বাংলাদেশ ১৬ কোটির অধিক জনসংখ্যার একটি জনবহুল দেশ। জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম। বিগত বছরগুলোতে শক্তিশালী ও স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য দেশে দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে। সেই সাথে মানুষের গড় আয় ২০১৮ সালে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। উন্নয়নের এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২১ সালে বাংলাদেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় পৌঁছতে সরকার এসডিজি অর্জনে কাজ করে যাচ্ছে। এসডিজির লক্ষ্য ২ ও ৩ সরাসরি মানসম্পন্ন খাদ্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত। বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশ খাদ্যনিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ দিক খাদ্যোৎপাদনে যথেষ্ট অগ্রগতি সাধন করেছে। বলা হয়, শস্যজাতীয় খাদ্যোৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। সবজি ও ফলমূল উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় এবং মাছ উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ। এ উন্নয়নের পেছনে কৃষিতে ব্যবহূত উন্নত প্রযুক্তি যেমন—উচ্চফলনশীল জাত, কীটনাশক, সার এগুলোর ভূমিকাই মুখ্য। দেশের মোট জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান প্রায় ১৪ শতাংশ; আইএমএফের হিসাবে ১৩.০৭ শতাংশ। এ হিসাবে আমাদের কৃষি খাতের মোট জিডিপি ৪১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আবাদি কৃষিজমির পরিমাণের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম। এখনো মোট জমির প্রায় ৬০ শতাংশ কৃষি ও পল্লী উন্নয়নে ব্যবহূত হচ্ছে। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে ভারত (প্রায় ৫৩ শতাংশ), পাকিস্তানের অবস্থান তৃতীয় (প্রায় ৪০ শতাংশ) এবং পরের অবস্থান থাইল্যান্ডের (প্রায় ৩৩ শতাংশ)। বাংলাদেশে কৃষি খাতের ক্রমবর্ধমান অগ্রগতি ও কৃষিজমির সর্বোচ্চ ব্যবহার সত্ত্বেও মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে এ খাতের অবদান আশানুরূপ নয়, উপরন্তু ধারাবাহিকভাবে কমছে। অথচ চীন মাত্র ১৩ শতাংশ আবাদি জমি ব্যবহার করেও জিডিপিতে তাদের কৃষির অবদান সর্বোচ্চ।

যেসব কারণ এর পেছনে রয়েছে তার মধ্যে উৎপাদিত পণ্যে মূল্য সংযোগ বা খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের অপর্যাপ্ততাকে অন্যতম হিসেবে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের মাত্র ১ শতাংশেরও কম প্রক্রিয়াজাত করা হয়। অন্যদিকে ভারতে এর পরিমাণ প্রায় ২ শতাংশ, ভিয়েতনামে ৫, চীনে ৩৮, ফিলিপিনে ৩১, আমেরিকায় ৭০, থাইল্যান্ডে ৮১ ও মালয়েশিয়ায় ৮৪ শতাংশ। বাংলাদেশে প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য খাত জিডিপিতে ২ শতাংশেরও কম অবদান রাখছে, যা পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায় অতি নগণ্য। যেমন থাইল্যান্ড ও শ্রীলংকায় জিডিপিতে এ খাতের অবদান ৭.৪ শতাংশ ও ফিলিপিনে ১০.৪ শতাংশ। কৃষিপণ্যে মূল্য সংযোগে একদিকে যেমন অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে, তেমনি রয়েছে উৎপাদিত পণ্যের অপচয় রোধ ও ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির সুযোগ। মৌসুমভিত্তিক ফলমূল ও শাকসবজি এ দেশে প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন হলেও স্বল্প সময়ে প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ বেশি হওয়ায় কৃষকরা স্বল্প মূল্যে এসব পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হয়, সেই সাথে উৎপাদনের একটি বিরাট অংশ পচে নষ্ট হয়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি বছর বাংলাদেশে উৎপাদিত ১৫ লাখ টন ফলের মধ্যে ৪.৫ লাখ টন ভোক্তাদের কাছে পৌঁছার আগেই নষ্ট হয়ে যায়। উৎপাদিত ১৪.৮৩ লাখ টন শাকসবজির মধ্যে ৩.৮৫ লাখ টন পচে নষ্ট হয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে উদ্ভাবিত স্বল্প খরচের প্রযুক্তি টেকসই ব্যবহারের মাধ্যমে ফলমূল ও শাকসবজি সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করে বিপুল পরিমাণ পণ্যে পচন রোধ করা সম্ভব। ঋতুভেদে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের সঠিক ব্যবহার করা গেলে এ শিল্পের রফতানি বাড়ানো সম্ভব। এতে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা সম্ভব তেমনি এ শিল্পের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে বেকারত্বের হার অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

