শনিবার রাত থেকে ইরানের বেশ কয়েকটি জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে দেশ দুটি। এ হামলা চলমান যুদ্ধকে এক ‘বিপজ্জনক নতুন পর্যায়ে’ ঠেলে দিয়েছে বলে সতর্ক করেছে তেহরান। এরই মধ্যে ইরানও পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছে। ইসরায়েল গতকাল একাধিক হামলা চালিয়েছে তেহরানে। হামলার ঘটনা ঘটেছে সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক ও বাহরাইনেও।
এদিকে ইরানে আরো জোরদার হামলার ইঙ্গিত দিয়ে গতকাল রাতে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দেশটির সাধারণ মানুষকে ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর অভিযোগ, ইরানের সরকার ঘনবসতিপূর্ণ বেসামরিক এলাকায় ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ব্যবস্থা করছে। এ ধরনের পদক্ষেপের ফলে ওই এলাকাগুলো সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে এবং এতে সাধারণ মানুষ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ইরানি তেলজাত পণ্য বিতরণ সংস্থার প্রধান নির্বাহী কেরামত ভেইস্কারামি রাষ্ট্রীয় টিভিকে বলেছেন, গতকাল রাতে তেহরান ও আলবোরজে চারটি তেল ডিপো ও একটি পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিবহন কেন্দ্রে শত্রুপক্ষ বিমান হামলা চালিয়েছে। এ ঘটনায় চার কর্মী নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে দুজন তেল ট্যাংকারচালক ছিলেন। স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। আল জাজিরা বলছে, ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হওয়া ডিপো থেকে ছড়িয়ে পড়া তেল তেহরানের কিছু পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছে, যার ফলে সড়কের পাশ দিয়ে ‘আগুনের নদী’ বয়ে যেতে দেখা গেছে।
এ হামলা চলমান যুদ্ধকে এক ‘বিপজ্জনক পর্যায়ে’ ঠেলে দিয়েছে বলে সতর্ক করেছে তেহরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ‘রাসায়নিক যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে বলেন, ‘জ্বালানি মজুদ কেন্দ্রগুলোতে এ হামলা চালানো আসলে ইরানি নাগরিকদের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে রাসায়নিক যুদ্ধ শুরুর নামান্তর।’ বাঘাইয়ের মতে, এসব হামলার ফলে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া ক্ষতিকারক উপাদান ও বিষাক্ত পদার্থ পরিবেশের ওপর ‘বিধ্বংসী প্রভাব’ ফেলবে। একই সঙ্গে এটি ব্যাপক আকারে মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে।
তবে ইসরায়েলের সামরিক মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাদাভ শোশানি বলেছেন, ‘যেসব জ্বালানি ডিপোতে হামলা চালানো হয়েছে, সেগুলো ইরানের যুদ্ধযন্ত্রে ব্যবহৃত হচ্ছিল।’ তার দাবি, এসব স্থাপনা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রপেল্যান্ট উৎপাদন বা সংরক্ষণে ব্যবহৃত হওয়ায় সেগুলো ‘বৈধ সামরিক লক্ষ্য’। অর্থাৎ তেহরানের যে স্থাপনাগুলোকে বেসামরিক অবকাঠামো বলছে, ইসরায়েল সেগুলোকে সরাসরি যুদ্ধসংশ্লিষ্ট সম্পদ হিসেবে দেখাচ্ছে।
এদিকে পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছে তেহরানও। ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা ইসরায়েলের তেল আবিব ও বিরশেবা শহরের সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে জর্ডানের আজরাক শহরে অবস্থিত মুওয়াফ্ফাক আল-সালতি বিমানঘাঁটিতেও হামলা চালানোর দাবি করেছে তারা। আইআরজিসির মতে, ঘাঁটিটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুদ্ধবিমানের অন্যতম সক্রিয় আক্রমণাত্মক ঘাঁটি।
এছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। কুয়েত জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে হয়েছে এবং একাধিক হামলার ঘটনায় দুই সীমান্তরক্ষী নিহত হয়েছেন। কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জ্বালানি ট্যাংক ও একটি সরকারি ভবনে ড্রোন হামলার পর আগুন ধরে যায়। কুয়েতের জাতীয় তেল কোম্পানি ‘সতর্কতামূলক ব্যবস্থা’ হিসেবে তাদের অপরিশোধিত তেল উৎপাদন কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থায় ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান তেলক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন প্রায় ৭০ শতাংশ কমে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ১৩ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে। চলমান সংঘাতের আগে ওই তেলক্ষেত্রগুলো থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪৩ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন হতো। গতকাল সৌদি আরব জানিয়েছে, রাজধানী রিয়াদের কাছে একাধিক ড্রোন হামলা নস্যাৎ করা হয়েছে এবং অন্তত তিনটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। কাতারেও নতুন হামলার খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের রাজধানী ইরবিলেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
চলমান যুদ্ধে রাশিয়া ইরানকে সহযোগিতা করছে বলে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ বিষয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, দুই দেশ বহু বছর ধরে সামরিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব রয়েছে। এ দুই দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা নতুন কিছু নয়। এটি কোনো গোপন বিষয় নয়। এটি অতীতে ছিল এবং এখনো রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। রাশিয়া ইরানকে মার্কিন লক্ষ্যবস্তু খুঁজে পেতে সাহায্য করছে কিনা এ প্রশ্নের উত্তরে আব্বাস আরাগচি বলেন, তার কাছে এ বিষয়ে বিস্তারিত সামরিক তথ্য নেই।
