গত এক সপ্তাহ আগে বিমান হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর এ সংকট আরো ঘনীভূত হয়েছে। কয়েক দশক ধরে খামেনির কঠোর শাসনে যে বিভেদগুলো চাপা পড়ে ছিল, এখন তা প্রকাশ্যে চলে এসেছে। বিশেষ করে কট্টরপন্থী ও উদারপন্থী দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতার লড়াই তীব্র আকার ধারণ করেছে। খবর রয়টার্স।
ইরানের বর্তমান অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মূলে রয়েছে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের একটি ঘোষণা। সম্প্রতি তিনি উপসাগরীয় দেশগুলোয় হামলা না চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্টের এ নমনীয় অবস্থান দেশটির প্রভাবশালী রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) এবং কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতাদের ক্ষুব্ধ করেছে। তারা মনে করছেন, যুদ্ধের এ কঠিন সময়ে এ ধরনের প্রতিশ্রুতি দেয়া দুর্বলতার লক্ষণ। কট্টরপন্থী আলেম ও সংসদ সদস্য হামিদ রাসায়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রেসিডেন্টের কড়া সমালোচনা করে বলেন, এ অবস্থান অপেশাদার ও অগ্রহণযোগ্য।"আইআরজিসির চাপের মুখে পড়ে প্রেসিডেন্ট তার আগের বক্তব্য থেকে কিছুটা পিছিয়ে আসতে বাধ্য হন।
নেতৃত্ব নিয়ে ক্ষমতার লড়াই
ইরানের বর্তমান শাসন ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতার পদটি অত্যন্ত শক্তিশালী। আলী খামেনির মৃত্যুর পর বর্তমানে একটি অন্তর্বর্তী কাউন্সিল রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। তবে এ কাউন্সিলের সদস্যদের মধ্যেও মতভেদ দেখা দিয়েছে। একদিকে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান যখন কূটনৈতিকভাবে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছেন, তখন অন্যদিকে বিচার বিভাগের প্রধান আয়াতুল্লাহ গোলাম হোসাইন মোহসেনি-এজেই কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, হামলা অব্যাহত থাকবে। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যারা ইরানবিরোধী হামলায় সহযোগিতা করছে, তাদের ওপর আঘাত চলতেই থাকবে।
এ অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া দ্রুততর করেছে দেশটির ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’। তারা শিগগিরই নতুন নেতার নাম ঘোষণা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ মুহূর্তে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি। রেভল্যুশনারি গার্ডসের একটি বড় অংশের সমর্থন তার প্রতি রয়েছে। তবে তার নিয়োগ নিয়ে বিতর্কও কম নয়। সমালোচকরা মনে করেন, বাবার পর ছেলেকে নেতা বানানো হলে তা ইসলামী প্রজাতন্ত্রের মূলনীতির পরিপন্থী হতে পারে। এছাড়া ধর্মীয় পদমর্যাদায় তিনি অন্য অনেক জ্যেষ্ঠ আয়াতুল্লাহর তুলনায় পিছিয়ে আছেন। মোজতবা ছাড়াও হাসান খোমেনি ও মহসেনি-এজেইর মতো নেতাদের নামও আলোচনায় আছে।
ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
বোমাবর্ষণে ইরানের অনেক শীর্ষ সামরিক কমান্ডার নিহত হলেও রেভল্যুশনারি গার্ডস এখনো দেশটির কৌশল নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যিনিই পরবর্তী নেতা হোন না কেন, তাকে এ শক্তিশালী বাহিনীর পূর্ণ সমর্থন পেতে হবে। অন্যথায় প্রশাসনিক ফাটল ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ঘোষণা করেছে, খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে যেই আসুক না কেন, তাদের অভিযান থামবে না।
ইরানের সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত। এ নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও যুদ্ধ পরিস্থিতি দেশটির সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে আরো গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এখন দেখার বিষয়, নতুন নেতার নেতৃত্বে ইরান কি সংঘাতের পথ বেছে নেবে, নাকি আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করবে।