বাংলাদেশে বর্তমানে যে পরিমাণ কৃষিপণ্য উৎপাদন হচ্ছে তা বিশ্বের প্রায় ১৪০টিরও অধিক দেশে ব্যাপক রফতানির চাহিদা রয়েছে। রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরো বাংলাদেশের পরিসংখ্যান থেকে পাওয়া তথ্যানুসারে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশে কৃষি ও অকৃষি সব পণ্য রফতানি করে আয় করেছে ৪০.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। শুধু তৈরি পোশাক খাত থেকে এ আয় হয়েছে প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ। কৃষিপণ্যের মধ্যে চিংড়ি, জীবন্ত ও হিমায়িত মাছ, কাঁকড়া, শাকসবজি, তামাক, চা, মসলা, ফুল, ফল, শুকনো খাবার ও অন্যান্য পণ্য রফতানি করে আয় হয় মাত্র ১.৪ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রফতানি আয়ের মাত্র ৩.৫ শতাংশ। সরকারি পরিসংখ্যানে কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্য এবং কাঁচা চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যকে শিল্পজাত পণ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তথাপি এ দুই উপখাতের রফতানি আয়কে (যথাক্রমে ০.৮২ ও ১.০২ বিলিয়ন ইউএস ডলার) কৃষিপণ্যের তালিকায় যুক্ত করে বিবেচনা করলেও কৃষিপণ্য রফতানির মাধ্যমে মোট আয় দাঁড়ায় মাত্র ৩.২৪ বিলিয়ন ইউএস ডলার, যা মোট দেশজ আয়ের মাত্র ৮ শতাংশ। বিশ্বের ১০টি প্রধান কৃষিপণ্য রফতানিকারক দেশের তালিকায় এশিয়ার চারটি দেশ রয়েছে। এখানেও শীর্ষে আছে চীন, যার রফতানি আয় প্রায় ৭৩ বিলিয়ন ডলার, ইন্দোনেশিয়া ৩৯ বিলিয়ন ডলার, থাইল্যান্ড ও ভারত যথাক্রমে ৩৬ ও ৩৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে রফতানি আয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। 

