২০১৯-২০ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ১৩.২৪ শতাংশ বেশি গতকাল ঘোষিত ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট। ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ক্ষতি ও ব্যবসায় এর প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে বলা যায়, এ বাজেট বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য খুবই দুরূহ হবে। প্রস্তাবিত বাজেটের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় এ অভিমত প্রকাশ করেছে ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নবিষয়ক পরামর্শক সংস্থা বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড)।
গতকাল পাঠানো বাজেট প্রতিক্রিয়ায় বিল্ড বলেছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং স্থানীয় ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত প্রদানে সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে ‘কভিড-১৯ পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা’ ও একটি সুপরিকল্পিত এক্সিট পলিসি নিয়ে হাজির হতে হবে। অন্যথায় প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং এলডিসি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে। এবারের বাজেটে সরকারের পরিকল্পনার চারটি মূল খাত হলো: স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি ও কর্মসংস্থান; যেগুলো খুবই সুচিন্তিতভাবে বাছাই করা হয়েছে। এই খাতগুলোর জন্য ঘোষিত নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং প্রাক্কলিত বাজেটের সঠিক ব্যয় অতীব প্রয়োজন। প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে এবং সফলতা ধরে রাখতে বাজেট ব্যবস্থাপনায় থাকতে হবে নৈতিকতা ও বাস্তবমুখিতা।
সরকারের গৃহীত বেশকিছু প্রশংসনীয় নীতিমালার বিষয়ে উল্লেখ করেছে বিল্ড। যেমন করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি, কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রীম কর হ্রাস, রাজস্ব করের সীমা বৃদ্ধি, রাজস্ব করহার হ্রাস, সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, সিগারেট ও মোবাইল কল রেটের ওপর সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধি এবং পিপিইসহ অন্যান্য মেডিকেল পণ্যের জন্য শুল্ক হ্রাস। যেসব প্রস্তুতকারক পিপিই, সার্জিক্যাল মাস্ক ও এ-সংক্রান্ত অন্যান্য পণ্য রফতানিতে আগ্রহী তাদের জন্য সরকারকে বিশেষ সহায়তার হাত সম্প্রসারিত করতে হবে। রফতানি বৈচিত্র্যকরণের একটি বিশেষ সুযোগ বাংলাদেশের সামনে হাতছানি দিচ্ছে। বাংলাদেশকে অবশ্যই এ সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।
ঘোষিত বাজেটে রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ দশমিক ৩০ ট্রিলিয়ন টাকা, যা কিনা আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি এবং সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৯ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। এসব তথ্য উল্লেখ করে প্রতিক্রিয়ায় বিল্ড বলেছে, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এ লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা উচ্চাভিলাষী। ব্যবসায় পরিচালনার (ডুয়িং বিজনেস) জটিলতা অবশ্যই কমিয়ে আনতে হবে। এক্ষেত্রে এনবিআর অটোমেশনের যে লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে। বর্তমানে অনলাইন কার্যক্রম সর্বত্র জনপ্রিয় হচ্ছে, জনসাধারণও এতে অভ্যস্ত হচ্ছে। ডেটা ফ্লোর জন্য নীতিমালা, ডেটা লোকালাইজেশনের শর্তাবলি, অনলাইন প্লাটফর্ম এবং অ্যাপভিত্তিক কার্যক্রম চালু করতে হবে। এছাড়া আর্থিক খাতে ই-পেমেন্ট ও ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং নগদ অর্থ লেনদেনকে নিরুৎসাহিত করতে হবে। ফাস্ট ট্র্যাক ডিজিটালাইজেশনের জন্য সরকারকে একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।
