গাজায় ইসরায়েলের সর্বাত্মক আক্রমণের ছয় মাস অতিবাহিত হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন ফোরাম থেকে অব্যাহত চাপ সত্ত্বেও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সহসা সরে আনার কোনো লক্ষণ নেই তেল আবিবের। অনমনীয় এ অবস্থান দেশটির অর্থনীতির জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, এরই মধ্যে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে ইসরায়েল। খবর দ্য ন্যাশনাল।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েলের দুর্বল শাসনব্যবস্থা ও নীতি বাস্তবায়নের ঝুঁকি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চড়াই-উৎরাইয়ের সঙ্গে জাতীয় প্রতিরক্ষা বাজেটের বৃদ্ধি সরকারকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে।

ব্যাংক অব ইসরায়েলের গভর্নর আমির ইয়ারন সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, সামরিক খাতের ঋণের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। এ পদক্ষেপ মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির দিকে অর্থনীতিকে নিয়ে যেতে পারে।

যুদ্ধকে কেন্দ্র করে কর আরোপ ইসরায়েলের অর্থনীতিতে নতুন বোঝা হয়ে উঠেছে। অবশ্য স্থানীয়ভাবে এ বোঝার তালিকা দীর্ঘ। এর মধ্যে রয়েছে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও নিম্ন শ্রম উৎপাদনশীলতা। একই সঙ্গে যুদ্ধের অনিশ্চিয়তা গার্হস্থ্য অর্থনীতি থেকে শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগের প্রবাহ সবকিছুকে প্রভাবিত করছে।

দুবাইয়ের বিনিয়োগ গবেষণা সংস্থা টেলিমারের উদীয়মান বাজার কৌশলের প্রধান হাসনাইন মালিক বলেন, ‘যুদ্ধ স্পষ্টতই ইসরায়েলের প্রবৃদ্ধি ও আর্থিক গতিপথকে আরো খারাপ দিকে নিয়ে গেছে। প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে দেশটির আকর্ষণের ওপর প্রভাব কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয় তা দেখা বাকি।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, গাজায় যত বেশি সময় ধরে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাবে ইসরায়েলের আর্থিক স্বাস্থ্যের ওপর তত বেশি চাপ পড়বে। লেবানন-ভিত্তিক অর্থনীতিবিদ নাসিব ঘোব্রিল বলেন, ‘আন্তর্জাতিক রেটিং এজেন্সিগুলো এরই মধ্যে বলেছে, অর্থনৈতিক কার্যকলাপ ও পাবলিক ফাইন্যান্সের বেশির ভাগ অংশ যুদ্ধের কারণে প্রভাবিত হয়েছে। এ ক্রমবর্ধমান প্রভাব অদূর ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।’

যুদ্ধের জন্য তহবিলের প্রাথমিক উৎস হলো ঋণ, যা ইসরায়েলের ঋণ-টু-জিডিপি অনুপাতকে বাড়িয়ে তুলছে। গত বছরের শেষে এটি ১ দশমিক ৪ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে ৬১ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংক অব ইসরায়েলের গভর্নর আমির ইয়ারন বার্ষিক প্রতিবেদনে বলেছেন, ঋণ-টু-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি দেশের শীর্ষ কৌশলগত সম্পদগুলোর একটিকে আঘাত করছে। বাজারের মূল্যায়ন হলো ইসরায়েল মধ্যম মেয়াদে ক্রমবর্ধমান ঋণের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে তা উৎপাদন, অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতির চাপ অতিরিক্ত বৃদ্ধি ঘটাতে পারে।

গত মাসে ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেট ১৬ হাজার কোটি ডলারের সংশোধিত বাজেট প্যাকেজ পাস করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত করেছে বড় অংকের ঋণ পরিশোধের অর্থ। এর পরিমাণ ৭২ হাজার কোটি শেকেল। এর আগে গত বছর পাস করা মূল বাজেট থেকে ব্যয় ৭ হাজার কোটি শেকেল বাড়ানো হয়েছিল। যেখানে ৫ হাজার ৫০০ কোটি শেকেল ছিল সামরিক খাতে এবং মাত্র ১ হাজার ৫০০ কোটি শেকেল বরাদ্দ করে বেসামরিক অর্থায়নে। সংঘাতের কারণে চলতি বছর ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাজেট দ্বিগুণ হয়েছে এবং ২০২৪ সালের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সরকার আট বছরের জন্য সামরিক ব্যয়ে বছরে ১ হাজার কোটি শেকেল বৃদ্ধির অনুমোদন দিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা ব্যয়ের জন্য রাজস্ব উৎস বাড়াতে হবে। নইলে বেসামরিক ব্যয়ের ওপর একটি ধাক্কা লাগবে।

ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার সম্পাদকীয় পরিচালক প্যাট থাকার বলেছেন, গাজার যুদ্ধ ইসরায়েলের অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা ও পাবলিক ফাইন্যান্সের ক্ষতি করছে। ফলে পাবলিক ঋণ বাড়ছে।

অবশ্য ইসরায়েলের মূল সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক, বিশেষ করে এর বাহ্যিক অবস্থান সামগ্রিকভাবে শক্তিশালী বলে উল্লেখ করেন প্যাট থাকার। সঙ্গে বলেন, ‘এ ধাক্কা সহ্য করার ক্ষমতা ইসরায়েলের রয়েছে। তবে ঝুঁকিগুলো দৃঢ়ভাবে নেতিবাচক দিকে রয়েছে।’

অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ এলিয়ট গারসাইডের মতে, চলতি বছরের প্রথমার্ধে তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে ইসরায়েলের অর্থনীতি ব্যাহত হবে। এগুলো হলো পর্যটন, ব্যক্তিগত খরচ ও বিনিয়োগ।

ফিচ রেটিংয়ের বিশ্লেষকরা বলেছেন, যুদ্ধ বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। এটি পর্যটন ও নির্মাণ খাতে ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে। 

যুদ্ধ ও এর সঙ্গে সম্পর্কিত অর্থনৈতিক ব্যাঘাত গত বছর সরকারের রাজস্বের ৬ দশমিক ৬ শতাংশ হ্রাসে অবদান রেখেছিল। আবার ব্যয়ের ১২ দশমিক ৫ শতাংশ যুদ্ধের ক্ষতি প্রশমন ও সামরিক খাতে ব্যয় হয়েছে।

প্রাথমিক পূর্বাভাসে দশমিক ৯ শতাংশ বলা হলেও বর্তমানে ইসরায়েলের বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৪ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছেছে। সংশোধিত বাজেটে জিডিপির প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ নতুন ব্যয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফিচ ডাটা অনুযায়ী, এ নতুন ব্যয় যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত।

ফিচ বিশ্লেষকরা বলেছেন, আমরা বাজেট ঘাটতি ৬ দশমিক ৮ শতাংশের পূর্বাভাস দিয়েছি, যা বাজেটের পূর্বাভাসের চেয়ে সামান্য বেশি।

সরকারি তথ্যানুসারে, গত বছরের চতুর্থ ত্রৈমাসিকে বার্ষিক ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ কমলেও ২০২৩ সালে ইসরায়েলের অর্থনীতি ২ শতাংশ বেড়েছে। এবারো প্রায় ২ শতাংশ প্রসারিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।