সারা বিশ্বে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের চাহিদা ক্রমর্বধমান। সরকারি হিসাবে এ ধরনের প্রক্রিয়াজাতকৃত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার ৭০ হাজার কোটি ডলারের অধিক। যেসব দেশ এসব প্রক্রিয়াজাতকৃত খাদ্য আমদানি ও রফতানি করে সেগুলোর মাঝে তুলনামূলক এগিয়ে থাকা দেশগুলো হচ্ছে: ইউএসএ, ইইউ, ইউকে, রাশিয়া, চীন, হংকং, জাপান ইউএই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, ভেনিজুয়েলা, কোরিয়া, ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল, সুইজারল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, ব্রাজিল, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, সৌদি আরব, তুরস্ক, ইরান, আফগানিস্তান, উজবেকিস্তান ইত্যাদি। যেখানে এসব পণ্যের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হলো ইউএসএ। আর সম্ভাবনাময় খাতটি বিশ্ববাজারের প্রায় সিংহভাগ দখল করে আছে ইউরোপের দেশগুলো, প্রায় ৪০ শতাংশ। এছাড়া এশিয়ার বিভিন্ন কৃষিপ্রধান দেশ, দক্ষিণ আমেরিকা ও মধ্য আমেরিকা বর্তমানে এ পণ্যের সম্ভাবনা বাজার। আর এমন একটি সম্ভাবনাময় খাতে বাংলাদেশের রফতানির অবস্থা খুবই নাজুক। বিশ্বের ১০টি প্রধান কৃষিপণ্য রফতানিকারক দেশের তালিকায় এশিয়ার যে চারটি দেশের নাম রয়েছে সেগুলোর মাঝে শীর্ষস্থান দখল করে আছে চীন, যার রফতানি আয় প্রায় ৭৩ বিলিয়ন ডলার, পরের স্থানগুলোতে আছে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভারত; যাদের রফতানি আয় যথাক্রমে প্রায় ৩৯, ৩৬ ও ৩৫ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে বর্তমানে বিশ্বের ১৪০টি দেশে বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত পণ্য রফতানি করা হচ্ছে। ১৪০টি দেশ সংখ্যায় অনেক মনে হলেও দেশে উৎপাদিত প্রায় ৬৮২ লাখ টন প্রক্রিয়াজাত পণ্যের মাধ্যে রফতানি হচ্ছে মাত্র ১৭০ লাখ টন অর্থাৎ মোট উৎপাদনের ৪ ভাগের ১ ভাগেরও কম। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সমীক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রফতানির মাধ্যমে মোট আয় দাঁড়ায় মাত্র ৩ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার, যা মোট দেশজ আয়ের মাত্র ৮ শতাংশ এবং এ আয় শুধু প্রক্রিয়াজাত পণ্য থেকে নয়, বরং এর সাথে যুক্ত আছে বিভিন্ন কৃষিজ কাঁচামাল, কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্য এবং কাঁচা চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য।

এতৎসত্ত্বেও বিগত দুই দশকে এ খাতের যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমানে শিল্পটি বাংলাদেশের দ্রুতবর্ধনশীল খাত, যেখানে দেশের শ্রমশক্তির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিযুক্ত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০০৬ অর্থনৈতিক আদমশুমারি অনুসারে, দেশে প্রায় ২৪৬টি মাঝারি আকারের খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প-কারখানা রয়েছে এবং এ শিল্প দেশের মোট শিল্প উৎপাদন শ্রমশক্তির ১৯ শতাংশ এবং মোট উৎপাদন শ্রমশক্তির ৮ শতাংশ নিযুক্ত করে। বাংলাদেশ এগ্রো প্রসেসর্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) মতে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প-কারখানা ২০১০-১১ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রফতানি করে ৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে, যা ২০১৪-১৫ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ২২৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হয়। কৃষিপণ্যের বিভিন্ন উপখাতের তথ্যচিত্র বিশ্লেষণ করলে এ শিল্পের বর্তমান অবস্থা ও সম্ভবনা অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে যায়।

আমাদের দেশে শস্যজাত পণ্য থেকে রুটি, বিস্কুট, নুডলস্, পাস্তা, পরোটা, পাঁপড়, শিঙাড়া, সমুচা, সেমাই, আলুপুরি, ডালপুরি, পিঠা, মুড়ি, চিঁড়া, সুগন্ধি চাল, ডাল ভাজা, চানাচুর, মটরশুঁটি ভাজা, হালিম মিক্সড, খিচুড়ি মিক্সড ইত্যাদি পণ্য উৎপাদন হলেও তা ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের এসব খাদ্য এখনো রফতানি বাজারে মূল খাবার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এছাড়া বাংলাদেশে মুড়ি, চিঁড়া, বিস্কুট ইত্যাদি কিছু শুকনো খাবার ব্যতীত অন্যান্য শস্যজাত খাদ্য প্রস্তুতির পর বিপণন করার জন্য হিমায়িত আকারে সংরক্ষণ করে দেশের চাহিদা মেটানোর পর সামান্য পরিমাণে এসব সামগ্রী রফতানি হচ্ছে যেগুলোর ভোক্তা ভারত উপমহাদেশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। যদিও উৎপাদিত ভুট্টার ৯৯ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে। তবে বেশির ভাগই পশুখাদ্য হিসেবে (৯৯ শতাংশ) হচ্ছে সেখানে পপকর্ন ও স্ন্যাকস-জাতীয় খাবার ও ইন্ডাস্ট্রিজের স্টার্চ তৈরিতে ২ শতাংশ করে এবং ময়দা তৈরিতে ৬ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে। ২০১১, ২০১২, ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে বিশ্ববাজারে এসব পণ্যের চাহিদা ছিল যথাক্রমে ৭৮২৬৮.৯৮, ৭৬০৮৫.২৮, ৮২৮১৪.৮৮, ৮৬২৯৪.৯৬ও ৮০৫৭১.৪১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। অথচ বাংলাদেশ উল্লিখিত বছরগুলোতে রফতানি করেছিল যথাক্রমে ৩৩.১৮, ৪১.১৪, ৫৩.৫০, ৯২.৯৯ ও ৯৮.০২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মাত্র।

