ইসরায়েল ও ইরান একে অন্যের ভূমিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রেখেছে। গতকাল ও শুক্রবার রাতভর এ হামলায় জেরুজালেম, তেল আবিব ও তেহরান বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে। এদিকে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। গতকাল উভয় দেশের পক্ষ থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরবর্তী পারমাণবিক আলোচনা বাতিল হয়েছে বলে জানিয়েছেন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাঈদি। আজ ওমানের মাসকটে এ বৈঠক হওয়ার কথা ছিল।

জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের দূত জানিয়েছেন, শুক্রবার ইসরায়েলি হামলায় ৮০ জন নিহত এবং অন্তত ৩২০ জন আহত হয়েছেন, যাদের বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক। আর ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের দাবি, ইরানের ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে ইসরায়েলের অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন। এছাড়া ইসরায়েলের তিনটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে ইরান। পাশাপাশি দুজন ইসরায়েলি পাইলটকে আটক করারও দাবি করেছে দেশটি। এদিকে সংঘাত থামাতে দুই দেশের নেতার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি রাশিয়াকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রস্তাব দিয়েছেন। খবর বিবিসি, এপি, তেহরান টাইমস ও দ্য টাইমস অব ইসরায়েল।

এপি ও বিবিসির খবরে বলা হয়, গতকাল এক বিবৃতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘আজ (শনিবার) সকালে প্রেসিডেন্ট পুতিন আমাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে ফোন করেছিলেন। তবে আরো গুরুত্বপূর্ণভাবে ইরান নিয়ে তিনি কথা বলেন। আমরা দীর্ঘ সময় এ নিয়ে আলোচনা করেছি।’

এদিকে পুতিনের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ জানিয়েছেন, ভ্লাদিমির পুতিন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান পরিস্থিতি এবং ইউক্রেন শান্তি আলোচনা নিয়ে ৫০ মিনিট ফোনে কথা বলেন। কথোপকথনের সময় পুতিন ইরান ও ইসরায়েলের নেতাদের সঙ্গে তার সাম্প্রতিক আলোচনা সম্পর্কে ট্রাম্পকে অবহিত করেন এবং ইরানের পারমাণবিক ইস্যুতে পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য সমাধান খোঁজার জন্য রাশিয়ার প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করেন।

পুতিন ও ট্রাম্পের মধ্যে কথোপকথনের পর উশাকভ সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের নিন্দা জানিয়ে সংঘাতের সম্ভাব্য তীব্রতা সম্পর্কে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পুতিন। মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতির জন্য সম্ভাব্য অপ্রত্যাশিত পরিণতি সম্পর্কেও সতর্ক করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট।

এদিকে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর শহর বন্দর আব্বাসে ইসরায়েল হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে কাজ করছে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এছাড়া ইসরায়েলি হামলার পর ইরানের বুশেহর প্রদেশের একটি গ্যাস শোধনাগার ও গ্যাসক্ষেত্রে আগুন লেগেছে বলে জানিয়েছে ইরানের তেল মন্ত্রণালয়। ইরানের তেল মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির বরাত দিয়ে দেশটি তাসনিম নিউজ এজেন্সির খবরে বলা হয়, ঘটনার পর তেল খাতের জরুরি বাহিনীর দ্রুত ও সময়োচিত ভূমিকায় আগুন নিয়ন্ত্রণ আসে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরবর্তী পারমাণবিক আলোচনা ওমানের মধ্যস্থতায় চলছিল। তবে ইসরায়েল ইরানের হামলা চালানোর পর এ আলোচনা বাতিল হয়ে গেছে। এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেয়া বার্তায় ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘রোববার মাসকটে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বৈঠক আর হচ্ছে না। তবে কূটনীতি ও সংলাপই স্থায়ী শান্তির একমাত্র পথ।’

গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) মুখপাত্র এফি ডেফরিন জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর ওপর ১৫০টিরও বেশি হামলা চালানো হয়েছে। তেহরানে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট ছিল তাদের অন্যতম লক্ষ্য। একই সঙ্গে ইরানের ইস্পাহান শহরে অবস্থিত পারমাণবিক স্থাপনায়ও হামলা চালানো হয়েছে। আইডিএফ মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা এখনো (স্থানীয় সময় বিকাল) ইরানের ভেতরে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালাচ্ছি।’

