তিনি বলেছেন, ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যকার ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকাকালীন তেহরান গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি বাণিজ্যিক চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখবে। গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে এ ঘোষণা দেন আরাগচি।

তবে ইরানের একজন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী নৌযানগুলোকে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অনুমতি নিতে হবে। আরেক ইরানি কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, মার্কিন পতাকাবাহী জাহাজসহ সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজকে এ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেয়া হচ্ছে। তবে কোনো সামরিক যুদ্ধজাহাজকে চলাচলের অনুমতি দেয়া হবে না।

তেহরানের হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার ঘোষণায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম গতকাল একদিনেই ১০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ১০ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮১ দশমিক ২৮ ডলারে নেমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দামও প্রায় ১৩ শতাংশ কমে ৮৬ দশমিক ৫২ ডলারে নেমেছে। যুদ্ধের আগে যেখানে তেলের দাম ছিল প্রায় ৭০ ডলার, তার তুলনায় এখনো দাম কিছুটা বেশি রয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, বাজারে এখনো কিছুটা সতর্কতা রয়ে গেছে।

একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে বড় উত্থান দেখা গেছে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ বেড়েছে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ, ডাও জোনস বেড়েছে ৬৭৮ পয়েন্ট এবং নাসডাক বেড়েছে ১ শতাংশ। এটি টানা তৃতীয় সপ্তাহে বড় উত্থান, যা হ্যালোইনের পর থেকে আর দেখা যায়নি।

এর আগে ৮ এপ্রিল ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। লেবাননও ওই যুদ্ধবিরতির আওতায় ছিল বলে বারবার বলে আসছিল ইরান। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানও সেটাই বলছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তা অস্বীকার করে আসছিল। লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল ইসরায়েল। ইরান দ্বিতীয় দফায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসার সিদ্ধান্ত হলে বৃহস্পতিবার লেবাননে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে। এরপর গতকাল ইরান হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার ঘোষণা দেয়।

ইরান হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার ঘোষণা দিলেও দেশটির ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধ বহাল থাকবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান প্রক্রিয়া শতভাগ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এ অবরোধ ‘পুরোপুরি কার্যকর’ থাকবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ইরানের সঙ্গে আমাদের বোঝাপড়া ১০০ ভাগ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত ইরানি জাহাজ এবং বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ বলবৎ থাকবে। তবে এ প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেছেন, এ প্রক্রিয়াটি খুব দ্রুত সম্পন্ন হওয়া উচিত, কারণ অধিকাংশ পয়েন্ট বা বিষয় নিয়ে এরই মধ্যে আলোচনা হয়ে গেছে। পৃথক একটি পোস্টে ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেয়ার জন্য ইরানকে ধন্যবাদও জানিয়েছেন।

গতকাল ট্রাম্প আরো দাবি করেন ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তরে সম্মত হয়েছে। যদিও তেহরান এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু নিশ্চিত করে জানায়নি। হোয়াইট হাউজের সাউথ লনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ বোমারু বিমানের হামলায় মাটির গভীরে চাপা পড়া ‘নিউক্লিয়ার ডাস্ট’ ইরান ফেরত দিতে রাজি হয়েছে। তিনি ‘নিউক্লিয়ার ডাস্ট’ বলতে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে বোঝান, যা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মতে, সাম্প্রতিক হামলার পর ভূগর্ভে চাপা পড়ে আছে। ট্রাম্প আরো জানান, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অনেক বিষয়ে সমঝোতা’ হয়েছে এবং শিগগিরই ইতিবাচক কিছু ঘটতে পারে। এর আগে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছিলেন, ইরান আর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করবে না এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করে তারা এ মজুদ সরিয়ে ফেলবে।

এদিকে হরমুজ প্রণালি প্রসঙ্গে প্যারিসে কয়েক ডজন দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ডাক দিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। তবে এ উদ্যোগে রাখা হয়নি যুক্তরাষ্ট্রকে। সম্মেলনের অন্যতম লক্ষ্য হলো স্ট্রেইট অব হরমুজ মেরিটাইম ফ্রিডম অব নেভিগেশন ইনিশিয়েটিভ গঠন করা। এর আওতায় সাগরে মাইন অপসারণ করা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়ে সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হবে। সম্মেলনে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস এবং ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সরাসরি অংশ নেবেন। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার দেশগুলোসহ প্রায় ৩০টি দেশের প্রতিনিধি উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।