বাংলাদেশে শাকসবজি মূলত সুষম খাদ্যের সহায়ক হিসেবে বেশি ব্যবহূত হয়। এছাড়া সালাদ অথবা স্যুপ হিসেবেও এখন কিছুটা ব্যবহার হয়। যদিও শাকসবজির অপচয় ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে তবু শাকসবজি প্রক্রিয়াজাতপূর্বক বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ বাজারে লক্ষণীয় কোনো বিপণন হচ্ছে না। রফতানির বাজারে বাংলাদেশের কিছু শাকসবজি হিমায়িত আকারে থাকলেও ক্যানিং সবজির রফতানি করা সম্ভব। ২০১১, ২০১২, ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে তাজা ও হিমায়িত আকারে যথাক্রমে ৭১.৭৩, ৭৭.৪৩, ১১০.৩৪, ১৪৭.৫৫ ও ১০৩.২৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার শাকসবজি রফতানি হয়েছিল। বাংলাদেশে উৎপাদিত টমেটোর মাত্র ৫ শতাংশ প্রক্রিয়াকরণের আওতায় এবং এর মাঝে প্রায় পুরোটাই টমেটো সস তৈরিতে ব্যবহার হয়। কেননা বিশ্ববাজারে টমেটো সসের চাহিদা অনেক।

ফলমূল উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। দেশের উৎপাদিত ফলের বিরাট অংশই তাজা অবস্থায় বিপণন হয়। বেশির ভাগই মৌসুমি ফল। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ জেলায় আম উৎপাদন হয়। তবে উৎপাদিত আমের ৬ শতাংশ প্রক্রিয়াকরণের আওতাভুক্ত, যার বেশির ভাগই (৮৫ শতাংশ) আমের ড্রিংস এবং আমের বার বা আচার বানাতে ব্যবহার হয়। অথচ ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে আমের কিউমুলেটিভ গ্রোথ রেট মাত্র ৩ শতাংশ এবং রফতানীকৃত আমজাত পণ্যের প্রায় ৫৪ শতাংশ আমের জুস, যার গন্তব্য মূলত ইন্ডিয়ান বাজার। এছাড়া নেপাল, ভুটান, সৌদি আরবসহ কিছু দেশে বাংলাদেশী আমের জুসের কিছুটা চাহিদা লক্ষণীয়। তবে অন্যান্য ফলের ক্ষেত্রে এ ধরনের চিত্র দেখা যায় না।

দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলার পাশাপাশি জনগণের সুষম খাদ্য ও পুষ্টির চহিদা পূরণে ডাল গুরুত্বপূর্ণ আবদান রাখে। বাংলাদেশে বর্তমানে ডালের মোট চাহিদা ২৫ লাখ টন হলেও বছরে উৎপাদন হয় মাত্র নয় লাখ টন। ফলে প্রতি বছর ১৫-১৬ লাখ টন ডাল আমদানি করতে হয়। তবে ডালের কিছু পণ্য যেমন ডাল ভাজা বা চানাচুর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রায় ১৩ মি. ইউএসডি রফতানি হয়েছে এবং এসব পণ্য বিক্রয়ে আমাদের দেশের জন্য বাজার হলো সৌদি আরব। এর পরই আছে মালয়েশিয়ার অবস্থান।

