কানাডার জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতাসীন লিবারেল পার্টি জয়ী হয়েছে। নির্বাচনে পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও মার্ক কার্নির নেতৃত্বে লিবারেলরা পার্লামেন্টে সর্বোচ্চ আসন পেয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। বিজয় নিশ্চিতের পর দলটির নতুন নেতা ও প্রধানমন্ত্রী কার্নি এক প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্পবিরোধী আন্তর্জাতিক জোট গঠনের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

ভোটে লিবারেল পার্টি ৩৪৩টি আসনের মধ্যে ১৬৮টিতে জয়লাভ করে, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ১৭২ আসনের চেয়ে চারটি কম। ফলে তারা একটি সংখ্যালঘু সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টি পেয়েছে ১৪৪টি আসন।

এ নির্বাচনে কার্নির বিজয় কানাডার রাজনীতিতে এক নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মাত্র চার মাস আগে পর্যন্ত লিবারেলদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত দেখাচ্ছিল। কার্নির নির্বাচনী প্রচারণার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিমালার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ ও বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতি অঙ্গীকার।

বিজয়ী ভাষণে কার্নি বলেন, ‘আমরা এমন একটি জোট গড়তে প্রস্তুত যারা আমাদের মতো মূল্যবোধ ধারণ করে। যদি আমেরিকা নেতৃত্ব দিতে না চায়, তবে কানাডা প্রস্তুত।’ এ ঘোষণাকে অনেকেই ট্রাম্পবিরোধী বৈশ্বিক নেতৃত্বের সম্ভাব্য সূচনা হিসেবে দেখছেন।

কার্নি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমাদের ভাঙতে চাইছেন, যাতে আমেরিকা আমাদের দখল নিতে পারে।’

নির্বাচনে কার্নির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন কনজারভেটিভ নেতা পিয়েরে পলিয়েভ্রে, যিনি ‘কানাডা ফার্স্ট’ স্লোগান নিয়ে প্রচার চালান, যার বক্তব্য ও আচরণ ট্রাম্পের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছিল। অনেক বিশ্লেষকের মতে, তার পরাজয়ের অন্যতম কারণ এ তুলনা। এমনকি পলিয়েভ্রেকে তার নিজের আসনেও পরাজিত হতে হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকার হিসেবে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড ও ব্যাংক অব কানাডার অভিজ্ঞতা কার্নিকে আন্তর্জাতিকভাবে আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতার প্রতীক করেছে। তার নেতৃত্বে কানাডা ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের মতো গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানো যায়।

তবে কার্নি এখনো পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেননি। ফলে তার সরকারকে ছোট দলগুলোর সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হবে, যা নীতিগত ও কূটনৈতিক কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশ্বরাজনীতিতে ট্রাম্পের প্রভাব নিয়ে তৈরি হওয়া অস্থিরতা অন্য দেশেও প্রতিফলিত হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ায় আসন্ন নির্বাচনে ডানপন্থী নেতা পিটার ডাটনের জনপ্রিয়তা কমেছে, আর হাঙ্গেরিতেও ট্রাম্পঘনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের অবস্থান দুর্বল হচ্ছে। যুক্তরাজ্যে লেবার পার্টির নেতা কেয়ার স্টারমার এখনো ট্রাম্পের প্রতি নরম থাকলেও জনমতের চাপে দৃঢ় অবস্থানের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

তবে সব বিশ্লেষক মনে করেন না যে কার্নি একজন বৈশ্বিক নেতা হিসেবে মেরকেল বা মাখোঁর মতো অবস্থান নিতে পারবেন। কানাডার দুর্বল সামরিক ব্যয়, অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও বিশ্বমঞ্চে আগের অবস্থান হারানোর কারণে তার পথ সহজ হবে না।

তবু কার্নি এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিচ্ছেন যখন কানাডা জি৭ প্রেসিডেন্সি ধারণ করছে। তিনি এ প্লাটফর্ম ব্যবহার করে জুনে আলবার্টায় ট্রাম্প ও মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বাণিজ্য বৈঠক আয়োজনের পরিকল্পনা করছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক রিচার্ড জনস্টন বলেন, ‘এ নির্বাচনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—ট্রাম্পীয় রাজনীতির ছায়া থেকে মুক্ত না হলে জেতা কঠিন।’