মিয়ানমারে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ৩ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এ ঘটনা দেশটির যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। কয়েক বছরের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত দেশে এমন দুর্যোগ নতুন করে মানবিক সংকট সৃষ্টি করেছে। খবর সিএনএন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চার বছরের যুদ্ধে দেশটির ৩০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ভূমিকম্প সেই ভয়াবহ মানবিক সংকটকে আরো গভীর করেছে। ফলে এ মুহূর্তে অন্তত ২ লাখ মানুষের জরুরি সহায়তা প্রয়োজন।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এ বিপর্যয় সামরিক জান্তা নেতা সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং-এর জন্য এক ধরনের রাজনৈতিক সুযোগ হয়ে এসেছে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে নির্বাচিত নেত্রী অং সান সু চি-কে সরিয়ে ক্ষমতা দখলের পর থেকে তিনি আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত ও বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিলেন। কিন্তু ভূমিকম্পের পর আন্তর্জাতিক সাহায্যের আবেদনের পাশাপাশি আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসে তিনি আবার বৈশ্বিক মঞ্চে নিজের উপস্থিতি নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে ব্যাংককে সাক্ষাৎ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠক তার সেই চেষ্টার অংশ। এই আলোচনাগুলোয় মানবিক সহায়তা ও সাময়িক যুদ্ধবিরতি নিয়ে কথা হয়েছে। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, এগুলো কেবল সামরিক শাসনের বৈধতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা।

মানবাধিকার সংস্থা ও বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর মতে, সামরিক বাহিনী কথিত যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও বিদ্রোহী এলাকায় বিমান হামলা চালিয়ে সাধারণ মানুষকে হত্যা করছে, বাধাগ্রস্ত করছে ত্রাণ বিতরণ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে, কোনো শর্ত ছাড়া সামরিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসা মানে হবে তাদের স্বৈরশাসনকে স্বীকৃতি দেয়া। অতীতে ২০০৮ সালের ঘূর্ণিঝড় নার্গিসের সময়ও সামরিক শাসকরা সংবিধান পরিবর্তন ও ভুয়া নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছিল।

ক্যারেন ন্যাশনাল ইউনিয়নসহ বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো বলছে, সংলাপ শুরু করতে হলে প্রথমেই সহিংসতা বন্ধ ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায়, কোনো রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব নয়।

তবে কিছু কূটনৈতিক মহল এখনো আশাবাদী যে ২০২৫ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনো ধরণের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক সমাজকে অবশ্যই নির্দিষ্ট শর্ত আরোপ করে সংলাপে যেতে হবে—যেমন মানবিক করিডোর, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, এবং সকল পক্ষের অংশগ্রহণে আলোচনার নিশ্চয়তা।

অন্যথায়, এই সংলাপ কেবল জান্তার সময় বাড়িয়ে দেবে এবং মিয়ানমারের জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা পদদলিত হবে।