দেশের তৈলবীজের ঘাটতি থাকায় তা পূরণকল্পে বাংলাদেশে অপ্রক্রিয়াজাত অবস্থায় পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্রুড অয়েল আমদানি করা হচ্ছে। অনেকটা মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার অভাবে দেশে উৎপাদিত তেলের মান নিয়ে ভোক্তা পর্যায়ে সন্দেহ হয়েছে। তবে বাদামজাত খাদ্যের চাহিদা বেড়েছে। সরিষার তেল দিয়ে কাসুন্দি বানিয়ে খুব অল্প পরিমাণে রফতানি হচ্ছে ইউএই, কাতার ও ওমানে। এছাড়া চালের কুঁড়া থেকে উৎপাদিত তেল বিশ্বে হার্ট অয়েল হিসেবে পরিচিত। দেশে তৈলবীজের ঘাটতি থাকলেও ১২ হাজার ৮০০ টন কুঁড়ার কাঁচামাল থেকে বছরে ৩ হাজার ৪৫০ টন তেল উৎপাদনের সুযোগ আছে। সরিষা, তিল, তিসি, সূর্যমুখী ইত্যাদির ভেষজ গুণ থাকায় বাংলাদেশে ঘানির পরিবর্তে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তেল মিল স্থাপিত হয়েছে। ফলে বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে তিল, তিসি রফতানি হতেও দেখা যাচ্ছে।

মসলাজাতীয় পণ্য যেমন পেঁয়াজ, রসুন, ধনিয়া, আদা, মরিচ, হলুদ ইত্যাদি বাংলাদেশর অন্যতম অর্থকরী ফসল। যদিও প্রবাসী বাঙালিদের জন্য বিভিন্ন দেশী মসলার চাহিদা বিশ্ববাজারে বাড়ছে, তবু অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণকল্পে রফতানি হয় না বললেই চলে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৫.৪২ লাখ হেক্টর জমিতে ৩১.২৫ লাখ টন মসলা উৎপাদন হলেও মসলা বাবদ আমদানি ১৬৬.১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। কেননা সব মসলা আমাদের দেশে উৎপাদন হয় না। তবে দেশের বৃহত্তর খাদ্য পণ্য রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো কিছু পরিমাণে মসলা রফতানি করে। 

বাংলাদেশে অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৬-এর তথ্যমতে, মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের প্রায় ৩.৬৯ শতাংশ এবং মোট কৃষিজ আয়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশ (২৩.৮১ শতাংশ) মৎস্য খাত থেকে অর্জিত হয়। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যে প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ জোগান দেয় মাছ। উৎপাদিত মাছ থেকে ফিশফিলেট, ফিশবল, ফিশফিঙ্গার বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত পণ্য এর চাহিদা দেশীয় বাজারে বেড়েছে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশী প্রক্রিয়াজাত মাছের উল্লেখযোগ্য বাজারের তালিকায় আছে, চীন, কেএসএ, বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, আমেরিকাসহ অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় দেশ। অন্যদিকে হালাল মাংস ও হালাল পণ্যের বাজারও বিশ্বে সম্প্রসারণ হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশ হালাল মাংস কিছু কিছু দেশে রফতানি করছে।

পরিশেষে জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান বাড়াতে বাণিজ্যিক কৃষির কোনো বিকল্প নেই। আর খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ হলো বাণিজ্যিক কৃষির মূল চালিকাশক্তি। আমাদের কৃষিপণ্যের অভ্যন্তরীণ বাজারকে আন্তজাতিক পর্যায়ে সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে জ্ঞান ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থাপনা সময়ের দাবি। বিশেষজ্ঞদের মতে অপর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা, অদক্ষ কৃষিবাজার, সীমিত বৈদেশিক চহিদা, প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের অভাব ইত্যাদি কারণে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ দেশের জিডিপি বৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারছে না এবং তীব্র প্রতিযোগিতামূলক কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো সুযোগ না থাকায় দেশের রফতানি আয়বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অপারসম্ভাবনাময় এ কৃষি খাত ভালো ভূমিকা রাখতে পারছে না। বর্তমানে এ সংকটাপন্ন অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।


ড. মোহাম্মদ গোলজারুল আজিজ: অধ্যাপক, খাদ্য প্রযুক্তি ও গ্রামীণ শিল্প বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

প্রমা সেন: এমএস গবেষক, খাদ্য প্রযুক্তি ও গ্রামীণ শিল্প বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়