গতানুগতিক বাজেট, সৃজনশীলও না; ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটকে কেন্দ্র করে এমন মন্তব্যই করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটি মনে করে, করোনাভাইরাসের শিক্ষা থেকে বাজেটে যে সৃজনশীল-উদ্ভাবনী পদক্ষেপ দরকার ছিল, তা নেই। বরং বিনিয়োগ, রাজস্ব আদায় ও জিডিপির লক্ষ্যগুলো বাস্তবতা থেকে বেশ দূরে।

রেওয়াজ অনুযায়ী বাজেটের পরদিন শুক্রবার বাজেট প্রস্তাবের বিষয়ে সিপিডির পর্যালোচনা তুলে ধরেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। মহামারীর কারণে এবারের সংবাদ সম্মেলন হয় অনলাইনে।

তিনি বলেন, সরকার এ মহামারীর সময়ও বাজেট প্রণয়নে গতানুগতিক ধারার বাইরে যেতে পারেনি। আমাদের কাছে মনে হয়েছে এটি গতানুগতিক একটি বাজেট। কেননা কভিড-১৯ থেকে স্বাস্থ্য অর্থনীতি, মানবিক ও সামাজিক যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে সেটা নজিরবিহীন। এ বাজেটে যথেষ্ট পরিমাণে সৃজনশীল পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। আমরা সেই ধরনের প্রাধিকার বা অগ্রাধিকারও দেখতে পাইনি।

সিপিডি বাজেটে ধনীদের কেন করছাড় দেয়া হয়েছে, কেন কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সংস্থাটি হিসাব করে দেখিয়েছে, ব্যক্তিশ্রেণীর আয়করের ক্ষেত্রে সরকার যে ছাড় দিয়েছে, তাতে একজন নিম্নবিত্তের কর কমবে ৫ হাজার টাকা। আর অতিধনীর কমবে ২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা পর্যন্ত।

নতুন অর্থবছরের বাজেটে ৮ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যকে অসম্ভব হিসেবে বর্ণনা করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলেছে, মহামারীর ক্ষতি প্রশমন ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের দিকেই এখন বেশি মনোযোগ দেয়ার সময়।

২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এই ব্যয়ের মধ্যে ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হিসেবে আদায়ের পরিকল্পনা করেছেন অর্থমন্ত্রী, যা মোট বাজেটের ৬৬ শতাংশ। তার এই পরিকল্পনায় আয় ও ব্যয়ের ঘাটতি থাকছে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৬ শতাংশের মতো। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণে ওই ঘাটতি পূরণের আশা করছেন মন্ত্রী।

সামনে গভীর অনিশ্চয়তা রেখেই অর্থমন্ত্রী আশা করছেন, তার নতুন বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারলে মূল্যস্ফীতি ৫.৪ শতাংশের মধ্যে আটকে রেখেই ৮.২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব হবে।

ফাহমিদা বলেন, মহামারীর কারণে পৃথিবীর উন্নত-অনুন্নত অনেক দেশ অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে। তারা কিন্তু জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে চিন্তিত নয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাস অনুযায়ী পৃথিবীর অনেক বড় প্রবৃদ্ধির দেশও এখন নেতিবাচক বা অনেক কম প্রবৃদ্ধির দিকে যাচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী বাজেট প্রস্তাবে ৮ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্য ধরেছেন, তাকে অসম্ভব হিসেবে বর্ণনা করে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, অর্থনীতি কোথায় যাচ্ছে তা আমরা জানি না। চলতি অর্থবছরে যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল সেখানে মহামারীর মধ্যেও একই লক্ষ্যমাত্রা কীভাবে থাকে? অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সময় এখন নয়। এখন কীভাবে আমরা মহামারী থেকে ক্ষয়ক্ষতিটা প্রশমন করব এবং অর্থনীতি কীভাবে পুনরুদ্ধার করব—সেই চিন্তা করার সময়।

ফাহমিদা বলেন, অর্থমন্ত্রীর দেয়া বাজেট বিশ্লেষণ করে তাদের মনে হয়েছে, মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর আওতায় সরকার আগেই অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি এবং চলকগুলো নির্ধারণ করেছে। সেটা মহামারী আসার আগেই করা হয়েছিল। বাজেটে সেগুলো আর পরিবর্তন করতে চাননি। কিন্তু মহামারী আসার পর সামগ্রিক অর্থনীতি পরিবর্তন হয়ে গেছে। মহামারী কবে শেষ হবে, কেউ জানে না। ক্ষয়ক্ষতি আর কতটা বাড়বে, সেটাও স্পষ্ট নয়। এমন অবস্থায় বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে বাজেট পুনর্বিবেচনা করার প্রয়োজন হতে পারে। আর সেজন্য সরকারের প্রস্তুত থাকা দরকার।

চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাকেও অবাস্তব হিসেবে বর্ণনা করেন ফাহমিদা। তিনি বলেন, আগামী বাজেটেও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা অনৈতিক, তাতে ভালো করদাতারা নিরুৎসাহিত হবেন। বরং দেশকে কর না দিয়ে যারা কালো টাকার মালিক হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

এদিকে ৫০ লাখ পরিবারকে আড়াই হাজার টাকা করে প্রণোদনা দেয়ার সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে একটি সর্বজনীন বীমা স্কিম করার ওপরও জোর দেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক।

ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এবং রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।