সাম্প্রতিক হামলাগুলোয় জ্বালানি তেল কেন্দ্র, তেল সংরক্ষণাগার এবং বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আঘাত হানার ঘটনা বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি অবকাঠামো ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান লক্ষ্য করে হামলা চালানোর উদ্দেশ্য হলো প্রতিপক্ষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা দুর্বল করে দেয়া। এতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
ইরানের প্রধান জ্বালানি তেল রফতানি কেন্দ্র ‘খার্গ দ্বীপে’ গতকাল বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রতিক্রিয়ায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু ও সেখানে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার হুমকি দিয়েছে ইরান। তাই বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আলটিমেটাম দিয়েছে দেশটি। খবর রয়টার্স ও আল জাজিরা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, মার্কিন বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী বিমান হামলা চালিয়ে ইরানের খার্গ দ্বীপের সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলো ‘সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন’ করে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালি অবরোধ অব্যাহত রাখলে দ্বীপের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি তেল স্থাপনাগুলো পরবর্তী লক্ষ্য হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, তারা সেখানে ৯০টিরও বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তু, বিশেষ করে নৌ-মাইন ও মিসাইল স্টোরেজ ধ্বংস করেছে। ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করা ভিডিও ও স্যাটেলাইট চিত্রে দ্বীপটির বিমানবন্দর ও রানওয়ে বিধ্বস্ত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ইরান অবশ্য দাবি করেছে, এ বিশাল হামলার পরও দ্বীপটি থেকে জ্বালানি তেল রফতানি কার্যক্রম ‘সম্পূর্ণরূপে চলমান’ রয়েছে। ট্যাংকার ট্র্যাকারসও সেখানে নতুন দুটি ট্যাংকারে তেল লোড হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে। ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এ দ্বীপ দিয়েই রফতানি হয়। সাবেক মার্কিন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মার্ক কিমিটের মতে, বর্তমানে দ্বীপটিকে ‘জিম্মি’ করে জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি প্রধান জ্বালানি তেল কেন্দ্রে গতকাল ড্রোন হামলার পর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া যায়। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি তেল রফতানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে মার্কিন হামলার পর ইউএইর বন্দর ও ডকগুলোয় হামলার হুঁশিয়ারি দেয় তেহরান। এরপরই ইউএইর ওই তেল কেন্দ্র থেকে আগুনের ধোঁয়া আকাশের দিকে উঠতে দেখা যায়। ইরানের সামরিক বাহিনী সতর্ক করে বলেছে, খার্গ দ্বীপে মার্কিন হামলার প্রতিক্রিয়ায় তারা এখন আমিরাতের বন্দর ও ডকগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।
উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে প্রথমবারের মতো সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাসিন্দাদের আবুধাবি ও দুবাইয়ের প্রধান বন্দর এলাকাগুলো ‘অবিলম্বে’ খালি করার নির্দেশ দিয়েছে ইরান। দেশটির আধাসরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, দুবাইয়ের জেবেল আলী, আবুধাবির খলিফা ও ফুজাইরাহ বন্দর এখন ইরানের হামলার বৈধ লক্ষ্যবস্তু। তেহরানের দাবি, মার্কিন সামরিক বাহিনী এসব বেসামরিক স্থাপনাকে ব্যবহার করেই ইরানে হামলা চালাচ্ছে। এরই মধ্যে আবুধাবির আল-দাফরা ও বাহরাইনের শেখ ইসা ঘাঁটিতে টানা কয়েক দফা হামলা চালিয়ে মার্কিন প্যাট্রিয়ট রাডার সিস্টেম ও যুদ্ধবিমানের জ্বালানি ট্যাংক ধ্বংস করার দাবি করেছেন ইরানের আইআরজিসি-প্রধান। এছাড়া সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতেও ইরানি হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি রিফুয়েলিং বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলা হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও। দুবাই ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল সেন্টার এলাকায় সিটিগ্রুপ ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডসহ প্রধান আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মীদের সরিয়ে নিয়েছে। কাতার থেকে এইচএসবিসি তাদের কার্যক্রম সীমিত করার ঘোষণা দিয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য দাবি করেন, সৌদি আরবে মার্কিন কোনো বিমান ধ্বংস বা আঘাতপ্রাপ্ত হয়নি। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, সংবাদমাধ্যম চায় যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধে হেরে যাক। নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ওই বিমানঘাঁটিতে কয়েকদিন আগে আঘাত হানা হয়েছিল কিন্তু বিমানগুলো আঘাতপ্রাপ্ত বা ধ্বংস হয়নি।’
