সুদানের চলমান গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করতে গিয়ে গ্রিসে পা রাখা শত শত তরুণ শরণার্থী এখন মানবপাচারকারীর অভিযোগে কারাগারে। ভুক্তভোগী হয়েও কঠোর আইনের ফাঁদে পড়ে নিরীহ মানুষগুলো ১৫ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত হচ্ছেন। খবর গার্ডিয়ান।
১৯ বছর বয়সী স্যামুয়েল তাদেরই একজন। সুদানের জেনেইনা শহরে সংঘটিত নৃশংস হত্যাযজ্ঞের পর তিনি প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যান। যেখানে কয়েক হাজার মানুষ নিহত ও ১ কোটি ৩০ লক্ষেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। অনেক কষ্টে লিবিয়ায় পৌঁছে ১২ হাজার লিবিয়ান দিনার দিয়ে এক পাচারকারীর মাধ্যমে সমুদ্রপথে ইউরোপে পাড়ি দেওয়ার ব্যবস্থা করেন স্যামুয়েল। তবে পাচারকারী দলটির পক্ষ থেকে শর্ত ছিল, স্যামুয়েলকে নৌকাটি চালাতে হবে। অথচ তিনি জানেন না কীভাবে নৌকা চালাতে হয়, এমনকি সাঁতারও জানেন না। স্যামুয়েলের ভাষায়, ‘চালালে বাঁচতাম, না চালালে ওরা মেরে ফেলত।’
যাত্রাপথে নৌকাটি গ্রিসের কোস্টগার্ডের হাতে পড়ে যায়। সেসময় স্যামুয়েলকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয় অ্যাভলোনা যুব কারাগারে। সেখানে আরও প্রায় ৫০ জন সুদানি তরুণ বন্দি রয়েছ। যারা অধিকাংশই আইনজীবি বা মানবাধিকার কর্মী। যুদ্ধ শরণার্থী হিসেবে আশ্রয়েল আশায় ইউরোপে পাড়ি জমিয়ে ছিলেন তারা। তবে গ্রীক দ্বীপ ক্রেটে পৌঁছানোর পর আটক হয়ে অভিবাসী পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন তারা।
গ্রিসে ২০১৪ সালে কার্যকর হওয়া মানবপাচার বিরোধী আইন অনুসারে, যেকোনো ব্যক্তি যদি অবৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে (যেমন নৌকা চালানো) তবে তাকে পাচারকারী হিসেবে বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদী সাজা দেওয়া হয়। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠন ও আইনজীবীরা বলছেন, এই আইনের ফাঁদে পড়ে প্রকৃত পাচারকারীরা রেহাই পায়, আর শরণার্থীরা হয়ে পড়ে অপরাধী।
স্যামুয়েলের আইনজীবী স্পাইরোস পান্তাজিস বলেন, ‘এটা এক ধরনের আইনি ফাঁদ, যা শুধুই নিরীহ শরণার্থীদের শাস্তি দিচ্ছে। আসল পাচারকারীরা তো নৌকায় থাকেই না’। তিনি আরো বলেন, মামলায় কোনো ভিডিও, ডিজিটাল প্রমাণ বা আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ নেই। সাক্ষীরা আদালতে হাজিরও হবেন না, ফলে স্যামুয়েল নিজের পক্ষে কিছু বলার সুযোগ পাচ্ছেন না।
সুদানের যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা আরেক তরুণ, জাস্টিন অ্যাঙ্গুই। যিনি নিজের চোখের সামনে বাবাকে খুন হতে দেখেছেন, তাকেও দোষী সাব্যস্ত করে জেলে পাঠানো হয়েছে। তিনি এখন তার বিরুদ্ধে রায় পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করেছেন।
২০২৫ সালের শুরু থেকে আফ্রিকা থেকে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপে শরণার্থীদের আগমন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, গত এক বছরে কেবল ক্রিটেই আগমন বেড়েছে ছয় গুণ। সুদানি শরণার্থীরা এখন গ্রিসে চতুর্থ বৃহত্তম আবেদনকারী গোষ্ঠী। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তরুণদের বিরুদ্ধে মানবপাচারের মামলা জাতিসংঘের শরণার্থী ও মানবপাচার বিরোধী প্রটোকলের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।










