন্টিনার একটি এস্টেট এজেন্টের ওয়েবসাইটে, একটি বাড়ি বিক্রির বিজ্ঞাপনের ছবিতে! খবর বিবিসি।

গল্পের শুরু ইতালীয় চিত্রশিল্পী জিসেপ্পে গিসলান্ডির আঁকা ‘পোর্ট্রেট অব আ লেডি’ নামের একটি অসাধারণ তৈলচিত্র দিয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমস্টারডামের ইহুদি শিল্প ব্যবসায়ী জ্যাক গডস্টিক্কারের কাছ থেকে এটি লুট করে নাৎসিরা।

সম্প্রতি, আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসের কাছে একটি বাড়ির বিক্রির বিজ্ঞাপনে চোখ পড়তেই হয়তো থমকে গেছেন কিছু মানুষ। কারণ, বিজ্ঞাপনের ছবিতে দেখা যাচ্ছে বাড়ির ভেতরের একটি সোফার ওপর সেই ঐতিহাসিক চিত্রকর্মটি ঝুলছে। এই বাড়িটি একসময় একজন উচ্চপদস্থ নাৎসি কর্মকর্তার ছিল, যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দক্ষিণ আমেরিকায় চলে যান।

ডাচ সংবাদপত্র এডি-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই নাৎসি কর্মকর্তার মেয়ে যখন তার বাবার বাড়িটি বিক্রির জন্য বিজ্ঞাপন দেন, তখনই শিল্পকর্মটি নজরে আসে। এটি মূলত হারিয়ে যাওয়া যুদ্ধকালীন শিল্পকর্মের একটি ডাটাবেসে তালিকাভুক্ত ছিল।

জ্যাক গডস্টিক্কারের সংগ্রহ থেকে প্রায় ১১০০টিরও বেশি শিল্পকর্ম জোর করে বিক্রি করে দেয়া হয়েছিল। তার মৃত্যুর পর নাৎসি নেতা রাইখসমার্শাল হেরমান গোরিং-এর মতো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এগুলো কিনে নেন। গডস্টিক্কার নেদারল্যান্ডস থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় দুর্ঘটনায় সমুদ্রে মারা যান এবং তাকে ইংল্যান্ডে সমাহিত করা হয়।

যুদ্ধের পর কিছু শিল্পকর্ম জার্মানিতে উদ্ধার করা হয় এবং আমস্টারডামের রাইক মিউজিয়ামে ডাচ জাতীয় সংগ্রহের অংশ হিসেবে প্রদর্শন করা হয়। ২০০৬ সালে গডস্টিক্কারের একমাত্র জীবিত উত্তরাধিকারী, তার পুত্রবধূ মারেই ফন সাহের ২০২টি শিল্পকর্মের মালিকানা ফিরে পান। কিন্তু গিসলান্ডির আঁকা ‘পোর্ট্রেট অব আ লেডি’ এতদিন পর্যন্ত নিখোঁজ ছিল।

এডি-এর তদন্তে উঠে আসে কিছু যুদ্ধকালীন নথি। এসব নথি থেকে জানা যায়, ছবিটি ছিল এসএস অফিসার এবং গোরিং-এর আর্থিক সহায়তাকারী ফ্রিডরিখ কাডগিয়েনের দখলে। কাডগিয়েন ১৯৪৫ সালে সুইজারল্যান্ড এবং পরে ব্রাজিল হয়ে আর্জেন্টিনায় চলে যান। সেখানে তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন।

এডি সংবাদপত্রটি গত কয়েক বছর ধরে কাডগিয়েনের দুই মেয়ের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেও সফল হয়নি। অবশেষে, কাডগিয়েনের এক মেয়ে যখন তাদের বাবার বাড়িটি একজন এস্টেট এজেন্টের মাধ্যমে বিক্রির জন্য বিজ্ঞাপন দেন, তখন সাংবাদিকদের ভাগ্য খুলে যায়।

নেদারল্যান্ডসের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংস্থার অ্যানেলিস কুল এবং পেরি শ্রিয়ার ছবিগুলো পর্যালোচনা করে বলেন, ‘এই ছবিটিকে অনুলিপি ভাবার কোনো কারণ নেই।‘

ছবিটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে ওই দুই বোনের সঙ্গে কথা বলার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। একজন তো সংবাদপত্রটিকে সরাসরি বলেছেন, ‘আমি জানি না আপনি কী তথ্য চান এবং আপনি কোন ছবির কথা বলছেন।‘

গডস্টিক্কারের পরিবারের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তারা ছবিটি পুনরুদ্ধার করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন। ফন সাহের বলেন, ‘আমার পরিবারের লক্ষ্য হলো জ্যাকের সংগ্রহ থেকে চুরি হওয়া প্রতিটি শিল্পকর্ম ফিরিয়ে আনা এবং তার ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করা।‘