অন্যদিকে ইসরায়েলে শিগগিরই ভয়াবহ হামলা চালানোর ঘোষণা দিয়েছে ইরান। রাতে আল জাজিরার খবরে বলা হয়, ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বড় ধরনের ধ্বংসাত্মক হামলা চালানো হবে। ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার জবাবে ইরান ব্যাপক পরিসরে প্রতিশোধমূলক হামলার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে এবং তা যেকোনো মুহূর্তে শুরু হতে পারে।

ইসরায়েলের জরুরি সেবা সংস্থা ম্যাগেন ডেভিড অ্যাডম জানায়, ইরানের হামলায় প্রাথমিকভাবে ৮০ জনের মতো ইসরায়েলি আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে চারজন গুরুতর আহত হয়ে পরে মারা যান। আরো কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানানো হয়। বাকিরা মাঝারি, সামান্য আঘাত অথবা চরম মানসিক আঘাতের শিকার।

ইরানি গণমাধ্যমের দাবি, শুক্রবার রাতেই শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। তবে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফ জানিয়েছে, প্রকৃত সংখ্যা একশর কম ছিল। তারা জানায়, রাতভর চারটি ধাপে আক্রমণ হয়েছে। প্রতিটি ধাপে ব্যবহার হয়েছে ডজনখানেক ক্ষেপণাস্ত্র।

তেল আবিবসহ কেন্দ্রীয় অঞ্চলে বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি আঘাত হেনেছে। বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। আকাশে দেখা গেছে ধোঁয়ার কুণ্ডলী। তেল আবিবের একটি ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে আইডিএফের হোম ফ্রন্ট কমান্ড এক বেসামরিক নাগরিককে উদ্ধার করে।

উত্তর ইসরায়েলের একটি শহরে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ধ্বংস হওয়া ক্ষেপণাস্ত্রের একটি বড় খণ্ড পড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটে। আইডিএফের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফি ডেফ্রিন বলেন, ‘বেশির ভাগ ক্ষেপণাস্ত্রই আকাশে প্রতিহত করা হয়েছে বা ইসরায়েলে পৌঁছার আগেই ভূপাতিত করা হয়েছে। কিছু ভবনে সীমিত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যেগুলোর বেশির ভাগই বাধাদান করা ক্ষেপণাস্ত্রের টুকরো দ্বারা সৃষ্টি।’

শুক্রবার রাত ৯টার পর পরই ইসরায়েলজুড়ে সতর্কবার্তা পাঠানো হয় এবং সেটা প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ১০ মিনিট আগে। শুক্রবার রাত ১টার পর আবারো একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। এরপর আরো কয়েকবার হামলা হয়, যার একটি সরাসরি মধ্য ইসরায়েলের একটি আবাসিক ভবনে আঘাত হানে। সেখানে অন্তত ২০ জন আহত এবং দুজন পরে মারা যান।

গতকাল ইরানের সংবাদমাধ্যম তেহরান টাইমসের খবরে সেনাবাহিনীর বিবৃতির বরাতে দুদিনে তিনটি ইসরায়েলি বিমান ভূপাতিত করার দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে গতকাল একটি ও শুক্রবার দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করা হয়। তিন বিমানের পাইলটদের মধ্যে একজন নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্য দুজন ইরানের হেফাজতে রয়েছে।

এর আগে শুক্রবার ভোরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির প্রাণকেন্দ্র ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায় ইসরায়েল। এ অভিযানের নাম দেয়া হয়েছে ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’। রাজধানী তেহরানসহ অন্তত আটটি শহরে বড় ধরনের বিমান হামলা করে ইসরায়েলের বিমান বাহিনী (আইএএফ)। এতে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানসহ শীর্ষ ২০ সামরিক কর্মকর্তা ও কয়েকজন পরমাণু বিজ্ঞানী নিহত হন। এ ঘটনার পরই ইরান পাল্টা জবাব দেয়। ইরান তাদের অভিযানের নাম দেয় ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ থ্রি’।

