বিশ্বের গাড়ির রাজধানী হিসেবে খ্যাত যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান রাজ্য। আর রাজ্যের ডেট্রয়েট শহরেকে বলা হয় ‘মোটর সিটি’। এখানেই ফোর্ড, জেনারেল মোটরস ও ক্রাইসলারের মতো কোম্পানিগুলোর উৎপত্তি। কিন্তু রাজ্যের উত্তর উপকূলে হিউরন হ্রদের তীরের ছোট্ট ম্যাকিনাক দ্বীপের চিত্র একদমই ভিন্ন।
এই দ্বীপের বিশেষত্ব এখানে গাড়ি নিষিদ্ধ। শান্ত, মনোরম ম্যাকিনাক দ্বীপ তাই পর্যটকদের পছন্দের গন্তব্য। আয়তনে মাত্র ৩ দশমিক ৮ বর্গকিলোমিটার। এখানে বাস করে প্রায় ৬০০ জন মানুষ, আছে প্রায় সমসংখ্যক ঘোড়াও। আধুনিকতা থেকে দূরে এক চিরায়ত জীবনযাপন এখনো টিকে আছে ম্যাকিনাক দ্বীপে। যেখানে ঘোড়ার খুরের শব্দই একমাত্র যানবাহনের সুর।
স্থানীয় লোককথা অনুসারে, ১৮৯৮ সালে একটি গাড়ি আচমকা শব্দ করে ঘোড়াদের ভয় পাইয়ে দেয়। তখন থেকেই দ্বীপে অভ্যন্তরীণ স্টিম ইঞ্জিনচালিত যানের প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়। পরে এই নিয়মই হয়ে ওঠে দ্বীপের চিরন্তন ঐতিহ্য। ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে ডাকপত্র বিলি হয়, বর্জ্য অপসারণ হয়। এমনকি ঘোড়ার টানায় ফেডএক্সর-এর পার্সেলও পৌঁছে যায় নির্দিষ্ট ঠিকানায়।
প্রতি বছর গ্রীষ্মকালে প্রায় ১২ লাখ মানুষ এই দ্বীপটিতে ভ্রমণ করতে আসে। তারা আসে দ্বীপের বিখ্যাত ফাজ খেতে। ৭০ মাইলের ট্রেইলে হাঁটতে বা সাইকেল চালাতে। কেউ কেউ ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে দেখে আর্ক রক। আর্ক রক ৫০ ফুট চওড়া প্রাকৃতিক চুনাপাথরের খিলান, যেটি দ্বীপের প্রতীকস্বরূপ। ঘোড়া ছাড়াও সাইকেলও দ্বীপবাসীদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। প্রায় দেড় হাজার সাইকেল রয়েছে ভাড়ার জন্য।
পর্যটনকে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে উঠেছে অনেক হোটেল। ১৮৮৭ সালে গড়ে ওঠা গ্র্যান্ড হোটেল আজও দাঁড়িয়ে আছে। যার প্রতিটি ঘর আলাদাভাবে সাজানো। প্রচলিত আছে, বিশ্বের দীর্ঘতম বারান্দাটিও এই হোটেলেরই। গ্রীষ্মের শুরুতে আয়োজিত হয় ১০ দিনের লিলাক ফেস্টিভাল, তখন দ্বীপের পথঘাট ভরে ওঠে বেগুনি ফুলের সুগন্ধে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও শান্তভাব ম্যাকিনাক দ্বীপের আসল আকর্ষণ। অতীতের ছায়ায় গড়া এক বর্তমান, যেখানে সময় যেন একটু ধীরে চলে। গাড়ির শব্দ নেই, ধোঁয়া নেই, শুধু ঘোড়ার খুরের শব্দ আর লেক হিউরনের হাওয়া।
দ্বীপটি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধারই নয়, বরং এক গৌরবময় ইতিহাসের ধারক। এই দ্বীপের সবচেয়ে প্রাচীন পরিচয় পাওয়া যায় অনিশিনাবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে। তারা দ্বীপটিকে ডাকত ‘মিচিলিম্যাকিনাক’ নামে, যার অর্থ ‘মহাকচ্ছপের স্থান’। তাদের বিশ্বাস, দ্বীপটির সবুজ বন আর উঁচু চুনাপাথরের ঢাল এক বিশাল কচ্ছপের আকারের মতো—পানির বুক চিরে যেন সে উঠে এসেছে।
এই দ্বীপে এখনও দেখা মেলে হাজার বছরের পুরনো আদিবাসী কবরস্থান আর সাংস্কৃতিক নিদর্শনের। দ্বীপের ইতিহাসকে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দিতে অনিশিনাবে সদস্য এরিক হেমেনওয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তার চেষ্টাতেই ২০২১ সালে চালু হয় ম্যাকিনাক দ্বীপ নেটিভ আমেরিকান মিউজিয়াম। তিনি বলেন,
‘এই দ্বীপ আমাদের পূর্বপুরুষদের জন্য এক পবিত্র স্থান। লেক হিউরন আর লেক মিশিগানের সংযোগস্থলে থাকা এই জলপথগুলোই ছিল আমাদের মূল যোগাযোগ মাধ্যম—আমাদের মহাসড়ক।’