প্রাক্কলিত বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে জিডিপির ৬ শতাংশ বা ১.৮৯ ট্রিলিয়ন টাকা, যার মধ্যে দেশীয় ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ দশমিক শূন্য ৯ ট্রিলিয়ন টাকা এবং বিদেশী ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৬০ বিলিয়ন টাকা। বিল্ডের মতে, ব্যাংক খাত থেকে বিশাল অংকের ঘাটতি অর্থায়ন বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। কভিড-১৯ মহামারীর কারণে বর্তমানে গভীর সংকটে রয়েছে বেসরকারি খাত। কভিড-১৯ সংকট এবং ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বিশাল অংকের ঘাটতি অর্থায়নের মধ্যে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করতে সরকারকে একটি সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।
বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২৯,২৪৭ কোটি টাকা, যা কিনা ২০১৯-২০ অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় ২৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ বেশি। কৃষি খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২৯ হাজার ৯৮৩ কোটি, যা কিনা ২০১৯-২০ অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় ১১ শতাংশ বেশি জানিয়ে বিল্ড বলেছে, সরকারকে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘হেলথ সেক্টর ম্যানেজমেন্ট পলিসি’ গ্রহণ করতে হবে এবং প্রয়োজনের সঙ্গে সংগতি রেখে তহবিল প্রস্তাব করতে হবে। এগ্রো প্রসেসিং খাতকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে এবং স্বাস্থ্য ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
সরকার এরই মধ্যে ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাপার নির্দেশ প্রদান করেছে। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত মুদ্রাস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে এ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। বিল্ড মনে করে, যদি টাকা ছাপার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন না বাড়ে তবে এ থেকে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মূল লক্ষ্য হলো সামগ্রিক চাহিদা ও উৎপাদন বৃদ্ধি। সরকারকে তেলের নিম্নদর, অগ্রাধিকার-বহির্ভূত এডিপি প্রকল্প বাতিল এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয়সহ অন্যান্য বিষয়ের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
সিএমএসএমই খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারকে সঠিক নীতিসহায়তা প্রদান করার দাবি জানিয়ে বিল্ড বলেছে, এ খাতের জন্য বাজেটে ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। পিকেএসএফের মাধ্যমে এ অর্থ সরবরাহ করা হবে। কটেজ ও মাইক্রো উদ্যোক্তাদের সহায়তার জন্য ক্ষুদ্র ঋণের অন্যান্য সংস্থাকে বিশেষভাবে এগিয়ে আসতে হবে। এসব উদ্যোক্তার জন্য যেসব সহায়তা প্রয়োজন সেগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের উদ্যোক্তাদের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। এসব উদ্যোক্তার একটি বড় অংশ লকডাউনের কারণে তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। তাদের অন্তত ২ লাখ টাকা করে কোলাটেরাল-মুক্ত ঋণসহায়তা দিতে হবে। ভারত এরই মধ্যে এসব উদ্যোক্তার জন্য কোলাটেরাল-মুক্ত ৩ লাখ টাকা ঋণসহায়তা প্রদান শুরু করেছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য একটি ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের সুপারিশ করেছে বিল্ড।
কভিড-১৯-এর কারণে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে দেশের পোশাক খাত। তাদের জন্য ১ শতাংশ প্রণোদনা পর্যাপ্ত নাও হতে পারে বলে মনে করছে বিল্ড। সংস্থাটির দাবি, এ খাতের জন্য উেস কর আগের বছরের মতো শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশে রাখতে হবে। একটি সুপরিকল্পিত পরিকল্পনার জন্য খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করতে হবে। চামড়া ও প্লাস্টিক খাতের রফতানিও পতনের মধ্যে রয়েছে। তবে ফার্নিচার, এগ্রো প্রসেসিং, নন-লেদার ফুটওয়্যারসহ কিছু প্রথাগত খাতে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। প্রথাগত খাতের বাইরের কিছু রফতানি পণ্য যেমন খেলনা, ফ্লোটিং গ্লাস, জাহাজ, নৌকা ও সোলার মডিউলের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। সংকটময় মুহূর্তে প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড, ইডিএফ, নগদ সহায়তা, ডিউটি এক্সেম্পশন ড্রব্যাক অফিসের পর্যাপ্ত সহায়তা সম্প্রসারণ করতে হবে।