ইরাকের রাজধানী বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসে হামলার ঘটনা ঘটেছে গতকাল। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, একটি ক্ষেপণাস্ত্র দূতাবাস ভবনে আঘাত করে। এমন প্রেক্ষাপটে ইরান যুদ্ধ ঘিরে উপসাগরীয় অঞ্চলে আরো মেরিন সেনা এবং যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ সিদ্ধান্তকে বিস্তৃত পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের সুরক্ষা দেয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের বিবেচনায় থাকতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে।
যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি বদলে দিতে প্রথমবারের মতো আড়াই হাজার মার্কিন মেরিন সেনার দল ‘উভচর’ যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ত্রিপোলি নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পথে রওনা দিয়েছে। জাপানের ওকিনাওয়া থেকে আসা এ মেরিন সেনারাই হতে যাচ্ছেন চলমান যুদ্ধে মোতায়েন হওয়া প্রথম মার্কিন স্থলসেনা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ও আইআরজিসির শীর্ষ কর্মকর্তাদের ধরিয়ে দিতে ১ কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দাবি, এ ব্যক্তিরা বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের নীলনকশা তৈরি ও বাস্তবায়ন করছেন।
যুদ্ধের ভয়াবহতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বেসামরিক সাধারণ মানুষ। মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলজুড়ে নিহত হয়েছে প্রায় তিন হাজার লোক। হতাহতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ইরানে। গতকালও দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় ইলাম প্রদেশের আইভান শহরের একটি আবাসিক ভবনে যৌথ বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। এতে ছয় মাস বয়সী এক শিশুসহ একই পরিবারের ছয় সদস্য প্রাণ হারান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় দেশজুড়ে প্রায় ৪৩ হাজার বেসামরিক স্থাপনা বা ইউনিট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এ যুদ্ধে লেবাননের পরিস্থিতিও শোচনীয়। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় বুর্জ কালাউইয়া শহরে একটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ইসরায়েলি হামলায় ১২ জন চিকিৎসাকর্মী ও দুজন ত্রাণকর্মী নিহত হয়েছেন। হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছে, কিন্তু নির্বিচার বিমান হামলার কারণে কোনো জায়গাই এখন আর নিরাপদ নয়। খাদ্য, ওষুধ ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে চরম মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
এ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর হামলা না চালাতে ইরানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস। আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়ম মেনে সম্ভাব্য সব উপায়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি আগ্রাসনের জবাব দেয়ার পূর্ণ অধিকার ইরানের রয়েছে বলে হামাস তাদের এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে। তবে এ পাল্টা জবাব যেন কোনোভাবেই পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর জন্য ক্ষতির কারণ না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখার অনুরোধ জানিয়েছে তারা।
এদিকে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ কবে শেষ হবে, গত শুক্রবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে আবারো এমন প্রশ্ন রাখা হয়েছিল। জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘যখন আমি এটি আমার ভেতর থেকে অনুভব করব।’ ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের পর মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম সিএনএনের ‘নিউজনাইট’ অনুষ্ঠানের প্যানেল আলোচনায় এ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়।
ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত ও নিরাপদ রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একযোগে যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো। তিনি বলেন, ‘আশা করি চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য দেশ যারা এ কৃত্রিম বাধার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তারা এ অঞ্চলে যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে।’