শুক্রবার রাতে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে প্রথমে ড্রোন হামলা চালায় ইরান। এরপর ইসরায়েলের দিকে একের পর এক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে তারা। এ হামলা চলাকালে জেরুজালেম ও তেল আবিবের আকাশ বিস্ফোরণের আলোয় ঝলমল করে ওঠে এবং নিচের ভবনগুলো কেঁপে ওঠে। এ সময় জনগণকে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়ার জন্য একাধিক সতর্কতা জারি করা হয়।

চলমান হামলার পর জেরুজালেমের পুরনো শহরের অন্যতম প্রবেশপথ দামেস্ক গেটের সিঁড়ির মুখে ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। এতে শত শত মুসলিম আল আকসা মসজিদে নামাজের জন্য গেলেও নিরাপত্তার কারণে প্রবেশ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় তারা ফিরে যান।

বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের প্রতিটি স্থাপনায় হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের আয়াতুল্লাহ শাসন ব্যবস্থার ‘প্রতিটি স্থাপনা ও প্রতিটি লক্ষ্যবস্তুতে’ হামলা চালাবে ইসরায়েল। নতুন প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে ইরানের প্রধান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রে কঠিন আঘাত হেনেছি। প্রয়োজন হলে আবারো তা লক্ষ্য করে হামলা করব।’ ‘ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থেকে বড় ধরনের হুমকি রয়েছে। আমরা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা ধ্বংসে পদক্ষেপ নিয়েছি।’

এদিকে ইসরায়েলে হামলা অব্যাহত রাখার হুমকি দিয়েছে ইরান। সেই সঙ্গে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার হুমকিও দিয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেছেন, ‘সম্মুখযুদ্ধে ইসরায়েলকে মোকাবেলা করার জন্য ইরানের সামরিক বাহিনী প্রস্তুত। এক্ষেত্রে ইসরায়েলের প্রতি কোনো দয়া প্রদর্শন করা হবে না।’

ইসরায়েলের হামলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বেশ কয়েকটি বার্তা এবং একটি ভিডিও পোস্ট করেন খামেনি। এক্স বার্তায় তিনি বলেন, ‘ইরানে হামলা করে জায়নবাদী শাসকগোষ্ঠী বড় ভুল, গুরুতর অপরাধ এবং চরম বেপরোয়া আচরণ করেছে। আল্লাহর কসম, এ হামলার ফলাফল হবে গুরুতর এবং জায়নবাদী শাসকগোষ্ঠী ধ্বংস হয়ে যাবে। জায়নবাদীদের হামলায় ইরানে যারা নিহত হয়েছেন, তাদের রক্ত ইরানের জনগণ বৃথা যেতে দেবে না, নিজেদের আকাশসীমায় অনুপ্রবেশও সহ্য করবে না। আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা প্রস্তুত। দেশের সর্বস্তরের মানুষ তাদের পাশে আছেন।’

এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত নিয়ে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মাদ বিন সালমানের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। ইরানের সংবাদ সংস্থা ইরনার খবরে এ কথা বলা হয়। তিনি যুবরাজকে বলেন, ‘‌আমি এ অঞ্চলে শান্তি স্থিতিশীলতা চাই। কিন্তু জায়নবাদীরা তা নস্যাৎ করতে চায়।’ এদিকে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কার্টজ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া অব্যাহত রাখলে ‘তেহরান জ্বলবে’। গতকাল নতুন হামলা নিয়ে ইরানকে এ হুঁশিয়ার করেছেন তিনি। এর আগে সকালে ইসরায়েলে ইরানের হামলায় অন্তত তিনজন নিহত হন বলে মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে। যদিও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের দাবি এ সংখ্যা চার।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফের সঙ্গে একটি মূল্যায়ন বৈঠকের পর প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কার্টজ বলেন, ‘ইসরায়েলি নাগরিকদের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ইরানকে চরম মূল্য দিতে হবে।’

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এক ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা গতকাল বলেছেন, ‘ইসরায়েলি বাহিনী ইরানে আরো হামলার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এটা এখানেই শেষ নয়।’

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু শুক্রবার বলেছিলেন, তার লক্ষ্য ইসরায়েলের প্রতি যেকোনো ইরানি হুমকি নির্মূল করা। ইরানিদের তাদের নেতাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার আহ্বানও জানান তিনি। নেতানিয়াহু বলেন, ‘ইসরায়েল ইরানি সরকারের পতনকে স্বাগত জানাবে।’ যদিও তারা সরাসরি তা ঘটানোর চেষ্টা করছে না।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইরান অভিযোগ করেছে, মার্কিন মদদে ইসরায়েল ইরানে বিমান হামলা চালিয়েছে। তবে এ অভিযোগকে খারিজ করে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়, এখন পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতা করাই হবে ইরানের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ।

