বাংলাদেশে মৎস্য খাতে মাছের জোগান আসে ফিশারিজ ও অ্যাকোয়াকালচারের মাধ্যমে। ফিশারিজ ও অ্যাকোয়াকালচার পদ্ধতিতে মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবস্থান যথাক্রমে তৃতীয় ও পঞ্চম। ফিশারিজ হচ্ছে প্রাকৃতিক মুক্ত জলাশয়ে (নদী, নালা, খাল, বিল, হাওড়, উপসাগর, সাগর) মাছের, বিচরণ ক্ষেত্র, খাদ্যাভ্যাস, প্রজনন, পরিযান, ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান লাভ করে একটি টেকসই পন্থায় বছরের পর বছর মৎস্য আহরণ করা। যেমন পদ্মায় ‘ইলিশ ফিশারিজ’ থেকে ইলিশের আহরণ। অন্যদিকে অ্যাকোয়াকালচার বলতে বদ্ধ জলাশয়ে (পুকুর, ধানক্ষেত, ঘের) কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা কর্তৃক মাছের পোনা মজুদ, খাদ্য প্রয়োগ, রোগ পরিচর্যা ও নির্দিষ্ট সময় পর মৎস্য আহরণ করাকে বোঝায়। যেমন ‘তেলাপিয়া অ্যাকোয়াকালচার’ পুকুর থেকে তেলাপিয়া উৎপাদন। মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ সালে বাংলাদেশের মোট মৎস্য উৎপাদন ছিল ৪২ দশমিক ৭৬ লাখ টন। মোট উৎপাদনের প্রায় ৫৬ শতাংশ আসে অ্যাকোয়াকালচার থেকে, বাকি ২৯ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ আসে যথাক্রমে অভ্যন্তরীণ স্বাদুপানি ও সামুদ্রিক ফিশারিজ থেকে। বাংলাদেশে তিন দশক আগে অ্যাকোয়াকালচারের তেমন প্রচলন ছিল না, সিংহভাগ মাছ আহরিত হতো প্রাকৃতিক মুক্ত জলাশয় অর্থাৎ ফিশারিজ থেকে। স্বাধীনতার বছর ১৯৭১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ফিশারিজ থেকে মাছের উৎপাদন বেড়েছে মাত্র দ্বিগুণ, অন্যদিকে অ্যাকোয়াকালচার থেকে বেড়েছে ৩৫ গুণ। বিশেষ করে গত ১০ বছরে অ্যাকোয়াকালচারের উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছে অর্থাৎ ১৩ দশমিক ৫২ লাখ থেকে ২৪ দশমিক শূন্য ৫ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে মাছের পোনা উৎপাদন, মাছের খাদ্য উৎপাদন, মাছ চাষের বিভিন্ন প্রযুক্তি উদ্ভাবন, প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ও উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তি গ্রহণের মাধ্যমে গত তিন দশকে মৎস্য সেক্টরের এ বিশাল বিবর্তন ঘটেছে। 

বাংলাদেশে প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে মাছ আহরণের প্রাগৈতিহাসিক পেশায় যুক্ত মানুষরা জেলে হিসেবে পরিচিত, যারা সমাজের নিম্ন স্তরের মানুষ হিসেবে স্বীকৃত। আহরিত মাছ নির্ভর মৎস্য সেক্টরে কর্মসংস্থান ততটা বৈচিত্র্যময় ছিল না। পরিবেশ দূষণ ও নির্বিচারে মৎস্য আহরণের কারণে প্রাকৃতিক জলাশয় বা ফিশারিজ থেকে মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ায় জেলে পেশা এখন সংকটাপন্ন। এ অবস্থায় অ্যাকোয়াকালচারের বিকাশের মাধ্যমে মৎস্যচাষী হিসেবে একটি বিশেষ শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছে, যারা এখন সমাজের উচ্চ শ্রেণীর মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। অ্যাকোয়াকালচারের ব্যাপক প্রসারের কারণে হ্যাচারির পোনা উৎপাদন থেকে শুরু করে খুচরা বাজারে মাছ বিক্রয় পর্যন্ত বিশাল লম্বা ভ্যালু চেইনের সৃষ্টি হয়েছে। ভ্যালু চেইনটি ব্যাকওয়ার্ড সেগমেন্ট, মধ্যবর্তী সেগমেন্ট বা মাছের খামার এবং ফরওয়ার্ড সেগমেন্ট এ তিন অংশে বিভক্ত। অ্যাকোয়াকালচারের দীর্ঘ ভ্যালু চেইনের বিভিন্ন সেগমেন্টে ভিন্ন ভিন্ন ত্রিশেরও অধিক প্রকারের অ্যাক্টরদের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। হ্যাচারি ও মাছের খামার অর্থাৎ ফার্ম বাদে নন-ফার্ম ভ্যালু চেইনের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে এবং নানা পেশার অ্যাক্টররা যুক্ত হয়েছেন। নন-ফার্ম ব্যাকওয়ার্ড সেগমেন্টে যুক্ত অ্যাক্টররা হচ্ছেন পোনা পরিবহনকারী, পোনা ব্যবসায়ী, খাদ্য ইন্ডাস্ট্রি, খাদ্য উপাদান আমদানিকারী, খাদ্য সরবরাহকারী, খাদ্য বিক্রেতা, ওষুধ কোম্পানি, ওষুধ সরবরাহকারী, ওষুধ বিক্রেতা, মাছের চিকিৎসক, যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারী, যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী, যন্ত্রপাতি বিক্রেতা ও মেরামতকারী। মৎস্য খাদ্য তৈরির জন্য স্থানীয়ভাবে খাদ্যের মেশিন ম্যানুফাকচারিং কারখানা তৈরি হয়েছে। এ সব ম্যানুফ্যাকচারিং কারখানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি মৎস্যচাষীদের চাষ প্রক্রিয়াকে আরো সহজতর করে তুলেছে। চাষীরা নিজে মাছের খাদ্য তৈরি করায় খাদ্য খরচ কমে যাওয়ার কারণে লাভবান হচ্ছেন। ফরওয়ার্ড সেগমেন্টে যুক্ত অ্যাক্টরের ধরন ও সংখ্যা অনেক, যেমন জাল প্রস্তুতকারী, জাল বিক্রেতা, জাল সরবরাহকারী, নিকারি, মাছ পরিবহনের জন্য ড্রাম সরবরাহকারী, পানি সরবরাহকারী, বরফ উৎপাদন ও সরবরাহকারী, পরিবহন ট্রাক/ভ্যান সরবরাহকারী, আড়তদার, পাইকার, সরকার, কয়েল, হেলপার, কুলি, সুইপার, খুচরা মাছ বিক্রেতা, মাছ কাটার লোক ইত্যাদি।

