রোমান সভ্যতার ইতিহাসের পুনর্পাঠ আবারো প্রাসঙ্গিক হলো নতুন এক আবিষ্কারে। লন্ডনের একটি অফিসের বেজমেন্টে প্রাচীন শহরের প্রথম ব্যাসিলিকা বা সরকারি ভবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ খুঁজে পেয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা। এটি প্রায় ২ হাজার বছরের পুরনো একটি সরকারি ভবন, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেয়া হতো। ধারণা করা হচ্ছে, এটি প্রাচীন রোমান লন্ডনের প্রথম ভবন। আর এ আবিষ্কার থেকে নতুন করে দেখা যেতে পারে কীভাবে হয়েছিল লন্ডন শহরের সূচনা। খবর বিবিসি।

রোমান লন্ডন বা লন্ডিনিয়াম শহরটির গোড়াপত্তন কীভাবে হয়েছিল, কীভাবে শহরটি রোমান লন্ডনের রাজধানী হয়েছিল এবং লন্ডন শহরের সূচনার গল্প— এরকম বেশ কিছু ব্যাপারে নতুন করে আলোকপাত করছে এ আবিষ্কার। লন্ডনের প্রাণকেন্দ্রে ৮৫ গ্রেসচার্চ স্ট্রিটে অবস্থিত একটি অফিসের বেজমেন্টে এখন চলছে খননকাজ। সেখানে অফিস ভবনটি ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। খননকাজে এখন পর্যন্ত ব্যাসিলিকার ভিত্তি গঠনের জন্য নির্মিত পাথরের প্রাচীরের কিছু অংশ উন্মোচিত হয়েছে। এই ভবনটি প্রায় আড়াই তলা উচ্চতার ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

rl 2

লন্ডনের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমওএলএ-এর পক্ষ থেকে বিবিসি নিউজকে এই আবিষ্কারের তথ্য জানিয়েছেন সোফি জ্যাকসন। তিনি বলেন, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—এটি রোমান লন্ডনের কেন্দ্র। ভবনটি আমাদের লন্ডনের উৎপত্তি সম্পর্কে অনেক কিছু বলবে, কেন লন্ডন সম্প্রসারিত হয়েছিল এবং কেন এটি ব্রিটেনের রাজধানী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল। এটি সত্যিই অবিশ্বাস্য!

এর আগেও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় ব্যাসিলিকার আনুমানিক অবস্থান চিহ্নিত করা হয়েছিল। তাই গবেষক দল কংক্রিটের মেঝের নিচে কী রয়েছে তা খুঁজতে বেশ কয়েকটি ছোট গর্ত তৈরি করেছিল। তৃতীয় প্রচেষ্টায়, ফাইলিং ক্যাবিনেটের মাঝখানে খনন করতে গিয়ে তারা সফল হন।

‘আপনি এখানে বিশাল একটি রোমান প্রাচীরের অংশ দেখতে পাবেন, এবং এটি এখনো এত ভালো অবস্থায় রয়ে গেছে যা সত্যিই অবিশ্বাস্য। আমরা অত্যন্ত আনন্দিত যে এখানে এত কিছু খুঁজে পাওয়া গেছে,’ বলেছেন সোফি জ্যাকসন।

rl 3

প্রাচীরটি কেন্টের চুনাপাথর দিয়ে তৈরি

আবিষ্কৃত প্রাচীরটি কেন্টের চুনাপাথর দিয়ে তৈরি। বেশ উঁচু একটি ভবনের অংশ ছিল এটি। ব্যাসিলিকার দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৪০ মিটার, প্রস্থ ২০ মিটার এবং উচ্চতা ১২ মিটার। এছাড়া অন্যান্য নিদর্শনও পাওয়া গেছে— যার মধ্যে রয়েছে একটি ছাদের টাইল, যেখানে প্রাচীন শহরের একজন কর্মকর্তার সিলমোহর পাওয়া গেছে।

লন্ডনের ফোরামের অংশ ছিল এই ব্যাসিলিকা, ছিল একটি সামাজিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র— যেখানে ফুটবল মাঠের সমান বড় বিশাল খোলা আঙিনার অস্তিত্বও পাওয়া গেছে।