এদিকে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের দুই সেনা নিহত হয়েছে। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী বিষয়টি স্বীকার করেছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। গত সোমবার থেকে লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। তারা বলছে, সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর অবস্থান লক্ষ্য করে এ হামলা চালানো হচ্ছে। হিজবুল্লাহ দাবি করেছে, তারা ইসরায়েলের হাইফা নৌঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে এ হামলা চালানো হয়েছে। এছাড়া আজ ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি শহরে হামলা চালিয়েছে হিজবুল্লাহ। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গতকাল জানিয়েছে, ইসরায়েলি হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৯৪। নিহতদের মধ্যে ৮৩টি শিশু রয়েছে।
এদিকে গতকাল ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে চলমান যুদ্ধের মধ্যে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, শত্রুকে ইরানের এক ইঞ্চি জমিও দখল করতে দেয়া হবে না। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত ভাষণে তিনি বলেন, ইরান প্রতিবেশী ভ্রাতৃপ্রতিম দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক চায়, কিন্তু শত্রুপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তার ভাষায়, ইরান এমন কোনো সংঘাত চায় না যা প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করে; তবে অন্য দেশের ভূখণ্ড থেকে যদি ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালানো হয়, তার জবাব দেয়া ছাড়া তেহরানের সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকে না। যারা ইরানকে আক্রমণ করবে, তাদের বিরুদ্ধে দেশটি অত্যন্ত শক্ত অবস্থান নেবে এবং জোরালো জবাব দেবে।
অন্যদিকে আইআরজিসির মুখপাত্র আলি মোহাম্মদ নাইনি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বর্তমান গতির এ তীব্র যুদ্ধ অন্তত ছয় মাস চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখে।’ নাইনির এ বক্তব্য সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মূল্যায়নের সম্পূর্ণ বিপরীত। ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন যে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চালানো অভিযান অত্যন্ত সফল হয়েছে।
ইরানের সঙ্গে সংঘাত শুরুর পর থেকে ইসরায়েলে প্রায় দুই হাজার জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এক বিবৃতিতে বলা হয়, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এক সপ্তাহের কিছু বেশি সময়ে মোট ১ হাজার ৯২৯ জন আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ১২২ জন এখনো হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। এর মধ্যে নয়জনের অবস্থা গুরুতর। যদিও তারা সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে হাসপাতালে ভর্তি হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
চলমান মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার মধ্যে ইরানে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করলে তা জনগণের সমর্থন পাবে না বলে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে চীন। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই গতকাল বেইজিংয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনা কোনো সমর্থন পাবে না।’ ওয়াং ই বলেন, ‘চীনের প্রধান অবস্থান হলো ইরানসহ সব দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে, মধ্যপ্রাচ্যে অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করা উচিত, সংঘাত বাড়লে তা পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে।’ ওয়াং বলেন, ‘এ যুদ্ধ হওয়া উচিত ছিল না এবং এটি কারো জন্যই ভালো নয়। শক্তি কোনো সমাধান দেয় না; সশস্ত্র সংঘাত কেবল ঘৃণা বাড়ায় এবং নতুন সংকট তৈরি করে।’
এদিকে আল জাজিরা জানিয়েছে, ‘সর্বসম্মতিক্রমে’ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন হয়ে গেছে। তবে নির্বাচিত ব্যক্তির নাম এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। ইরানের আইএসএনএ সংবাদ সংস্থার বরাতে খুজেস্তান প্রদেশের প্রতিনিধি ও নির্বাচন সংস্থার সদস্য মোহসেন হেইদারি বলেন, ‘বিশেষজ্ঞ পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদনে সবচেয়ে উপযুক্ত প্রার্থী নির্ধারণ করা হয়েছে। খামেনির দেয়া পরামর্শ অনুযায়ী এমন একজনকে বেছে নেয়া হয়েছে, যাকে ‘শত্রুরা ঘৃণা করবে’। তিনি ইঙ্গিত দেন যে ওই ব্যক্তির নাম খোদ আমেরিকাও উচ্চারণ করেছে। আরেক সদস্য মোহাম্মদ মেহদি মিরবাঘেরি ইরানের সংবাদ সংস্থা ফার্সকে নিশ্চিত করেছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত প্রতিফলিত করে এমন একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছে। ইরানের এ নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে সরাসরি হুমকি দিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ফারসি ভাষায় দেয়া এক পোস্টে ইসরায়েল সতর্ক করে বলেছে, খামেনির উত্তরসূরি নিয়োগের বৈঠকে যারা অংশ নেবেন, তাদের ওপর হামলা চালাতে ইসরায়েল দ্বিধা করবে না।