নিরাপত্তা পরিষদে ইরানি স্থায়ী প্রতিনিধি আমির সায়েইদ ইরাভানি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রসহ যারা ইসরায়েলকে সমর্থম করে, তাদের বোঝা উচিত, তারা সবাই (গতকালের হামলায়) সহযোগী। সহায়তা এবং সমর্থনের মাধ্যমে তারা পরিণতিরও সমান ভাগীদার।’

ইরানের পাল্টা হামলার পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে ইসরায়েলি স্থায়ী প্রতিনিধি ড্যানি ড্যানন দাবি করেন, ইরান যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ইসরায়েলের হামলা ছিল জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গৃহীত একটি পদক্ষেপ।

ইসরায়েলের ওপর ইরানের হামলা ঠেকাতে সহায়তা করলে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের ঘাঁটি এবং জাহাজে হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে বিবিসি এ কথা জানিয়েছে। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামলা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা ফ্রান্স হস্তক্ষেপ করলে এ দেশগুলোর আঞ্চলিক সামরিক ঘাঁটি ও নৌবাহিনীর জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে—এমন হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। যুক্তরাজ্য এ বিষয়ে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

ইসরায়েলের আকস্মিক হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া অর্থহীন মনে করছে ইরান। তাদের অভিযোগ, হামলায় হোয়াইট হাউজের সমর্থন ছিল। রয়টার্স জানায়, ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমায়েইল বাঘাইকে উদ্ধৃত করে দেশটির বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ দেখে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া অর্থহীন মনে হচ্ছে। একদিকে সমঝোতা করার চেষ্টা করে, অন্যদিকে ইরানের সীমানায় ইসরায়েলকে হামলার অনুমতি দেয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এদিকে ইরানে ইসরায়েলের করা হামলা নিয়ে মুখ খুলেছেন তেল আবিবের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রয়টার্সকে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, হামলার বিষয়টি আগেই জানতেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা সব জানতাম। আমি ইরানকে অপমান ও ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম। আমি খুব চেষ্টা করেছি। কারণ, আমি চাইতাম, একটা চুক্তি হোক।’ তার মতে, এখনো চুক্তি করার সুযোগ আছে। তিনি বলেন, ‘এখনো দেরি হয়নি।’ ট্রাম্প জানান, তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহুকে হামলা পিছিয়ে দিতে বলেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, কূটনৈতিকভাবে বিষয়টি (ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সংকট) সমাধান হোক।

এদিকে শুক্রবার ক্রেমলিন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সংঘাত থামাতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। একই সঙ্গে তিনি রাশিয়াকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রস্তাব দিয়েছেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, পুতিন ইরানে ইসরায়েলের হামলায় নিহতদের পরিবারের প্রতি শোক জানিয়েছেন এবং বলেছেন, এ হামলা জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে। একই দিনে নেতানিয়াহুর সঙ্গেও কথা বলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা না বাড়ানোর আহ্বান জানান রুশ প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, ‘পরমাণু প্রকল্প ও অন্যান্য যেসব ইস্যু নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব চলছে তা আলোচনা ও কূটনৈতিক পন্থায় সমাধান করা সম্ভব।’

আল জাজিরার খবরে বলা হয়, ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তেহরানের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ দেশটির পার্লামেন্টে বলেন, ‘পাকিস্তান ইরানের পাশে আছে। ইরানের স্বার্থ রক্ষায় প্রতিটি আন্তর্জাতিক ফোরামে সহযোগিতা করবে পাকিস্তান। ইরান, ইয়েমেন ও ফিলিস্তিনকে টার্গেট করেছে ইসরায়েল। মুসলিম দেশগুলো এখনই যদি এক না হয়, তাহলে সবার পরিণতি একই হবে।’

এদিকে ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বিমানবন্দরের মুখপাত্র লিসা ডাইভারের বরাত দিয়ে আল জাজিরার এ তথ্য জানায়।