ওয়াল স্ট্রিটে সোমবারের বড় উত্থানের পর এশিয়ার শেয়ারবাজারেও গতকাল দেখা গেছে চাঙ্গাভাব। চীনসহ এখানকার বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর অধিকাংশেই প্রধান প্রধান সূচকে দেখা গেছে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা। চীন-মার্কিন বাণিজ্য উত্তেজনা প্রশমনের সম্ভাবনা ও যুক্তরাষ্ট্রে সুদহার কমানোর প্রত্যাশা এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। খবর এপি ও রয়টার্স।

এশিয়া-প্যাসিফিকের বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর মধ্যে চীনের মূল ভূখণ্ডের প্রধানতম শেয়ার সূচক সাংহাই কম্পোজিট বেড়েছে ১ দশমিক ৩ শতাংশ। হংকংয়ের হ্যাংসেং সূচক বেড়েছে ৬৫ শতাংশ। দক্ষিণ কোরিয়ায় কসপি সূচক বেড়েছে দশমিক ২ শতাংশ। অস্ট্রেলিয়ার এসঅ্যান্ডপি/এএসএক্স ২০০ সূচক বেড়েছে দশমিক ৭ শতাংশ। তাইওয়ানের তাইএক্স সূচকও বেড়েছে দশমিক ২ শতাংশ। দশমিক ৫৬ শতাংশ বেড়েছে ভারতের বিএসই সেনসেক্স সূচক।

এছাড়া জাপানের শেয়ারবাজারও এখন বেশ ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছে। দেশটিতে প্রণোদনার মাধ্যমে অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়ার নীতির সমর্থক হিসেবে পরিচিত সানায়ে তাকাইচির প্রধানমন্ত্রিত্বের পথের অন্তরায়গুলো এখন অনেকটাই দূর হয়েছে। এতে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিনিয়োগের চাহিদাও বেড়েছে। এর প্রভাবে গতকাল টোকিওর নিক্কেই ২২৫ সূচক ৫০ হাজার পয়েন্টের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। পরে সূচকটি কিছুটা কমে দিনের শেষে ৪৯ হাজার ৩১৬ দশমিক শূন্য ৬ পয়েন্টে স্থির হয়। সারা দিনে সূচকটি বেড়েছে দশমিক ২৭ শতাংশ।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, তাকাইচি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিলে জাপানে বাজারবান্ধব নীতিই অগ্রাধিকার পাবে। কম সুদহার ও সরকারি ব্যয় বাড়ানোর মাধ্যমে বিনিয়োগ আকর্ষণের নীতি গ্রহণের সমর্থক হিসেবে পরিচিতি রয়েছে সানায়ে তাকাইচির। ব্যাংক অব জাপানের শিথিল মুদ্রানীতির পক্ষে তার অবস্থান ইয়েনের বিনিময় হারকে কিছুটা অবমূল্যায়িতও রাখতে পারে। সেক্ষেত্রে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টা কিছুটা কঠিন হয়ে ওঠার শঙ্কাও রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন-মার্কিন বাণিজ্য উত্তেজনা প্রশমনের সম্ভাবনা বাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি আশা করছেন দক্ষিণ কোরিয়ায় আগামী সপ্তাহে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে একটি ন্যায্য বাণিজ্যচুক্তি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে তিনি তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে সংঘাতের ঝুঁকিও কম বলে মনে করছেন।

চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা চলতি সপ্তাহেই পরবর্তী পাঁচ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনা নির্ধারণে বৈঠকে বসছেন। এ বৈঠক ও দুই দেশের আলোচনার অগ্রগতি বৈশ্বিক পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করেছে। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দুষ্প্রাপ্য খনিজ সরবরাহ চুক্তিও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বর্তমান অচলাবস্থা কেটে যাওয়ার প্রত্যাশা বাড়িয়েছে।