মৎস্য সেক্টরে নন-ফার্ম অ্যাক্টরদের নিয়ে সৃষ্ট কর্মসংস্থানের ক্রমবর্ধিষ্ণু বিশাল ভ্যালু চেইন গ্রামীণ বেকারত্ব নিরসনে এবং সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু সরকারি পর্যায়ে এ অ্যাক্টরদের নিয়ে কোনো পরিসংখ্যান নেই এবং তাদের পেশাগত উন্নয়নের জন্য কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। অ্যাক্টরদের পরিসংখ্যান থাকলে তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে ভ্যালু চেইনকে আরো উন্নত করা সম্ভব। গুণগতমানের ভ্যালু চেইনের মাধ্যমে বাজারে নিরাপদ মাছের সরবরাহ বাড়বে, বিদেশের বাজারে মৎস্যপণ্য রফতানির সুযোগ সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশ নন-ফার্ম মৎস্য সেক্টরকে আরো বিকশিত করার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। অ্যাকোয়াকালচারের মাধ্যমে দেশে মৎস্য উৎপাদনের কতগুলো বিশেষ অঞ্চল গড়ে উঠেছে এগুলোর মধ্যে ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, বগুড়া, যশোর ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। সমস্যা হচ্ছে, এসব অঞ্চলে উৎপাদিত মাছ দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে কাঁচা মাছ হিসেবে বিক্রি হয়, কিন্তু এগুলোর কোনো প্রক্রিয়াজাতকরণ হয় না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ওই অঞ্চলগুলোয় উদ্যোক্তানির্ভর মৎস্য প্রক্রিয়াজাত কারখানা প্রতিষ্ঠা করে বিভিন্ন প্রকারের মৎস্য প্রোডাক্ট যেমন ফিশ ফিলেট, ফিশ বল, ফিশ ফিঙ্গার, ফিশ চপ, ফিশ কেক, ফিশ পিকল ইত্যাদি তৈরির মাধ্যমে নন-ফার্ম সেক্টরকে আরো প্রসারিত করা সম্ভব। এসব মৎস্য প্রোডাক্ট বাজারে এলে নতুন করে মৎস্য প্রোডাক্টের বাজার সৃষ্টি হবে, পরিবহন, বিপণন ইত্যাদি ক্ষেত্রে নতুন আরো অনেক নন-ফার্ম অ্যাক্টর ও কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। এশিয়ার মৎস্য উৎপাদনকারী দেশ, যেমন চীন, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া চালু আছে। এ কারণে ওইসব দেশের বাজারে বিভিন্ন মৎস্য প্রোডাক্ট পাওয়া যায়। এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, মৎস্য অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক প্রণীত রূপকল্প-২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়ন করতে কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনের সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। কর্মসংস্থানের অভাবে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বিরাট একটি অংশ অবৈধভাবে বিদেশে পাড়ি জমানোর পাশাপাশি দেশের গ্রাম ও মফস্বল এলাকা ছেড়ে শহরমুখী হয়ে পড়ছে। অথচ গ্রামীণ উন্নয়নের মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে এ ধরনের অবৈধ অভিবাসন রোধ করাসহ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর শহরমুখী প্রবণতাকেও রোধ করা সম্ভব। তাই কৃষির উপখাত হিসেবে মৎস্য খাতকে আরো গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা গ্রহণ, অর্থ বরাদ্দ, গবেষণা, উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থাকে আরো কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।


ড. মুহাম্মদ মাহফুজুল হক রিপন: প্রফেসর, অ্যাকোয়াকালচার বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