সোফি জ্যাকসন ব্যাখ্যা করে বলেন, ব্যাসিলিকাটি ছিল মূলত টাউন হল, আর এর সামনেই ছিল একটি বড় বাজার চত্বর। সেখানে বিভিন্ন দোকান ও অফিস ছিল। এটি এমন একটি জায়গা ছিল যেখানে মানুষ ব্যবসা করত, আদালতের মামলা পরিচালনা করা হতো। আইন প্রণয়নও করা হতো এখানে। শুধু লন্ডন নয়, গোটা দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হতো এখান থেকে। এটি নির্মিত হয়েছিল আনুমানিক ৮০ খ্রিস্টাব্দে, যখন রোমানরা ব্রিটেনে আগ্রাসন চালিয়ে লন্ডিনিয়াম (রোমান লন্ডনের নাম) প্রতিষ্ঠা করেছিল।

কিন্তু এই প্রথম ব্যাসিলিকা এবং ফোরাম ব্যবহৃত হয়েছিল মাত্র ২০ বছর। এরপর এগুলো ধ্বংস করে আরো বড় একটি ফোরাম তৈরি করা হয়। এ থেকে শহরের দ্রুত সম্প্রসারণ এবং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার ইঙ্গিতও পাওয়া যায়।

এই আবিষ্কারের ফলে ভবনটির মালিক হার্শটেন প্রপার্টিজ তাদের পরিকল্পনায় পরিবর্তন এনেছে। রোমান নিদর্শনগুলো এখন সম্পূর্ণভাবে খনন করা হবে এবং নগর পরিকল্পনা সংস্থা অনুমোদন করলে নতুন অফিস ভবনের অংশ হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে। জনসাধারণের জন্য এটিকে উন্মুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

rl 4

রোমান ফোরামের পেছনে ছিল এ ব্যাসিলিকা

স্থাপত্যবিদদের জন্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণের মধ্যে দিয়ে একটি নতুন ভবন তৈরি করা কিছু প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। পরিকল্পনাটি পুরোপুরি নতুনভাবে সাজানো হয়েছে বলে জানান স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান উডস ব্যাগট-এর জেমস টেলর। তিনি বলেন, ভবনের স্তম্ভগুলোর অবস্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে, যাতে মাটির নিচে পাওয়া এই মূল্যবান নিদর্শনগুলোর ক্ষতি না হয়।

এছাড়াও, ভূগর্ভস্থ কাঠামো অক্ষত রাখার জন্য লিফটের সংখ্যা কমাতে হয়েছে, ফলে ভবনের উচ্চতাও কিছুটা কমাতে হচ্ছে। তবে টেলর মনে করেন, এই প্রচেষ্টা সার্থক হবে। তিনি বলেন, মানুষ যখন এই স্থানটি ব্যবহার করবে, জনসাধারণের হলে চলাফেরা করবে এবং নিচে নেমে রোমান নিদর্শন দেখবে, এটি সত্যিই এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা হবে।

এটি লন্ডনের কয়েক বর্গমাইল এলাকার নিচে লুকিয়ে থাকা সর্বশেষ রোমান নিদর্শনগুলোর একটি। এসব প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান জনগণের সামনে উন্মুক্ত করার জন্য নতুন নতুন পদ্ধতি অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

সিটি অব লন্ডন করপোরেশনের ক্রিস হেওয়ার্ড চান, আরো বেশি মানুষ অতীত ও বর্তমানের সংযোগ অনুভব করুক। তিনি বলেন, আপনার পায়ের নিচে রোমান লন্ডন রয়েছে—এই সত্যটি অনুভব করাটাই এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। আপনি এখানে দাঁড়িয়ে রোমান লন্ডনের চিত্র কল্পনা করতে পারেন, আর বাইরে গিয়ে বিশাল আকাশচুম্বী ভবন ও আধুনিক অফিস ব্লক দেখবেন—এটিই উন্নয়ন। আর আমরা সংরক্ষণের প্রতিও প্রতিশ্রুতিশীল।