এর আগে ওয়াল স্ট্রিটে গত সোমবার প্রধান তিনটি সূচকই উর্ধ্বমুখী ধারায় দিন শেষ করে। ওইদিন এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক বেড়েছে ১ দশমিক ১ শতাংশ। এটি চলতি মাসের শুরুর দিকে গড়া সর্বোচ্চ রেকর্ডের মাত্র দশমিক ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট নিচে অবস্থান করছে। ডাও জোনস ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ বেড়েছে ১ দশমিক ১ শতাংশ ও নাসডাক কম্পোজিট বেড়েছে ১ দশমিক ৪ শতাংশ।

নিউইয়র্কে এদিনও প্রযুক্তি খাতের শেয়ারদরে উল্লেখযোগ্য মাত্রার ঊর্ধ্বমুখিতা দেখা গেছে। অ্যাপলের শেয়ারদর বেড়েছে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ, যা কোম্পানিটির ইতিহাসে একদিনে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কোম্পানিটিকে নিয়ে প্রত্যাশা বাড়িয়েছে আইফোনের নতুন মডেল। অ্যাপলের শেয়ারমূল্য বৃদ্ধি এদিন এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের উত্থানের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে বলে জানান বিশ্লেষকরা।

বাজারে ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ক্লিভল্যান্ড-ক্লিফসের শেয়ারমূল্য বেড়েছে ২১ দশমিক ৫ শতাংশ। কোম্পানির প্রধান নির্বাহী লরেঙ্কো গনজালভেস বলেছেন, বড় একটি আন্তর্জাতিক ইস্পাত নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ক্লিভল্যান্ড-ক্লিফসের সম্ভাব্য অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা চলছে। এতে কোম্পানির মুনাফা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান ও মিনেসোটায় তাদের অনুসন্ধান কার্যক্রমে দুষ্প্রাপ্য খনিজের উপস্থিতির সম্ভাব্য চিহ্নও পাওয়া গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক ব্যাংক খাতে কয়েকটি খেলাপি ঋণের খবর গত সপ্তাহে শেয়ারবাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছিল। তবে এবার পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। বড় কোম্পানিগুলোর আসন্ন আয় প্রতিবেদন প্রকাশের আগে বিনিয়োগকারীরা আবার ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে বিনিয়োগ বাড়িয়েছেন। চলতি সপ্তাহে কোকা-কোলা, টেসলা ও প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বলের মতো কোম্পানির প্রান্তিক ফল প্রকাশ হওয়ার কথা রয়েছে।

এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক গত কয়েক মাসে এপ্রিলের নিম্নস্তর থেকে প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। ফলে মার্কিন শেয়ারবাজারে অর্থপ্রবাহও বেড়েছে। বিনিয়োগকারীরা আশা করছেন, প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা বিভিন্ন কোম্পানির আয় প্রতিবেদন এ উত্থানকে টেকসই করবে।

এদিকে দীর্ঘ সরকারি অচলাবস্থার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক তথ্য প্রকাশ বিলম্ব হয়েছে। এতে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) কাজও কঠিন হয়ে পড়েছে। সংস্থাটি এখন মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে। ফেড কর্মকর্তারা আগেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে তারা আরো কয়েক দফা সুদহার কমানোর কথা ভাবছেন। তবে তা পরিমিতভাবে না কমানো হলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে সেপ্টেম্বরের মূল্যস্ফীতিসংক্রান্ত হালনাগাদ প্রতিবেদন শুক্রবার প্রকাশ হবে। এটি মাসের শুরুতেই প্রকাশ হওয়ার কথা ছিল। এ প্রতিবেদন সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধাভোগীদের জন্য ব্যয়ভিত্তিক সমন্বয়ের হিসাব নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এদিকে ওয়াশিংটনে অচলাবস্থা অব্যাহত থাকায় মার্কিন সরকার জানিয়েছে, নিয়মিত সেবা পুনরায় চালু না হওয়া পর্যন্ত অন্য কোনো অর্থনৈতিক তথ্য প্রকাশ করা হবে না।

মুদ্রাবাজারে গতকাল ডলারের বিনিময় হার সামান্য বেড়েছে। এদিন প্রতি ইউরোর বিনিময় হার দাঁড়িয়েছে ১ ডলার ১৬ দশমিক ৩৩ সেন্টে।